ইসলাম কতটা ইতিবাচক থাকতে বলে

ছবি: ফ্রিপিক

প্রবাদ আছে—‘অন্ধকারকে গালি দেওয়ার চেয়ে একটি মোমবাতি জ্বালানো অনেক ভালো’। ঘোর অন্ধকার আর হৃদয়ের সংকীর্ণতার মাঝে যখন নেতিবাচকতা মানুষের মনকে গ্রাস করে ফেলে, তখন তা মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। এই মরণফাঁদ থেকে বের হতে হলে প্রবাদটি মনে রাখা ভালো।

কর্ম ও নিষ্ঠার প্রদীপ

ইতিবাচকতার প্রথম পদক্ষেপ হলো ‘আমল’ বা কাজ। আল্লাহ–তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, “আর আপনি বলুন, তোমরা কাজ করো, অচিরেই আল্লাহ তোমাদের কাজ দেখবেন এবং তাঁর রাসুল ও মুমিনগণও।” (সুরা তওবা, আয়াত: ১০৫)

মানুষের উচিত তার মেধা, মানসিক ও শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী এমন কাজ করা যা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত। আর যখন কোনো কাজ করা হবে, তখন তা হতে হবে সর্বোচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন এবং নিখুঁত, যা বলা হয় ‘ইতকান’। কারণ, আল্লাহ আপনার প্রতিটি কাজের পর্যবেক্ষক।

পরিস্থিতি যত ভয়াবহ বা হতাশাজনকই হোক না কেন, মুমিনের দায়িত্ব হলো ইতিবাচক থেকে তার সাধ্যমতো উৎপাদনশীল কাজে অংশ নেওয়া।

কর্মমুখরতা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত

ইসলামে কাজের গুরুত্ব কেবল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়, বরং তা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। রাসুল (সা.) এক হাদিসে বলেছেন, “যদি কেয়ামত শুরু হয়ে যায় আর তোমাদের কারো হাতে একটি খেজুরের চারা থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ না করে কেয়ামতের জন্য দাঁড়িয়ে না যায়।” (মুসনাদে আহমদ: ১২৯০২; বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ: ৪৭৯)

অর্থাৎ সম্ভব হলে যেন তা রোপণ করে দেয়। একটি খেজুর গাছ থেকে ফল পেতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। কেয়ামতের মুহূর্তে গাছ লাগিয়ে কী লাভ?

মুহাদ্দিসগণ এর ব্যাখ্যায় বলেন, এর উদ্দেশ্য হলো মানুষকে কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা। পরিস্থিতি যত ভয়াবহ বা হতাশাজনকই হোক না কেন, মুমিনের দায়িত্ব হলো ইতিবাচক থেকে তার সাধ্যমতো উৎপাদনশীল কাজে অংশ নেওয়া। এই বৃক্ষরোপণের সওয়াব সদকায়ে জারিয়া হিসেবে অব্যাহত থাকে, যতক্ষণ তা থেকে মানুষ, পাখি বা পশুপাখি উপকৃত হয়।

আরও পড়ুন

আপনার চারাগাছ কোনটি

আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত—পরকালের জন্য আমি কোন ‘খেজুর গাছ’ বা স্থায়ী নেক আমলটি রোপণ করছি?

  • আমি কি কোনো ভালো কথা শিখছি যা অন্যকে শেখানো যায়?

  • আমি কি আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে কাউকে এমন নসিহত করছি যা তার জীবন বদলে দেবে?

  • আল্লাহ আমাকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন, তা দিয়ে অন্যের ওপর জুলুম না করে কি নিজেকে বিরত রাখছি?

  • আমি কি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আত্মীয়দের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে দিচ্ছি?

  • আমি কি আমার মেধা ও সময় দিয়ে কোনো আগন্তুক বা বিপদে পড়া মানুষকে পথ দেখাচ্ছি?

বয়স ও শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মানানসই কোনো কাজে নিজেকে যুক্ত রাখা একটি শরয়ি দায়িত্ব ও মানবিক প্রয়োজন, যা মানুষকে একাকীত্ব ও মানসিক অবসাদ থেকে রক্ষা করে।

অবসর জীবনে অভিজ্ঞতার বিনিয়োগ

অনেক সরকারি বা বেসরকারি চাকুরিজীবী অবসরে যাওয়ার পর মনে করেন তাঁর কাজ শেষ। কিন্তু দীর্ঘ বছরের গভীর অভিজ্ঞতা যদি তিনি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর না করেন, তবে তা হবে মেধার অপচয়। 

ইসলামে ‘অবসর’ মানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়। বয়স ও শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মানানসই কোনো কাজে নিজেকে যুক্ত রাখা একটি শরয়ি দায়িত্ব ও মানবিক প্রয়োজন, যা মানুষকে একাকীত্ব ও মানসিক অবসাদ থেকে রক্ষা করে।

উচ্চমর্যাদাতেও অবিরাম কর্মস্পৃহা

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র.)-কে বৃদ্ধ বয়সেও হাতে দোয়াত-কলম নিয়ে জ্ঞান অন্বেষণে ব্যস্ত দেখে এক ব্যক্তি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি মুসলিমদের ইমাম হয়েও এখনো এটা বয়ে বেড়াচ্ছেন?’ তিনি উত্তর দেন, ‘দোয়াতের সঙ্গে থাকব কবর পর্যন্ত।’ (ইবনুল জাওজি, মানাকিবুল ইমাম আহমাদ, পৃষ্ঠা: ৪৬৩)

আরও পড়ুন

ইসলামে ‘বেকারত্ব’ বা ‘উদ্দেশ্যহীনতা’ অপছন্দনীয়। ওমর (রা.) বলতেন, “দুনিয়া বা আখেরাতের কোনো কাজ ছাড়া উদ্দেশ্যহীনভাবেকাউকে চলাফেরা করতে দেখলে আমার ভীষণ খারাপ লাগে।” (ইবনে আবি শায়বা, আল-মুসান্নাফ: ৩৪১০১; আল-আদাবুশ শারইয়্যাহ: ৩/৬৩০)

দুর্বল, শিশু ও পরিবারের ইতিবাচক ভূমিকা

সমাজের ইতিবাচকতায় দুর্বলদেরও বড় অবদান রয়েছে। নবীজি (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ এই উম্মতকে সাহায্য করেন তাদের দুর্বলদের দোয়া, সালাত এবং ইখলাসের বরকতে।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩১৭০)

কোনো ভালো কাজকেই তুচ্ছ জ্ঞান করো না, এমনকি তোমার ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে দেখা করাকেও।
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬২৬

সমাজের দুর্বল শ্রেণির মানুষের অন্তরের আকুতি পুরো জাতির জন্য বরকত বয়ে আনে। এমনকি ঘরের ছোট শিশুদের নির্মল হাসি ও প্রাণচাঞ্চল্যও একজন বিষণ্ণ বাবার মনে ইতিবাচকতা ফিরিয়ে আনতে পারে। 

সন্তানদের এমনভাবে গড়ে তোলা উচিত যাতে তারা কেবল নিজের কথা না ভেবে অন্যের আবেগ ও বিষণ্ণতা দূর করার শিক্ষা পায়।

কোনো কাজ ছোট নয়

ইতিবাচকতার পথে কোনো ভালো কাজকেই তুচ্ছ মনে করা উচিত নয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, “কোনো ভালো কাজকেই তুচ্ছ জ্ঞান করো না, এমনকি তোমার ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে দেখা করাকেও।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬২৬)

দোজখ থেকে বাঁচতে নবীজি (সা.) সামান্য ত্যাগের গুরুত্ব বোঝাতে বলেছেন, “অর্ধেক খেজুর দান করে হলেও নিজেকে আগুন থেকে রক্ষা করো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪১৭)

কারণ বিন্দুর যোগফলেই সিন্ধু হয়। আল্লাহ বলেছেন, “যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে।” (সুরা জিলজাল, আয়াত: ৭)

আরও পড়ুন