বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতি ও পশ্চিমা গণমাধ্যমে যে প্রত্যয়টিকে সবচেয়ে বেশি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা হলো ‘ইসলামি শরিয়া’। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণায় শরিয়াকে প্রায়শই চিত্রিত করা হয় মধ্যযুগীয় কঠোরতা, নারীর অবদমন বা সহিংসতার সমার্থক এক ব্যবস্থা হিসেবে।
তুলনামূলক আইন-ইতিহাসে এ ধরনের বিকৃত উপস্থাপনার পূর্ববর্তী দৃষ্টান্তও পাওয়া যায়—যেমন ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপে ইহুদি ধর্মীয় বিধান ‘হালাখা’কেও অনুরূপভাবে সন্দেহ ও আতঙ্কের চোখে দেখা হয়েছিল।
ঐতিহাসিক সূত্র, ধ্রুপদি ইসলামি আইনদর্শন (উসুলুল ফিকহ) এবং কোরআন-হাদিসের মূল পাঠ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়—মুসলিম আইনবিদদের ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যায় শরিয়াকে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও কল্যাণমুখী একটি ব্যাপক নৈতিক-আইনি কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
হার্ভার্ড ল স্কুলের ইসলামিক লিগ্যাল স্টাডিজ প্রোগ্রামের পরিচালক ড. ইনতিসার রাব্ব ও অধ্যাপক নোয়াহ ফেল্ডম্যানের মতো সমসাময়িক গবেষকরাও তাঁদের রচনায় উল্লেখ করেছেন যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ইসলামি আইনব্যবস্থা তার সমকালীন বিশ্বের তুলনায় যথেষ্ট কাঠামোবদ্ধ ও ভারসাম্যমূলক একটি আইনি ঐতিহ্য ছিল। (নোয়াহ ফেল্ডম্যান, দ্য ফল অ্যান্ড রাইজ অব দ্য ইসলামিক স্টেট, প্রিন্সটন: প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৮)
ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘শরিয়া’ শব্দের আভিধানিক অর্থ, মরুভূমিতে প্রবাহিত স্বচ্ছ পানির উৎস বা ঝরনাধারা, যেখান থেকে তৃষ্ণার্ত মানুষ ও প্রাণী জীবন ধারণের উপকরণ সংগ্রহ করে।
শরিয়ার অর্থ কী
ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘শরিয়া’ শব্দের আভিধানিক অর্থ, মরুভূমিতে প্রবাহিত স্বচ্ছ পানির উৎস বা ঝরনাধারা, যেখান থেকে তৃষ্ণার্ত মানুষ ও প্রাণী জীবন ধারণের উপকরণ সংগ্রহ করে। (ইবনে মানজুর, লিসানুল আরব)
পারিভাষিক অর্থে এটি আল্লাহ কর্তৃক মানবজীবনের পথনির্দেশনা হিসেবে প্রবর্তিত বিধিবিধানের সামগ্রিক কাঠামোকে বোঝায়। পবিত্র কোরআনে এসেছে, “তিনি নবীকে ধর্মের একটি সুস্পষ্ট পথনির্দেশনা (শরিয়ত) ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং তাঁকে অজ্ঞদের খেয়ালখুশি নয়, বরং সেই পথ অনুসরণ করতে বলেছেন। (সুরা জাসিয়া, আয়াত: ১৮)
সমসাময়িক ইসলামি আইনশাস্ত্রবিদদের পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্লাসিক্যাল ফিকহ গ্রন্থাবলির (যেমন ইমাম শাফেয়ির আল-উম্ম বা মালেকি আল-মুদাওয়ানা) বিষয়বস্তু বিন্যাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ফৌজদারি দণ্ডবিধি (হুদুদ ও কিসাস) সংক্রান্ত অধ্যায়গুলো সামগ্রিক ফিকহি সাহিত্যের একটি তুলনামূলক ক্ষুদ্র অংশ দখল করে আছে।
অধিকাংশ বিষয়বস্তু জুড়ে রয়েছে ইবাদত (নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ), মুআমালাত (লেনদেন, চুক্তি, ব্যবসা), পারিবারিক আইন (বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার) এবং সামাজিক নীতিশাস্ত্র। (হাশিম কামালি, শরিয়াহ ল: অ্যান ইন্ট্রোডাকশন, অক্সফোর্ড: ওয়ানওয়ার্ল্ড পাবলিকেশনস, ২০০৮, পৃষ্ঠা: ৪৪–৪৬)
এই কাঠামোগত বাস্তবতা উপেক্ষা করে শরিয়াকে কেবল দণ্ডবিধির সমার্থক হিসেবে উপস্থাপন করা আইনশাস্ত্রীয় দৃষ্টিতে একপেশে।
ইসলামি আইনদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো ‘মাকাসিদুশ শারিয়াহ’ বা শরিয়তের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বিষয়ক আলোচনা। ইমাম গাজালি এবং পরবর্তী সময়ে ইমাম শাতিবি এই তত্ত্বকে পদ্ধতিগতভাবে বিকশিত করেন।
শরিয়তের পাঁচটি মৌলিক উদ্দেশ্য
ইসলামি আইনদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো ‘মাকাসিদুশ শারিয়াহ’ বা শরিয়তের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বিষয়ক আলোচনা। ইমাম গাজালি এবং পরবর্তী সময়ে ইমাম শাতিবি এই তত্ত্বকে পদ্ধতিগতভাবে বিকশিত করেন। তাঁদের মতে, শরিয়তের বিধিবিধানের লক্ষ্য হলো মানুষের পাঁচটি মৌলিক বিষয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা:
১. জীবনের সুরক্ষা: কোরআনে বলা হয়েছে, একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল। (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৩২)।
২. বুদ্ধিবৃত্তির সুরক্ষা: মাদকদ্রব্য ও বিচারবুদ্ধি বিনষ্টকারী উপাদান নিষিদ্ধকরণের মাধ্যমে মানসিক সুস্থতা রক্ষা।
৩. ধর্ম ও বিশ্বাসের সুরক্ষা: বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনের সুরক্ষা।
৪. বংশ ও পরিবারের সুরক্ষা: অবৈধ যৌনতা ও পারিবারিক বিশৃঙ্খলা রোধের মাধ্যমে সামাজিক কাঠামোর স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ।
৫. সম্পদের সুরক্ষা: চুরি, প্রতারণা ও অন্যায় শোষণ নিষিদ্ধকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। (আল-গাজালি, আল-মুসতাসফা মিন ইলমিল উসুল, পৃ. ১৭৪, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৩; আশ-শাতিবি, আল-মুওয়াফাকাত ফি উসুলিশ শরিয়াহ, ২/৮-১০, বৈরুত: দারুল মা‘রিফাহ, ১৯৯৭)
পরবর্তীকালে আধুনিক মুসলিম চিন্তাবিদ মুহাম্মদ তাহির ইবনে আশুর তাঁর মাকাসিদুশ শারিয়াতিল ইসলামিয়্যাহ (তিউনিস, ১৯৪৬) গ্রন্থে এই পাঁচটি মূলনীতির সঙ্গে ‘মানবিক মর্যাদা’ ও ‘স্বাধীনতা’কে অতিরিক্ত মাকাসিদ হিসেবে যুক্ত করার প্রস্তাব দেন।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম লেখেন যে ইসলামের সামগ্রিক ভিত্তি রচিত হয়েছে ইহকাল ও পরকালে বান্দার কল্যাণ ও প্রজ্ঞার ওপর; তাঁর মতে, যে কোনো বিধান ন্যায়বিচার থেকে অবিচারের দিকে, দয়া থেকে নিষ্ঠুরতার দিকে কিংবা কল্যাণ থেকে অকল্যাণের দিকে ধাবিত হয়, তা প্রকৃত শরিয়তের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না, যদিও তাকে কোনো অপব্যাখ্যার মাধ্যমে শরিয়তের নামে চালানোর চেষ্টা করা হোক না কেন। (ইবনুল কাইয়িম, ই‘লামুল মুওয়াক্কিঈন আন রাব্বিল আলামিন, ৩/১৪–১৫, দারুল জিল, বৈরুত)
অমুসলিম নাগরিকদের অধিকার
ঐতিহ্যবাহী ইসলামি আইনশাস্ত্রে শত্রুতার ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত না হওয়ার নির্দেশ রয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন ন্যায়বিচার পরিত্যাগে প্ররোচিত না করে, এবং সুবিচার করাকে তাকওয়ার সর্বাধিক নিকটবর্তী বলে অভিহিত করা হয়েছে। (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৮)
অমুসলিম নাগরিকদের অধিকার সংরক্ষণ সম্পর্কে হাদিসে রাসুল (সা.) সতর্ক করেছেন যে যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিকের ওপর জুলুম করবে, তার অধিকার খর্ব করবে, সামর্থ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপাবে কিংবা সম্মতি ছাড়া সম্পদ গ্রহণ করবে, কেয়ামতের দিন তিনি নিজেই সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগকারী হবেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩০৫২)
ঐতিহাসিকভাবে এই নীতিগত কাঠামোর একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিফলন পাওয়া যায় দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের শাসনামলে জেরুজালেম বিজয়ের সময় প্রণীত ‘উমরি চুক্তি’তে, যেখানে খ্রিষ্টান অধিবাসীদের উপাসনালয়, সম্পত্তি ও ধর্মীয় অনুশীলনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। (তাবারি, তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক, ৪/১৫৯-১৬০)
তুলনামূলক আইন-ইতিহাসের গবেষকরা প্রায়ই উসমানীয় সাম্রাজ্যের ‘মিল্লাত ব্যবস্থা’-কেও এই নীতির একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে অমুসলিম সম্প্রদায়গুলো নিজস্ব ধর্মীয় ও পারিবারিক আইন অনুসরণের স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত। (বেঞ্জামিন ব্রাউড ও বার্নার্ড লুইস, ক্রিশ্চিয়ানস অ্যান্ড জিউস ইন দি অটোমান এম্পায়ার, নিউইয়র্ক: হোমস অ্যান্ড মেয়ার পাবলিশার্স, ১৯৮২)
ইসলামি আইনশাস্ত্রে জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী সহিংসতা বা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চারকে ‘হিরাবাহ’ (প্রকাশ্য দস্যুতা ও সন্ত্রাস) নামক একটি স্বতন্ত্র ও গুরুতর অপরাধ-শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জননিরাপত্তা, সন্ত্রাস ও নাগরিক দায়বদ্ধতা
ইসলামি আইনশাস্ত্রে জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী সহিংসতা বা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চারকে ‘হিরাবাহ’ (প্রকাশ্য দস্যুতা ও সন্ত্রাস) নামক একটি স্বতন্ত্র ও গুরুতর অপরাধ-শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৩৩)
অমুসলিম-প্রধান রাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলিম সংখ্যালঘুদের জন্য সনাতন ফিকহি নীতি হলো আবাসস্থলের আইন ও সামাজিক চুক্তি মেনে চলা, যার মূলনীতি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে মুসলমানরা তাদের পারস্পরিক অঙ্গীকার ও শর্তের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৩৫২)
এই নীতিকে সমসাময়িক ফিকহি পরিভাষায় ‘সংখ্যালঘু ফিকহ’ নামে একটি পৃথক শাস্ত্র হিসেবেও বিকশিত করা হয়েছে।
মোটকথা, ইসলামি আইনদর্শনের দৃষ্টিতে শরিয়া একটি ব্যাপক নৈতিক-আইনি কাঠামো, যার কেন্দ্রে রয়েছে জীবন, বিবেক, পরিবার, সম্পদ ও বুদ্ধিবৃত্তির সুরক্ষা। মুসলিম আইনবিদদের ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যা অনুযায়ী এর লক্ষ্য নাগরিকের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
তবে একে বস্তুনিষ্ঠভাবে অনুধাবন করার পাশাপাশি এর ঐতিহাসিক প্রয়োগ ও আধুনিক ব্যাখ্যা নিয়ে চলমান একাডেমিক বিতর্কগুলোও বিবেচনায় রাখা জরুরি, যা একে আরও সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক আলোচনার বিষয়ে পরিণত করবে।