নিরাপদ নগর, সমৃদ্ধ জীবন: চার হাজার বছর আগের দোয়া

ছবি: ফ্রিপিক

একজন নারী সকালে বাড়ি থেকে বের হবেন এবং রাতে নিরাপদে ফিরবেন; পকেটে টাকা থাকলে কেউ ছিনিয়ে নেবে না—এটিই নিরাপদ শহরের স্বপ্ন। আর দ্বিতীয়টি হলো বেকারত্ব থাকবে না, খাবারে ভেজাল থাকবে না এবং সবার অন্ন সংস্থান হবে।

মজার ব্যাপার হলো, এই দুটি বিষয় কিন্তু নতুন কিছু নয়।

মক্কার জন্য প্রার্থনা

সুরা বাকারার ১২৬ নম্বর আয়াতে হজরত ইব্রাহিম (আ.) মক্কা নগরীর জন্য দোয়া করেছিলেন। সেখানে তিনি মাত্র দুটো জিনিস চেয়েছিলেন—‘বালাদান আমিনা’ (একটি নিরাপদ শহর) এবং ‘ওয়ারজুক আহলাহু’ (অধিবাসীদের জন্য রিজিক)।

ইব্রাহিম (আ.) মক্কাকে এমন একটি ভূখণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চেয়েছিলেন যেখানে মানুষ ভয়মুক্ত থাকবে এবং তাদের জীবিকার অভাব হবে না।

কোরআনে তার প্রার্থনা এভাবে উদ্ধৃত হয়েছে, ‘হে আমার প্রতিপালক, এই শহরকে নিরাপদ করে দাও এবং এর অধিবাসীদের ফলমূল দিয়ে রিজিক দান করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৬)

ইমাম ইবনে কাসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে ইব্রাহিম (আ.) মক্কাকে এমন একটি ভূখণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চেয়েছিলেন যেখানে মানুষ ভয়মুক্ত থাকবে এবং তাদের জীবিকার অভাব হবে না। (তাফসির আল-কুরআন আল-আজিম, ১/২৪৫, বৈরুত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ২০০০)

চার হাজার বছর আগের দোয়া

ইব্রাহিম (আ.) এই দোয়া করেছিলেন হাজার হাজার বছর আগে। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বিশ্বের প্রতিটি রাজনীতিবিদ একই কথা বলছেন—নিরাপদ শহর ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন।

রাজধানীর কিছু এলাকায় কিশোর অপরাধ বা ছিনতাইয়ের খবর এলে প্রার্থীরা এলাকা নিরাপদ করার প্রতিশ্রুতি দেন। এটি ঠিক ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই দোয়ার প্রতিধ্বনি—‘রব্বিজআল হাজা বালাদান আমিনা’। আবার বেকারত্ব দূর করার প্রতিশ্রুতি যখন দেওয়া হয়, তা ‘ওয়ারজুক আহলাহু মিনাস সামারাত’-এরই আধুনিক সংস্করণ।

আরও পড়ুন

আল্লাহ মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝেন বলেই ইব্রাহিম (আ.)-কে দিয়ে এই দোয়া শিখিয়েছেন। ইমাম কুরতুবি তাঁর তাফসিরে লিখেছেন যে এই আয়াতে আল্লাহ–তাআলা রাষ্ট্র পরিচালনার দুটি মৌলিক স্তম্ভ নির্দেশ করেছেন—অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।

এই দুটি ছাড়া কোনো সভ্যতা টিকে থাকতে পারে না। (আল-জামি লি আহকামিল কুরআন, ২/১৮৩, বৈরুত: মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ২০০৬)

সুরা কুরাইশ ও হাদিসের বার্তা

সুরা কুরাইশেও আল্লাহ বলছেন, ‘যিনি তাদের ক্ষুধায় খাবার দিয়েছেন এবং ভয় থেকে নিরাপত্তা দিয়েছেন।’ (সুরা কুরাইশ, আয়াত: ৪)

হে আমার প্রতিপালক, এই শহরকে নিরাপদ করে দাও এবং এর অধিবাসীদের ফলমূল দিয়ে রিজিক দান করো।
কোরআন, সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৬

ইমাম তাবারি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে আল্লাহ কোরাইশদের প্রতি তাঁর দুটি বিশেষ অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন—একটি হলো তাদের জীবিকার ব্যবস্থা করা এবং অন্যটি হলো তাদের শত্রুদের ভয় থেকে রক্ষা করা। (জামিউল বায়ান ফি তাফসিরিল কুরআন, ২৪/৫৩৮, কায়রো: দারুল মা'আরিফ)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য: ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি নিরাপদে সকাল করল, তার শরীর সুস্থ থাকল এবং তার কাছে সেদিনের খাবার আছে—তার যেন পুরো দুনিয়া হাতে এসে গেল।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৬)

আরও পড়ুন

আধুনিক মনোবিজ্ঞানের সমর্থন

আব্রাহাম মাসলো ১৯৫৪ সালে তাঁর বিখ্যাত ‘হায়ারার্কি অব নিডস’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে মানুষের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদা দুটি—শারীরিক চাহিদা (খাদ্য, বাসস্থান) এবং নিরাপত্তা। এই দুটি পূরণ না হলে মানুষ উচ্চতর কোনো লক্ষ্যে মনোযোগ দিতে পারে না। (Abraham Maslow, Motivation and Personality, New York: Harper & Row, 1954, pp. 35-46)

কোরআন এই ধ্রুব সত্যটি বলেছে চৌদ্দশ বছর আগে। ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়ায় ‘বালাদান আমিনা’ হলো মাসলোর ‘সেফটি নিডস’ আর ‘ওয়ারজুক আহলাহু’ হলো ‘ফিজিওলজিক্যাল নিডস’।

যে নেতা নিরাপত্তা আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারবেন, কোরআনের শিক্ষানুযায়ী তিনিই সফল।

আমরা কী শিখব

প্রথমত, কোরআন শুধু আধ্যাত্মিক কিতাব নয়; এতে রাষ্ট্রচিন্তা ও সমাজ ব্যবস্থার রূপরেখা আছে।

দ্বিতীয়ত, মানুষের মৌলিক চাহিদা যুগে যুগে একই থাকে। ইব্রাহিম (আ.)-এর সময়েও মানুষ নিরাপত্তা ও জীবিকা চেয়েছে, আজও চায়।

তৃতীয়ত, যে নেতা নিরাপত্তা আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারবেন, কোরআনের শিক্ষানুযায়ী তিনিই সফল।

শেষ কথা নির্বাচনের মৌসুমে প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে যায়, কিন্তু মূল কথা সেই দুটোই থাকে—নিরাপদ ও সমৃদ্ধ জীবন।

[email protected]

মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর : খণ্ডকালীন শিক্ষক, আরবি বিভাগ আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন