ইসলামি জীবনদর্শনে মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি কী? জন্মগত পরিচয়, বংশগৌরব, গায়ের রঙ নাকি কাড়ি কাড়ি টাকা?
আধুনিক সমাজ আজও সেখানে বর্ণবাদ আর আভিজাত্যের লড়াইয়ে ক্ষতবিক্ষত, সেখানে আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব বিচারের এক বৈপ্লবিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
সেই মানদণ্ডটি হলো—তাকওয়া বা খোদাভীতি।
শ্রেষ্ঠত্বের প্রকৃত মানদণ্ড
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা ঘোষণা করেছেন, “হে মানুষ, আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি (খোদাভীরু)।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)
বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণেও মহানবী (সা.) বলেছিলেন, “হে লোকসকল, সাবধান, তোমাদের প্রতিপালক একজন, তোমাদের পিতাও একজন। মনে রেখো, তাকওয়া ছাড়া কোনো আরবের ওপর অনারবের, অনারবের ওপর আরবের, সাদার ওপর কালোর কিংবা কালোর ওপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৪৮৯)
অর্থাৎ মানুষের বাহ্যিক আকার-আকৃতি বা বংশীয় পরিচয় আল্লাহর কাছে কোনো বিচার্য বিষয় নয়। মহানবী আরও বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের শরীর বা তোমাদের অবয়বের দিকে তাকান না, বরং তিনি তাকান তোমাদের অন্তরের দিকে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)
অবহেলিত সাহাবি জুলাইবিব
এই মানবিক সাম্যের উজ্জ্বল উদাহরণ হলেন সাহাবি জুলাইবিব (রা.)। তিনি দেখতে খুব একটা সুদর্শন ছিলেন না, ছিল না কোনো নামডাক বা বংশীয় আভিজাত্য। সাধারণ মানুষের চোখে তিনি ছিলেন প্রান্তিক এক ব্যক্তি। কিন্তু নবীজির কাছে তাঁর মর্যাদা ছিল অসামান্য।
এক যুদ্ধের পর গনিমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জিত হলে নবীজি সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কি কাউকে হারিয়েছ (শহিদ হয়েছে এমন)?” তাঁরা কয়েকজন বড় বড় নেতার নাম বললেন। মহানবী (সা.) আবার জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কি আর কাউকে হারিয়েছ?” তাঁরা বললেন, “না।” তখন নবীজি ব্যথিত কণ্ঠে বললেন, “কিন্তু আমি যে জুলাইবিবকে খুঁজছি।”
খোঁজাখুঁজির পর জানা গেল, জুলাইবিব (রা.) সাতজন শত্রুকে একাই শেষ করে নিজে শহিদ হয়েছেন। নবীজি তাঁর লাশের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, “সে আমার, আর আমি তার।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৯৭৮৪)
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বনাম নববি আদর্শ
আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, একবার নবীজির সামনে দিয়ে এক প্রভাবশালী ব্যক্তি যাচ্ছিলেন। তিনি পাশে বসা এক সাহাবিকে জিজ্ঞেস করলেন, “এই লোকটির ব্যাপারে তোমার ধারণা কী?” সাহাবি উত্তর দিলেন, “তিনি তো সমাজের অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। তিনি কোথাও বিয়ের প্রস্তাব দিলে তা গ্রহণ করা হয়, কারও জন্য সুপারিশ করলে তা মানা হয়।”
নবীজি চুপ থাকলেন।
খানিক বাদে এক দরিদ্র মুসলিম সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। নবীজি আবার একই প্রশ্ন করলেন। সাহাবি উত্তর দিলেন, “আল্লাহর রাসুল, তিনি তো গরিব মুসলিম। তিনি কোথাও বিয়ের প্রস্তাব দিলে কেউ কবুল করে না, সুপারিশ করলে গ্রাহ্য হয় না।”
তখন মহানবী (সা.) বললেন, “আগের লোকটির মতো পৃথিবী ভর্তি মানুষের চেয়ে এই দ্বিতীয় ব্যক্তিটি আল্লাহর কাছে অনেক বেশি উত্তম।”
শেষ কথা
ইসলামের এই সুমহান শিক্ষা সমাজ থেকে বৈষম্যের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বংশমর্যাদার অহংকার যে অর্থহীন, তা সালমান ফারসি (রা.) ও আবু লাহাবের উদাহরণেই স্পষ্ট।
পারস্যের দাস হয়েও সালমান ফারসি (রা.) ইসলামের ছায়াতলে এসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, আর কোরাইশ বংশের বড় নেতা হয়েও আবু লাহাব আবু জেহেলরা নিক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে।