পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে ‘দীন’ শব্দটি ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়েছে। একদিকে আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য দিন হচ্ছে ইসলাম।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯)
আবার অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দীন (ধর্ম) অনুসরণ করবে, তার পক্ষ থেকে তা কখনো কবুল করা হবে না।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮৫)
এই আয়াতগুলো থেকে অনেকের মনে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে, ‘দীন’ বা ধর্ম শব্দটি কেবল ইসলামের জন্যই নির্ধারিত। ফলে অন্য কোনো জীবনব্যবস্থাকে ‘দীন’ বা ধর্ম বলা শরিয়তসম্মত নয়। বরং মতবাদ বলা যেতে পারে।
কিন্তু কোরআনের সামগ্রিক ভাষ্য ও আরবি ভাষার ব্যাকরণিক প্রয়োগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ধারণাটি একটি তাত্ত্বিক অস্পষ্টতা থেকে তৈরি হয়েছে।
কোরআনি প্রয়োগে ‘দীন’ শব্দের ব্যবহার
কোরআন মাজিদ কেবল ইসলামকে ‘দীন’ বলেনি, বরং অমুসলিমদের বিশ্বাস ও জীবনপদ্ধতিকেও ‘দীন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, সুরা কাফিরুনের শেষ আয়াতে বলা, “তোমাদের জন্য তোমাদের দীন এবং আমার জন্য আমার দীন।”
এখানে কাফেরদের ইবাদত পদ্ধতিকেও দীন বলা হয়েছে। আবার ফেরাউনের উদ্ধৃতি দিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, “আমি আশঙ্কা করছি যে সে (মুসা) তোমাদের দীন পরিবর্তন করে দেবে।” (সুরা গাফির, আয়াত: ২৬)
এমনকি ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনিতে তৎকালীন মিসরের রাজার আইনকে ‘দীনুল মালিক’ বা রাজার ধর্ম বলা হয়েছে। (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৭৬)
কেন কিছু মানুষের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হলো যে ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে দীন বলা যাবে না? এর পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করে।
ইমাম তাবারি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, এখানে দীন বলতে আল্লাহর নির্ধারিত সঠিক জীবনপদ্ধতি ও মানুষের আবিষ্কৃত বা বিকৃত পদ্ধতি—উভয়কেই বোঝানো হয়েছে। (ইমাম তাবারি, জামিউল বায়ান, ১৮/১১৪, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত: ২০০১)
অর্থাৎ, ভাষাগত দিক থেকে দীন একটি সাধারণ বিশেষ্য, যা যেকোনো বিশ্বাস বা আনুগত্যের ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে।
বিভ্রান্তির উৎস
কেন কিছু মানুষের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হলো যে ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে দীন বলা যাবে না? এর পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করে:
১. নাম ও গুণের মধ্যে পার্থক্য করতে না পারা: অনেকে মনে করেন দীন মানেই ‘সঠিক ধর্ম’। কিন্তু এটি ব্যাকরণগত ভুল। দীন একটি নাম মাত্র। একে বিশেষণ দিয়ে বিশেষায়িত করা হয়। যেমন—দীনুল হক (সত্য ধর্ম) বা দীনুল বাতিল (মিথ্যা ধর্ম)।
সুতরাং অন্য ধর্মকে দীন বললে তার সত্যতা স্বীকার করা হয় না, বরং তাদের একটি বিশ্বাস ব্যবস্থা আছে—এটুকুই প্রকাশ পায়।
২. আকিদাকে ভাষার প্রয়োগের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা: ইসলামি আকিদা অনুযায়ী সব নবী ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। ইহুদি বা খ্রিষ্টধর্ম মূলত ইসলামেরই বিকৃত রূপ। এই আকিদাগত সত্যটি যখন আমরা সমকালীন বাস্তবতায় প্রয়োগ করি, তখন ভাষাগত জটিলতা তৈরি হয়।
বর্তমানে পৃথিবীতে প্রচলিত ধর্মগুলো একটি সামাজিক বাস্তবতা। কোরআন এই বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে বরং তাদের পদ্ধতিকেও দীন নামেই সম্বোধন করেছে, যদিও সেগুলোকে ‘বাতিল’ বা প্রত্যাখ্যাত বলে ঘোষণা দিয়েছে। (ইমাম মাওয়ার্দি, আন-নুকাত ওয়াল উয়ুন, ৩/৩৩৮, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)
পবিত্র কোরআন নিজেই যখন অমুসলিমদের বিশ্বাসকে দীন বলেছে, তখন আমাদের উচিত সেই পরিভাষাটিই গ্রহণ করা। এটি একটি বর্ণনামূলক শব্দ, যা কোনো ব্যবস্থার সত্যতা নিশ্চিত করে না।
৩. দীন বনাম ‘শরিয়ত’ বিতর্ক: কেউ কেউ মনে করেন দীন একটিই, তবে ‘শরিয়ত’ বা বিধান ভিন্ন ভিন্ন। এটি তাত্ত্বিকভাবে সত্য হলেও ভাষাগতভাবে দীন শব্দের বহুবচন ‘আদইয়ান’ বা ‘ধর্মসমূহ’ বলায় কোনো বাধা নেই। যেহেতু একেকটি জাতি একেকটি ব্যবস্থার আনুগত্য করে, তাই সেগুলোকে পৃথক পৃথক ‘দিন’ হিসেবে চিহ্নিত করা ভাষার দাবি।
‘গ্রহণযোগ্য দীন’ বনাম ‘লৈখিক পরিচয়’
সুরা আলে ইমরানের ১৯ নম্বর আয়াতে যখন বলা হয় “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট দীন হলো ইসলাম”, তখন এর অন্তর্নিহিত অর্থ হলো ‘গ্রহণযোগ্য ধর্ম’ বা ‘নাজাতের ধর্ম’। আরবি অলংকারশাস্ত্রে একে উহ্য গুণের প্রয়োগ বলা হয়।
অর্থাৎ আল্লাহর কাছে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থা দীন হিসেবে গণ্য হওয়ার যোগ্য নয়, যদিও মানুষের কাছে তা ‘দীন’ হিসেবে পরিচিত।
পবিত্র কোরআন নিজেই যখন অমুসলিমদের বিশ্বাসকে দীন বলেছে, তখন আমাদের উচিত সেই পরিভাষাটিই গ্রহণ করা। এটি একটি বর্ণনামূলক শব্দ, যা কোনো ব্যবস্থার সত্যতা নিশ্চিত করে না।
পরিভাষা নিয়ে কড়াকড়ি না করে কোরআনের ব্যাপক অর্থবোধক ও উদার ব্যবহারিক পদ্ধতি অনুসরণ করাই অধিক যুক্তিযুক্ত। এতে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব যেমন বজায় থাকে, তেমনি সমকালীন বাস্তবতাকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করাও সহজ হয়।