ব্যবসায় যে ১০ কাজ ইসলামে নিষেধ

ছবি: ফ্রিপিক

ব্যবসায়-বাণিজ্য মানবজীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে ব্যবসা পরিচালনা করলে একজন ব্যবসায়ী শুধু দুনিয়াতেই নয়, পরকালেও লাভবান হবেন।

যারা সততা ও আমানতদারির সঙ্গে ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন, মহানবী (সা.) তাঁদের জন্য সুবিশাল পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন।

নবীজি (সা.) বলেন, ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীরা (আখেরাতে) নবী, সত্যবাদী ও শহীদদের সঙ্গে থাকবেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২০৯)

ইসলামে ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ১০টি কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

১. কারও ক্ষতি করা যাবে না

মানুষের ক্ষতি হয় এমন সব পন্থাকে ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। মানুষের উপকার করার মানসিকতা থাকতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সওয়াও যাবে না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪১)

রাসুল (সা.) বাজারে একজন খাদ্য বিক্রেতার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি খাদ্যের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দেখলেন ভেতরের খাবারগুলো ভেজা। বিক্রেতা জানালেন, বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছিল।

ব্যবসায় গ্রাহকের কাছ থেকে আমরা শুধু লাভ করছি তা নয়; বরং তাঁদের সেবা প্রদান করছি। যদি আমরা যৌক্তিক লাভ করি এবং একচেটিয়া ব্যবসা না করি, তবে তা–ই সমাজের জন্য বড় সহায়তা। এতে উভয় পক্ষই পারস্পরিক সহযোগিতার সওয়াব পাবেন।

২. ধোঁকা বা প্রতারণা করা যাবে না

মন্দ জিনিস ভালো বলে চালিয়ে দেওয়া বা ভালোর সঙ্গে মন্দের মিশ্রণ ঘটিয়ে ধোঁকা দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম।

রাসুল (সা.) বাজারে একজন খাদ্য বিক্রেতার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি খাদ্যের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দেখলেন ভেতরের খাবারগুলো ভেজা। বিক্রেতা জানালেন, বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছিল। নবীজি বললেন, ‘তুমি সেটাকে খাবারের ওপরে রাখলে না কেন; যাতে লোকেরা দেখতে পেত? যে ধোঁকা দেয় সে আমার উম্মত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০২)

আরও পড়ুন

৩. মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া যাবে না

ব্যবসার সঙ্গে মিথ্যার সংমিশ্রণ অত্যন্ত ক্ষতিকর। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সত্যের সঙ্গে অসত্যের মিশ্রণ ঘটাবে না। জেনেশুনে সত্য গোপন করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪২)

নবীজিকে জিজ্ঞাসা করা হলো, একজন মুমিন কি মিথ্যুক হতে পারে? তিনি বললেন, ‘না’। (বায়হাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৪৮১২)

অন্যকে দেওয়ার সময় ওজনে কম দেওয়া আর নেওয়ার সময় বেশি নেওয়া জঘন্য অপরাধ।

৪. ওজনে কমবেশি করা যাবে না

অন্যকে দেওয়ার সময় ওজনে কম দেওয়া আর নেওয়ার সময় বেশি নেওয়া জঘন্য অপরাধ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ধ্বংস তাদের জন্য যারা পরিমাপে কম দেয়।’ (সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত: ১-৩)

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তুমি তোমার নিজের জন্য যা ভালোবাসো তা অন্যের জন্যও ভালোবাসার আগপর্যন্ত ইমানদার হতে পারবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩)

৫. মিথ্যা শপথ করা যাবে না

মিথ্যা বলে বা মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রি করার পরিণতি খুবই ভয়াবহ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামত দিবসে আল্লাহ তিন ব্যক্তির সঙ্গে কোনো কথা বলবেন না... তাদের একজন—যে তার ব্যবসায়িক পণ্য মিথ্যা কসম খেয়ে বিক্রি করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৬)

৬. নিজে ঠকা বা কঅপরকে ঠকানো যাবে না

এক ব্যক্তি নবীজির কাছে অভিযোগ করলেন যে তিনি কেনাবেচায় প্রতারিত হন।

রাসুল (সা.) বললেন, ‘যখন তুমি ক্রয়-বিক্রয় করবে, তখন বলে দেবে যে কোনো প্রতারণা বা ঠকানোর দায়িত্ব আমি নেব না। তোমার জন্য তিন দিন পর্যন্ত পণ্য ফেরত দেওয়ার অধিকার রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৯৬৪)

যখন তুমি ক্রয়-বিক্রয় করবে, তখন বলে দেবে যে কোনো প্রতারণা বা ঠকানোর দায়িত্ব আমি নেব না। তোমার জন্য তিন দিন পর্যন্ত পণ্য ফেরত দেওয়ার অধিকার রয়েছে।’
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৯৬৪
আরও পড়ুন

৭. ব্যবসার সঙ্গে সুদ মেশানো যাবে না

সুদ একটি মারাত্মক অপরাধ। ব্যবসার নামে কোনো প্রকার সুদ চালু করা যাবে না। আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫)।

রাসুল (সা.) সুদ গ্রহণকারী, প্রদানকারী, হিসাবকারী এবং সাক্ষী—সকলের প্রতি অভিশাপ দিয়েছেন এবং বলেছেন তারা সকলেই সমান। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)

৮. অনুমানভিত্তিক ব্যবসা থেকে বিরত থাকা

গাছের ফলকে না পেড়ে অনুমান করে বিক্রি করা (মুযাবানা) বা খেতের শস্যকে অনুমান করে পরিষ্কার শস্যের বিনিময়ে বিক্রি করা (মুহাকালা) ইসলামে নিষিদ্ধ। সুদের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসুল (সা.) এগুলোকেও সুদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

ব্যবসার জটিল মারপ্যাঁচে অন্যের সম্পদ হরণ করা হারাম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না।

৯. অন্যের সম্পদ হরণ না করা

ব্যবসার জটিল মারপ্যাঁচে অন্যের সম্পদ হরণ করা হারাম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না। কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯)

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তার প্রতি দয়া বর্ষণ করুন, যে বিক্রির সময়, ক্রয়ের সময় এবং পাওনা দাবির সময় সদয় থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৭৬)

১০. মজুদদারি না করা

মজুদদারির ফলে দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী হয় এবং সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘শুধুমাত্র পাপী ব্যক্তিই মজুদদারি করে থাকে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬০৫)

আব্দুল্লাহ আলমামুন আশরাফী: মুহাদ্দিস, জামিয়া গাফুরিয়া মাখযানুল উলুম, টঙ্গী, গাজীপুর।