কেয়ামত কবে হবে, তা কেবল মহান আল্লাহই জানেন। তবে কেয়ামত আসার আগে পৃথিবীতে বেশ কিছু অস্বাভাবিক ও মহাজাগতিক পরিবর্তন দেখা দেবে, যেগুলোকে ইসলামি পরিভাষায় ‘আশরাতুস সাআ’ বা কেয়ামতের আলামত বলা হয়।
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, কেয়ামতের ছোট আলামতগুলোর অধিকাংশই ইতোমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। এখন অপেক্ষা কেবল ‘বড় আলামত’ বা মহাপ্রলয়ের চূড়ান্ত সংকেতগুলোর।
নবীজিকে যখন কেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি সুনির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে প্রস্তুতির ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি প্রশ্নকারীকে বলেছিলেন, “তুমি কেয়ামতের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ?” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৬৭)
মূলত কেয়ামতের আলামতগুলো আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো মুমিনদের ঈমানি সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং পরকালের পাথেয় সংগ্রহে উদ্বুদ্ধ করা।
বড় আলামত বনাম ছোট আলামত
কেয়ামতের আলামত মূলত দুই প্রকার। ছোট আলামতগুলো কেয়ামতের অনেক আগে থেকেই শুরু হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলে। যেমন—মহানবীর আগমন, ফেতনা বৃদ্ধি পাওয়া, অযোগ্যদের শাসনভার লাভ এবং মানুষের মধ্যে আমানতদারি কমে যাওয়া।
অন্যদিকে, বড় আলামতগুলো কেয়ামতের ঠিক আগমুহূর্তে প্রকাশিত হবে। এগুলো হবে অত্যন্ত ভয়ংকর ও অলৌকিক প্রকৃতির। রাসুল (সা.) এই বড় আলামতগুলোর উপমা দিতে গিয়ে বলেছেন, এগুলো যেন একটি সুতোয় গাঁথা দানার মালার মতো, যার সুতো ছিঁড়ে গেলে দানাগুলো একটির পর একটি দ্রুত পড়ে যেতে থাকে।
কেয়ামতের বড় আলামতগুলো প্রধানত দুই ধরনের: পরিচিত বা মানবিক পর্যায়ের (যেমন দাজ্জাল বা নবী ঈসার পুনরাগমন) এবং মহাজাগতিক বা অপরিচিত পর্যায়ের (যেমন পশ্চিম দিক দিয়ে সূর্যোদয় বা অদ্ভুত প্রাণীর আত্মপ্রকাশ)।
ইমাম মাহদির আগমন
কেয়ামতের বড় আলামতগুলোর মধ্যে প্রথমটির নাম হলো ইমাম মাহদির প্রকাশ। তিনি শেষ জামানায় মুসলিম উম্মাহর নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন। তার নাম হবে মুহাম্মদ এবং পিতার নাম হবে আবদুল্লাহ—যা সরাসরি নবীজির নামের সঙ্গে মিলবে।
তিনি পৃথিবীকে ন্যায় ও ইনসাফে পূর্ণ করে দেবেন, যেমনটি আগে অন্যায় ও জুলুমে ভরে গিয়েছিল (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪২৮২)
বর্তমান পৃথিবীর অনেক অশান্তি ও জুলুমের অবসান ঘটবে তার মাধ্যমে।
দাজ্জালের ফেতনা
পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ফেতনা বা পরীক্ষা হবে দাজ্জালের আবির্ভাব। সে নিজেকে ঈশ্বর হিসেবে দাবি করবে এবং নানা রকম জাদুকরি ক্ষমতা দেখিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করবে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, “দাজ্জাল হবে একচোখা, কিন্তু তোমাদের প্রতিপালক একচোখা নন” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৪০৮)
দাজ্জাল পূর্ব দিক থেকে খোরাসান হয়ে আবির্ভূত হবে এবং মক্কা-মদিনা ছাড়া সারা পৃথিবী ভ্রমণ করবে। তার হাতে থাকবে জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতীক, কিন্তু বাস্তবে তার জান্নাত হবে জাহান্নাম আর জাহান্নাম হবে জান্নাত।
নবী ঈসার অবতরণ
দাজ্জালের ফেতনা যখন চরমে পৌঁছাবে, তখন সিরিয়ার দামেস্কের সাদা মিনারের ওপর ফেরেশতাদের ডানায় ভর করে অবতরণ করবেন হজরত ঈসা (আ.)। তিনি দাজ্জালকে হত্যা করবেন এবং পৃথিবীতে ইসলামের শাসন কায়েম করবেন।
পবিত্র কোরআনে তার অবতরণকে কেয়ামতের অন্যতম চিহ্ন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, “নিশ্চয়ই তিনি (ঈসা) কেয়ামতের একটি বড় নিদর্শন; সুতরাং তোমরা কেয়ামতের বিষয়ে কোনো সন্দেহ কোরো না।” (সুরা জুখরুফ, আয়াত: ৬১)
তিনি দীর্ঘ সময় পৃথিবীতে অবস্থান করবেন, বিয়ে করবেন এবং পরিশেষে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করার পর তাকে নবীজির পবত্রি রওজার পাশে দাফন করা হবে।
ইয়াজুজ-মাজুজের আত্মপ্রকাশ
ঈসা (আ.)-এর সময়েই ইয়াজুজ ও মাজুজ নামক এক বিশাল মানবগোষ্ঠী মুক্তি পাবে। তারা পৃথিবীর উত্তর দিকের একটি পাহাড়ের আড়ালে জুলকারনাইনের তৈরি করা প্রাচীরে বন্দি রয়েছে। তারা মুক্ত হয়ে পৃথিবীর সব পানি পান করে ফেলবে এবং ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “এমনকি যখন ইয়াজুজ ও মাজুজকে মুক্তি দেওয়া হবে, তখন তারা প্রতিটি উচ্চভূমি থেকে দ্রুতবেগে ধাবিত হবে।” (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৯৬)
পরিশেষে আল্লাহর নির্দেশে একটি মহামারিতে তারা সবাই মারা যাবে।
পশ্চিম আকাশে সূর্যোদয়
কেয়ামতের অন্যতম অলৌকিক আলামত হলো সূর্য তার উদয়স্থল পরিবর্তন করবে। একদিন সকালে সূর্য পূর্বের পরিবর্তে পশ্চিম দিকে উদিত হবে। এটি হবে তওবার দরজা বন্ধ হওয়ার চূড়ান্ত সংকেত।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “ততক্ষণ পর্যন্ত কেয়ামত হবে না যতক্ষণ না পশ্চিম দিক দিয়ে সূর্য উদিত হবে। যখন মানুষ তা দেখবে, তখন সবাই বিশ্বাস আনবে, কিন্তু তখন আর কারো বিশ্বাস বা তওবা কাজে আসবে না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৭)
অদ্ভুত প্রাণীর উদ্ভব
সূর্যোদয়ের পর পৃথিবী থেকে একটি অদ্ভুত প্রাণী নির্গত হবে, যাকে বলা হয় ‘দাব্বাতুল আরদ’। এটি মানুষের সঙ্গে কথা বলবে এবং মানুষের কপালে বিশ্বাসী (মুমিন) ও অবিশ্বাসী (কাফির) চিহ্ন এঁকে দেবে।
পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, “যখন কেয়ামতের ঘোষণা কার্যকর হওয়ার সময় আসবে, তখন আমি তাদের সামনে মাটি থেকে একটি প্রাণী নির্গত করব, যে তাদের সঙ্গে কথা বলবে।” (সুরা নমল, আয়াত: ৮২)
ধোঁয়া ও তিনটি ভূমিধস
কেয়ামতের আগে আকাশ থেকে একটি ঘন ধোঁয়া নেমে আসবে যা সারা পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে। এছাড়া তিনটি বড় ধরনের ভূমিধস হবে—একটি পূর্বে, একটি পশ্চিমে এবং একটি আরব উপদ্বীপে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯০১)
এই ঘটনাগুলো বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের অস্থিরতা ও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেবে।
চূড়ান্ত সংকেত: ইয়েমেনের আগুন
কেয়ামতের সর্বশেষ বড় আলামত হলো ইয়েমেনের আদন বা সমুদ্রের তলদেশ থেকে একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ড নির্গত হবে। এই আগুন মানুষকে তাড়া করে সিরিয়ার দিকে নিয়ে যাবে, যা হবে মানুষের পুনরুত্থান বা হাশরের ময়দানের প্রাথমিক ধাপ।
মহানবী (সা.) বলেছেন, “সর্বশেষে ইয়েমেন থেকে একটি আগুন বের হবে যা মানুষকে হাশরের ময়দানের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯০১)
কেয়ামতের এই বড় আলামতগুলো কেবল কোনো রূপকথার গল্প নয়, বরং আমাদের বিশ্বাসের অংশ। এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবী চিরস্থায়ী নয়। কেয়ামত কখন হবে তা নিয়ে গবেষণার চেয়ে কেয়ামতের জন্য আমরা কতটুকু তৈরি, সেটিই বড় প্রশ্ন।