ইসলামের ইতিহাসে এমন বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেখানে চরম পাষাণ হৃদয় মোমের মতো গলেছে, শত্রু পরিণত হয়েছে বন্ধুতে এবং অন্ধকারের যাত্রী খুঁজে পেয়েছে হেদায়েতের অমল আলো।
সাহাবি সুমামা ইবনে উসাল (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা এমনই এক ঐতিহাসিক ও বিস্ময়কর অধ্যায়। একসময় যিনি ছিলেন ইসলামের ঘোরতর বিরোধী এবং নবীজির প্রতি যাঁর অন্তরে ছিল অন্ধ বিদ্বেষ, তিনিই পরবর্তী সময়ে নবীজির প্রেমে আত্মহারা একনিষ্ঠ অনুসারীতে পরিণত হন।
তাঁর অন্তরের পর্বতসম ঘৃণার জায়গা দখল করে নিয়েছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা; আর বৈরিতার জায়গায় জন্ম নিয়েছিল ইস্পাতকঠিন ইমান। এই রূপান্তরের পেছনে কোনো সামরিক শক্তি বা জোরজবরদস্তি ছিল না; এর পেছনে কাজ করেছিল নবীজির অনুপম চরিত্রমাধুর্য, বন্দীর প্রতি মানবিক আচরণ ও অতুলনীয় ক্ষমার শক্তি।
রাসুল (সা.) মসজিদে প্রবেশ করে বন্দীর দিকে তাকাতেই তাঁকে চিনতে পারলেন। তিনি সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কি জানো, কাকে বন্দী করে এনেছ?’
ইয়ামামার প্রতাপশালী নেতা
হিজরি ষষ্ঠ সন। ইসলামের শান্তির দাওয়াত তখন মক্কা ও মদিনার গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র আরব উপদ্বীপে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সমকালীন বিভিন্ন রাজা, গোত্রপ্রধান ও পরাশক্তির কাছে ইসলামের আহ্বান জানিয়ে চিঠি পাঠাচ্ছিলেন।
বর্তমান রিয়াদের পার্শ্ববর্তী উর্বর ইয়ামামা অঞ্চলে বাস করত প্রভাবশালী বনু হানিফা গোত্র। সেই গোত্রের অবিসংবাদিত নেতা ও প্রতাপশালী শাসক ছিলেন সুমামা ইবনে উছাল।
নবীজির দাওয়াত সুমামার কাছেও পৌঁছেছিল; কিন্তু বংশীয় অহংকার ও ক্ষমতার দম্ভে তিনি সত্যকে অস্বীকার করেন। তাঁর অন্তরে ইসলামের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ জন্ম নেয়।
তিনি এতটাই উদ্ধত হয়ে উঠেছিলেন যে গোপনে স্বয়ং নবীজিকে হত্যার চক্রান্ত পর্যন্ত করেছিলেন; এমনকি কয়েকজন সাহাবিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন। তবে মহান আল্লাহ তাঁর হাবিবকে শত্রুর যাবতীয় ষড়যন্ত্র থেকে হেফাজত করেন।
মসজিদে নববির খুঁটিতে বন্দী
কিছুদিন পর নজদের দিকে পরিচালিত এক সামরিক অভিযান শেষে মদিনার অশ্বারোহী সাহাবিদের একটি দল ফেরার পথে সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে আটক করে। সাহাবিরা তাঁর আসল পরিচয় জানতেন না।
তাঁকে বন্দী অবস্থায় মদিনায় নিয়ে আসা হয় এবং মসজিদে নববির একটি পিলারের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়।
রাসুল (সা.) মসজিদে প্রবেশ করে বন্দীর দিকে তাকাতেই তাঁকে চিনতে পারলেন। তিনি সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কি জানো, কাকে বন্দী করে এনেছ?’
সাহাবিরা অজ্ঞতা প্রকাশ করলে নবীজি (সা.) বললেন, ‘ইনি ইয়ামামার গোত্রনেতা সুমামা ইবনে উসাল!’ এরপর তিনি সাহাবিদের নির্দেশ দিলেন, ‘তোমরা তাঁর সঙ্গে ভালো আচরণ করো।’
যে ব্যক্তি রক্তপিপাসু শত্রু হিসেবে মদিনায় প্রবেশ করেছিল, সে কোনো অন্ধকার কারাগারে নয়, বরং মুসলমানদের প্রধান কেন্দ্র মসজিদে নববিতে সার্বক্ষণিক অবস্থান করে সাহাবিদের নামাজ, কোরআন পাঠ, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও নবীজির পবিত্র মজলিস প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেল।
বন্দিশালায় মেহমানদারি
শত্রুর প্রতি নবীজির ব্যবহার ছিল এক অলৌকিক শিক্ষা। তিনি নিজের বাড়ি থেকে সুমামার জন্য বিশেষ খাবার পাঠাতেন এবং সকালে ও সন্ধ্যায় তাঁর উটনীর দুধ দোহন করে সুমামাকে পান করাতেন।
বন্দিদশায় কোনো প্রকার শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন তো দূরের কথা, তাঁর নেতৃত্বের আত্মমর্যাদায় সামান্য আঘাতও দেওয়া হয়নি।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘ভালো ও মন্দ কখনো সমান হতে পারে না। তুমি মন্দকে এমন সুন্দর পন্থায় প্রতিহত করো, যা সর্বোৎকৃষ্ট; ফলে তোমার সঙ্গে যার চরম শত্রুতা ছিল, সেও যেন তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হয়ে যাবে।’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৪)
মসজিদে নববির খুঁটিতে দাঁড়িয়ে অহংকারী সুমামা ইসলামের এই রূপ প্রত্যক্ষ করছিলেন।
বন্দিদশায় কোনো প্রকার শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন তো দূরের কথা, তাঁর নেতৃত্বের আত্মমর্যাদায় সামান্য আঘাতও দেওয়া হয়নি।
নিঃশর্ত মুক্তি
রাসুল (সা.) প্রতিদিন সুমামার কাছে আসতেন এবং পরম স্নেহে তাঁর খোঁজ নিতেন।
প্রথম দিন: নবীজি (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে সুমামা! তোমার মনের অবস্থা কী?’ সুমামা আত্মমর্যাদা নিয়ে উত্তর দিলেন, ‘হে মুহাম্মদ! আমার ধারণা ভালো। আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন, তবে একজন রক্তপরাধীকেই হত্যা করবেন (যেহেতু আমি রক্ত ঝরিয়েছি); আর যদি অনুগ্রহ করে মুক্তি দেন, তবে একজন কৃতজ্ঞ মানুষকেই দয়া করবেন। আর যদি সম্পদ চান, তবে বলুন—আপনি যা চাইবেন আমি তা-ই দিতে প্রস্তুত।’
নবীজি (সা.) কোনো মন্তব্য না করে চলে গেলেন।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন: পরদিন এবং তার পরের দিনও রাসুলুল্লাহ (সা.) একই প্রশ্ন করলেন এবং সুমামাও তাঁর আগের বক্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি করলেন।
তৃতীয় দিন আলোচনা শেষে রাসুল (সা.) তাঁর কোনো মুক্তিপণ দাবি করলেন না, কোনো শর্তও আরোপ করলেন না। তিনি শুধু সাহাবিদের দিকে তাকিয়ে এক ঐতিহাসিক নির্দেশ দিলেন, ‘সুমামাকে বাঁধনমুক্ত করে দাও!’
ঘৃণা রূপ নিল ভালোবাসায়
শর্তহীনভাবে মুক্তি পেয়ে সুমামা ইচ্ছে করলেই নিজের রাজ্য ইয়ামামায় ফিরে যেতে পারতেন। কিন্তু নবীজির এই আকাশসম ক্ষমা ও উদারতা তাঁর অন্তরের সমস্ত অহংকারকে চূর্ণ করে দিয়েছিল।
তিনি মুক্ত হয়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে সোজা চলে গেলেন মসজিদের অদূরে এক খেজুরবাগানে। সেখানে গিয়ে কূপের শীতল পানিতে সুন্দরভাবে গোসল করলেন। এরপর ধীর পায়ে পুনরায় মসজিদে নববিতে ফিরে এলেন।
নবীজির সামনে বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে তিনি সমস্বরে পাঠ করলেন, ‘আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু’ (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসুল)।
এরপর নবদীক্ষিত এই সাহাবি নবীজির হাত ধরে আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে ঐতিহাসিক এক স্বীকারোক্তি দিলেন, ‘এই পৃথিবীর বুকে আপনার চেহারার চেয়ে ঘৃণিত কোনো চেহারা আমার কাছে ছিল না; অথচ আজ আপনার পবিত্রমুখই আমার কাছে সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়, আল্লাহর শপথ, আপনার ধর্মের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো ধর্ম আমার কাছে ছিল না; কিন্তু আজ এই ধর্মই আমার কাছে পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে ভালোবাসার ধন। আপনার শহরের চেয়ে অপছন্দের কোনো জনপদ আমার কাছে ছিল না; অথচ আজ এই শহরই আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় ভূমি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৩৭২)
এর আগে প্রকাশ্যে কোনো মুসলমান তালবিয়া পাঠ করার সাহস পায়নি। কোরাইশরা ছুটে এসে তাঁকে ঘিরে ফেলল এবং ক্ষোভের সঙ্গে বলল, ‘সুমামা! তুমিও কি পৈতৃক ধর্ম ত্যাগ করে বেইমান হয়ে গেলে?’
মক্কায় প্রথম প্রকাশ্য তালবিয়া
ইসলাম গ্রহণের পর সুমামা (রা.) বললেন, ‘আমি ওমরাহ করার জন্য বের হয়েছিলাম, কিন্তু পথিমধ্যে আপনার সাহাবিরা আমাকে নিয়ে এসেছেন। এখন আমার কী করণীয়?’ নবীজি (সা.) তাঁকে মোবারকবাদ জানিয়ে ইসলামের নিয়মানুযায়ী ওমরাহ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিলেন।
তিনি মক্কায় প্রবেশ করে কাফেলা নিয়ে প্রকাশ্যে উচ্চকণ্ঠে তালবিয়া পাঠ করতে লাগলেন: ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...’।
এর আগে প্রকাশ্যে কোনো মুসলমান তালবিয়া পাঠ করার সাহস পায়নি। কোরাইশরা ছুটে এসে তাঁকে ঘিরে ফেলল এবং ক্ষোভের সঙ্গে বলল, ‘সুমামা! তুমিও কি পৈতৃক ধর্ম ত্যাগ করে বেইমান হয়ে গেলে?’
সুমামা (রা.) নির্ভীক কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, ‘কখনোই নয়! বরং আমি মুহাম্মাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে আল্লাহর প্রতি ইমান এনেছি। আর শুনে রাখো—আল্লাহর শপথ, ইয়ামামা থেকে মক্কায় গমের একটি দানাও আর আসবে না, যতক্ষণ না আল্লাহর নবী নিজে অনুমতি দেন!’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৩৭২)
সুমামা ইয়ামামায় ফিরে গিয়ে খাদ্য সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলেন। তৎকালীন মক্কার খাদ্যশস্যের সিংহভাগ আসত উর্বর ইয়ামামা থেকে। খাদ্য আমদানির পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মক্কায় তীব্র দুর্ভিক্ষ ও খাদ্যাভাব দেখা দিল।
নিরুপায় হয়ে কোরাইশ নেতারা নবীজির কাছে আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে চিঠি লিখল—তিনি যেন সুমামাকে খাদ্য সরবরাহ চালুর নির্দেশ দেন। নবীজি অনুমতি দিলেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন্নববিয়্যাহ, ২/৬৩৮-৬৩৯)।
মাহমুদ হাসান ফাহিম: শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, গাজীপুর