মুসলিম উম্মাহকে নিয়ে নবীজির ৮ আশঙ্কা

ছবি: ফ্রিপিক

মানুষ যখন কারও প্রতি অত্যন্ত দয়ালু হন, তখন তার কল্যাণ কামনায় তিনি অস্থির থাকে। কিন্তু যার কল্যাণ চাওয়া হচ্ছে, সে যদি নিজে সচেতন না হয়, তবে সেই শুভকামনা পূর্ণতা পায় না।

প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) উম্মতের জন্য অঝোরে চোখের পানি ফেলেছেন, আল্লাহর দরবারে সুপারিশের ওয়াদা করেছেন। 

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আমরা যা খুশি তাই করব আর ভাবব, নবীজি তো আছেনই! বরং প্রকৃত নবীপ্রেম হলো তাঁর শিক্ষা জীবনে ধারণ করা এবং বিশেষ করে সেই সব বিষয় থেকে দূরে থাকা, যা উম্মতের ধ্বংসের কারণ হতে পারে বলে নবীজি (সা.) আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

হাদিসের আলোকে সেই আশঙ্কা ও সতর্কতাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো—

১. পার্থিব মোহ

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় করি না; বরং আমি ভয় পাই যে তোমাদের আগের জাতিগুলোর মতো তোমাদের সামনেও দুনিয়ার প্রাচুর্য অবারিত করে দেওয়া হবে। এরপর তোমরাও তাদের মতো দুনিয়ার মোহে পড়ে প্রতিযোগিতায় নামবে এবং তা তোমাদের সেভাবেই ধ্বংস করে দেবে, যেভাবে পূর্ববর্তীদের করেছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস:  ৩১৫৮, সহিহ মুসলিম, হাদিস:  ২৯৬১)

অন্যত্র তিনি বলেন, ‘আমার চলে যাওয়ার পর আমি তোমাদের জন্য যা সবচেয়ে বেশি ভয় পাই, তা হলো দুনিয়ার চাকচিক্য ও সৌন্দর্য যা তোমাদের সামনে উন্মোচিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস:  ১৪৬৫, সহিহ মুসলিম, হাদিস:  ১০৫২)

বীপ্রেম হলো তাঁর শিক্ষা জীবনে ধারণ করা এবং বিশেষ করে সেই সব বিষয় থেকে দূরে থাকা, যা উম্মতের ধ্বংসের কারণ হতে পারে বলে নবীজি (সা.) আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
আরও পড়ুন

২. লোকদেখানো আমল

মহানবী (সা.) বলেন, ‘আমি আমার উম্মতের ব্যাপারে ‘গুপ্ত শিরক’ ও গোপন কামনার ভয় করি।’ জিজ্ঞেস করা হলো—হে আল্লাহর রাসুল! আপনার পর কি আপনার উম্মত শিরক করবে?

তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তবে শোনো, তারা সূর্য, চন্দ্র বা পাথরের পূজা করবে না, তারা মূর্তিপূজাও করবে না; বরং তারা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আশায় নিজের আমলগুলো প্রদর্শন করবে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস:  ১৭১১৮)

৩. অন্যকে শিরকের অপবাদ

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের ব্যাপারে এমন এক ব্যক্তির ভয় করছি যে কোরআন পড়বে এবং তার চেহারায় কোরআনের সৌন্দর্য প্রকাশ পাবে। কিন্তু একটা সময় সে কোরআন থেকে বিচ্যুত হয়ে তা পেছনে ফেলে দেবে এবং নিজের প্রতিবেশীর ওপর তরবারি নিয়ে চড়াও হবে আর তাকে শিরকের অপবাদ দেবে।’

শোনো, তারা সূর্য, চন্দ্র বা পাথরের পূজা করবে না, তারা মূর্তিপূজাও করবে না; বরং তারা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আশায় নিজের আমলগুলো প্রদর্শন করবে।
মুসনাদে আহমাদ, হাদিস:  ১৭১১৮

জিজ্ঞেস করা হলো, তখন শিরকের নিকটবর্তী কে হবে? তিনি বললেন, ‘যে অপবাদ দেবে, সে–ই।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৮১)

৪. সামাজিক অবক্ষয়

মহানবী (সা.) উম্মতের ধ্বংসের জন্য ছয়টি বিষয়কে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন— ১. অযোগ্য ও নির্বোধদের শাসন। ২. নিরপরাধ মানুষকে হত্যা। ৩. বিচারের রায় কেনাবেচা (দুর্নীতি)। ৪. আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা। ৫. পবিত্র কোরআনকে গানের সুরে বিনোদনের জন্য পাঠ করা। ৬. পাহারাদার বা চাটুকারদের আধিক্য। (আল-জামেউস সগির, হাদিস:  ১১৭৩)

৫. পথভ্রষ্ট শাসক

তিনি আরো বলেন, ‘আমি আমার উম্মতের ব্যাপারে পথভ্রষ্টকারী নেতাদের (শাসক বা পথপ্রদর্শক) ভয় করি।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২২২৯)

আরও পড়ুন

এছাড়াও নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আমি সবচেয়ে বেশি ভয় পাই প্রবৃত্তির অনুসরণ ও দীর্ঘ আশাকে। প্রবৃত্তির অনুসরণ সত্যের পথ রুদ্ধ করে দেয়, আর দীর্ঘ আশা আখিরাতকে ভুলিয়ে দেয়।’ (শুআবুল ইমান, বায়হাকি: ১০১২০)

৬. চারিত্রিক বিচ্যুতি

নবীজি বলেন, ‘আমার উম্মতের ব্যাপারে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় পাই কওমে লুতের নিকৃষ্ট আমলকে (সমকামিতা)।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৪৫৭, ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৫৬৩)

তিনি আরো বলেন,‘আমি সেই মুনাফিককে ভয় করি যে কথায় অত্যন্ত চতুর ও বাচাল।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস:  ১৪৩)

তিনি বলেন, ‘তোমাদের জন্য আমার বড় আশঙ্কা হলো ব্যভিচার এবং অন্তরে লালিত কুচিন্তা বা মন্দ বাসনা।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস:  ১৯৭৮৩)

৭. ধর্মীয় বিষয়ে অবহেলা

নবীজি (সা.) সতর্ক করেছেন তিনটি বিষয়ে— আলেমের পদস্খলন, কোরআন নিয়ে মোনাফেকের বিতর্ক এবং তকদির বা ভাগ্য অস্বীকার করা। (তবারানি কাবির, হাদিস: ৫৮২৯)।

এছাড়াও নক্ষত্র বা জ্যোতিষশাস্ত্রকে সত্য মনে করা এবং সুদে লিপ্ত হওয়াকে তিনি উম্মতের জন্য চরম আশঙ্কাজনক বলে উল্লেখ করেছেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস:  ৬৫৩১)

৮. জিহ্বার অনিষ্টতা

হজরত সুফিয়ান বিন আব্দুল্লাহ (রা.) নবীজিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আল্লাহর রাসুল,আমার জন্য আপনি সবচেয়ে বেশি কোন জিনিসটিকে ভয় পান? তখন নবীজি (সা.) নিজের জিহ্বা চেপে ধরে বললেন, ‘এটিরই ভয় সবচেয়ে বেশি।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪১০)

নবীজির এই সতর্কবাণীগুলো মুসলিম উম্মাহর টিকে থাকার মানদণ্ড। বাস্তব জীবনে এই পদস্খলনগুলো থেকে দূরে থাকাই একজন মুমিনের প্রধান দায়িত্ব।

আরও পড়ুন