ইসলামের বিধিবিধানগুলো মানবজীবনের প্রতিটি কাজকে সুশৃঙ্খল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। একজন মুমিন কীভাবে ঘর থেকে বের হবে, এ বিষয়েও ইসলামের রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম, আদব ও নির্দেশনা। এগুলোর অনুসরণ করলে দৈনন্দিন জীবনের ইহকালীন কাজকর্মও ইবাদতে পরিণত হয়।
নিয়ত ঠিক করা
মুমিনের প্রতিটা কাজের নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে। অহেতুক নিষ্ফল কোনো কাজে লিপ্ত হওয়া তার জন্য শোভা পায় না। এজন্য ঘর থেকে বের হওয়ার আগে উদ্দেশ্য ঠিক করে নেওয়া জরুরি।
হালাল রিজিক উপার্জন, জ্ঞানার্জন, মানুষের উপকার বা কোনো নেক কাজের উদ্দেশ্যে বের হলে তা ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)
দোয়া পড়ে বের হওয়া
ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ‘বিসমিল্লাহি, তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।’ এই দোয়া পড়া সুন্নত।
এর অর্থ হলো, ‘আল্লাহর নামে (বের হচ্ছি), আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম। আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই।’ এতে আল্লাহর ওপর ভরসা প্রকাশ পায় এবং বান্দা তাঁর হেফাজতে চলে যায়। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৪২৬)
ঘরে ডান পায়ে প্রবেশ করা এবং বের হওয়ার সময় বাম পায়ে বের হওয়া সুন্নত। কেননা বাইরের পরিবেশ থেকে ঘর উত্তম। আর প্রতিটি উত্তম কাজে ডানকে প্রাধান্য দিতে হয়।
উপযুক্ত পোশাক পরিধান
বাইরে যাওয়ার সময় পর্দা, শালীনতা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং এগুলোর জন্য উপযুক্ত পোশাক পরা জরুরি। পুরুষের জন্য নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে রাখা এবং নারীর জন্য পুরো শরীর ঢেকে শালীন পোশাক পরা ইসলামের ফরজ বিধান। (রদ্দুল মুহতার: ১/৪০৪)
বাম পায়ে বের হওয়া
ঘরে ডান পায়ে প্রবেশ করা এবং বের হওয়ার সময় বাম পায়ে বের হওয়া সুন্নত। কেননা বাইরের পরিবেশ থেকে ঘর উত্তম। আর প্রতিটি উত্তম কাজে ডানকে প্রাধান্য দিতে হয়।
আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) (প্রতিটি উত্তম কাজে) ডান দিককে ভালোবাসতেন। ডান হাত দিয়ে গ্রহণ করতেন, ডান হাত দিয়েই দান করতেন এবং তিনি তাঁর সব কাজেই ডান দিককে প্রাধান্য দিতে পছন্দ করতেন।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৫০৫৯)
বের হওয়ার আগে সালাম প্রদান
ঘর থেকে বের হওয়ার আগে পরিবার-পরিজনকে সালাম দেওয়া একটি সুন্দর আদব। এতে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায় এবং ঘরে বরকত নেমে আসে।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘আরোহী (যানবাহনে থাকা ব্যক্তি) পদচারীকে সালাম দেবে, পদচারী বসে থাকা ব্যক্তিকে সালাম দেবে, সংখ্যায় কম ব্যক্তি অধিকসংখ্যক ব্যক্তিকে সালাম দেবে। যে সালামের জবাব দেয়, সে উত্তম, আর যে জবাব দেয় না, তার কোনো কল্যাণ নেই।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৫৭০৪)
সুতরাং ঘর থেকে যে বের হবে, সে বের হওয়ার সময় এবং যে ঘরে প্রবেশ করবে, সে প্রবেশের সময় ঘরের বাসিন্দাদের সালাম দেবে।
প্রকৃত মুসলমান সে, যার হাত ও জবানের (অনিষ্টতা) থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।
অন্যের ক্ষতি না করা
বাইরে বের হয়ে যেন কারও কষ্ট বা ক্ষতির কারণ না হই, এ বিষয়েও সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি। রাস্তায় চলাফেরা, কথা বলা ও আচরণে ভদ্রতা বজায় রাখা একজন মুমিনের অবশ্য কর্তব্য।
নবীজি (সা.) বলেন, ‘প্রকৃত মুসলমান সে, যার হাত ও জবানের (অনিষ্টতা) থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৬)
চোখ ও অন্তর সংযত রাখা
বাইরে গেলে নানা ধরনের ফিতনা ও প্রলোভনের সম্মুখীন হতে হয়। তাই দৃষ্টি সংযত রাখা, অশালীন বিষয় থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং আল্লাহর ভয় অন্তরে ধারণ করা জরুরি। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘(হে নবী) আপনি মুমিনদের বলুন, তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি অবনত রাখে।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩০)
সময় ও দায়িত্বসচেতন হওয়া
ঘর থেকে বের হয়ে নিজের কাজ ঠিকভাবে সম্পন্ন করা, সময়ের মূল্য দেওয়া এবং অযথা সময় নষ্ট না করা। মুমিন ব্যক্তি সময়ের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন থাকে। নবীজি (সা.) এই ব্যাপারে আমাদের সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘সুস্থতা ও অবসর সময়— এ দুটি নেয়ামতের (সদ্ব্যবহারের) ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকার মধ্যে রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩১২)
জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে ইসলাম সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করে তোলে। আমরা যদি এই ছোট ছোট সুন্নত ও আদবগুলো মেনে চলি, তাহলে আমাদের প্রতিদিনের সাধারণ কাজগুলোও নেক আমলে পরিণত হবে।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ