মরক্কোর ফেজ শহরের পুরোনো অলিগলিতে হাঁটতে হাঁটতে তালাআ কাবিরা সড়কে এসে দাঁড়ালে একটা দরজার সামনে থমকে যেতে হয়। ঘোড়ার নালের আকৃতির সেই দরজা, তার চারপাশে খোদাই করা স্টাকো, আর ভেতরে সিডার কাঠের অসাধারণ কারুকাজ—সব মিলিয়ে মনে হয় এটা যেন কোনো প্রাসাদের প্রবেশপথ।
এটাই বু ইনানিয়া মাদ্রাসা, মরক্কোর একমাত্র মাদ্রাসা; যেখানে জুমার নামাজও আদায় হতো। এই মাদ্রাসাকে এখন মারিনিদ স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নমুনা বলে গণ্য করা হয়।
এক পিতৃহন্তা সুলতানের অনুশোচনা
মাদ্রাসার পেছনের গল্পে একটা রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার কথা শোনা যায়। চতুর্দশ শতকে মারিনিদ সাম্রাজ্য যখন তার শক্তির শিখরে, তখন সুলতান আবুল হাসানের রাজত্বের সীমানা ছড়িয়ে গিয়েছিল তিউনিস পর্যন্ত। কিন্তু তার নিজের পুত্র আবু ইনান ফারিস ১৩৪৮ সালে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নিজেকে সুলতান ঘোষণা করেন।
ক্ষমতা পেলেও পিতার বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহের বোঝা তাঁর অন্তরে গভীরভাবে চেপে বসেছিল। অনুশোচনায় কাতর আবু ইনান আলেমদের ডেকে এনে জিজ্ঞেস করেছিলেন কীভাবে তিনি ক্ষমা পেতে পারেন। আলেমরা তাঁকে পরামর্শ দেন, শহরের একটা ময়লার ভাগাড় বেছে নিয়ে সেখানে জ্ঞানভবন গড়ে তুলতে। এভাবে একটি নোংরা জায়গাকে পবিত্র করে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের কলুষিত অন্তরকে শুদ্ধ করতে পারেন।
সুলতান আবু ইনান ফারিস যেহেতু নিজের পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সিংহাসনে বসেছিলেন, তাই নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে এমন একটা বিশাল ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র তাঁর জন্য ছিল প্রায় অপরিহার্য একটা বিনিয়োগ।
গল্পটা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়, কিংবদন্তি হিসেবেই টিকে আছে। যদিও ইসলামি চিন্তায় ভালো কাজের মাধ্যমে অতীতের ভুল মুছে ফেলার ধারণাটা গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সৎ কর্মগুলো মন্দ কর্মগুলোকে দূরীভূত করে দেয়।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ১১৪)
তবে এটা নিশ্চিত যে সুলতান আবু ইনান ফারিস যেহেতু নিজের পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সিংহাসনে বসেছিলেন, তাই নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে এমন একটা বিশাল ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র তাঁর জন্য ছিল প্রায় অপরিহার্য একটা বিনিয়োগ।
তা ছাড়া মারিনিদদের রাজনৈতিক কৌশলও ছিল এমনই। আগের আলমোহাদ শাসকেরা যে ধর্মীয় ধারা অনুসরণ করত, সুন্নি অর্থোডক্স ধর্মতত্ত্বে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। মারিনিদরা ক্ষমতায় এসে নিজেদের সেই অর্থোডক্স সুন্নি ইসলামের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন, আর তার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো মাদ্রাসা।
ফেজের স্বাধীনচেতা ও প্রভাবশালী আলেমসমাজের আনুগত্য আদায় করা, আর সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের ধর্মপ্রাণ শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা—এই দুটোই ছিল মাদ্রাসা পৃষ্ঠপোষকতার অন্যতম লক্ষ্য।
নির্মাণের পেছনের আরেক গল্প
মাদ্রাসার ভেতরের শিলালিপি অনুযায়ী এর নির্মাণকাজ শুরু হয় ৭৫১ হিজরির ২৮ রমজান (১৩৫০ খ্রি.) আর শেষ হয় ৭৫৬ হিজরিতে। এই পাঁচ বছরে যে অর্থ ব্যয় হয়েছিল, তা সেই যুগের হিসাবে রীতিমতো বিস্ময়কর।
একটা প্রচলিত আখ্যান বলে, নির্মাণ তত্ত্বাবধায়কেরা যখন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সুলতানের সামনে মোট খরচের হিসাব পেশ করেন, তখন আবু ইনান সেই হিসাবের খাতাটা ছিঁড়ে নদীতে ফেলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘যা সুন্দর, তা কখনো বেশি দামি নয়, খরচ যত বেশিই হোক।’
মাদ্রাসার পুরো ব্যয়ভার আসত ওয়াক্ফ বা দাতব্য ট্রাস্ট থেকে। শিলালিপিতে এমন বহু সম্পত্তি ও আয়ের উৎসের তালিকা পাওয়া যায়, যা সুলতান নিয়মিতভাবে এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনার জন্য উৎসর্গ করেছিলেন।
মাদ্রাসার উত্তর-পশ্চিম কোণে উঠে গেছে ইটের তৈরি একটা মিনার। মরক্কোর হাতে গোনা কয়েকটা মাদ্রাসার মধ্যে এই মিনার একটা, যা প্রমাণ করে এখানে জুমার নামাজ আদায় হতো।
পাথর, কাঠ আর আলোর কবিতা
মাদ্রাসার প্রাণকেন্দ্র একটা আয়তাকার মার্বেল বিছানো উঠান, মাঝখানে একটা ফোয়ারা। উঠানের তিন পাশ ঘিরে আছে সরু গ্যালারি, আর তার ওপরের তলায় ছাত্রদের থাকার কুঠুরি। উঠানের পূর্ব ও পশ্চিম পাশে দুটি বড় কক্ষ, যেগুলো শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
কক্ষগুলোর গঠন এতটাই উচ্চাভিলাষী যে গবেষকেরা একে কায়রোর সুলতান হাসান মাদ্রাসার ইওয়ান স্থাপত্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং অনুমান করেছেন যে স্থপতি সম্ভবত মিসরীয় স্থাপত্যরীতির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন।
দেয়ালের নিচের অংশ ঢাকা আছে জটিল জ্যামিতিক নকশার জেলিজ মোজাইক টাইলসে, তার ওপরে আরবি ক্যালিগ্রাফির একটা ব্যান্ড, আর তার ওপরে খোদাই করা স্টাকোর অলংকরণ—আরাবেস্ক নকশা, মুকারনাস, আর আরও ক্যালিগ্রাফি। সবচেয়ে ওপরে সিডার কাঠের ছাউনি, যার ওপর খোদাই করা আছে আরও অলংকরণ। এক বহুস্তরীয় অলংকরণে শুধু চোখ জুড়িয়ে যায়।
প্রার্থনাকক্ষের দিকে যাওয়ার পথে একটা ছোট্ট খাল আছে, যার পানি আসে ফেজ নদীর একটা শাখা থেকে। এই খাল দুটো ছোট সেতু দিয়ে পার হতে হয়। মাদ্রাসার উত্তর-পশ্চিম কোণে উঠে গেছে ইটের তৈরি একটা মিনার। মরক্কোর হাতে গোনা কয়েকটা মাদ্রাসার মধ্যে এই মিনার একটা, যা প্রমাণ করে এখানে জুমার নামাজ আদায় হতো।
মাদ্রাসার ঠিক বিপরীতে আছে দার আল-মাগানা বা ‘ঘড়ির ঘর’; যার সম্মুখভাগে একসময় একটা জলচালিত ঘড়ি বসানো ছিল। এই ঘড়ির প্রতিটা ঘণ্টায় একটা ধাতব গোলক একটা পিতলের বাটিতে পড়ে শব্দ করত, আর একই সঙ্গে একটা জানালার শাটার খুলে যেত। ঠিক কীভাবে এই যান্ত্রিক বিস্ময়টা কাজ করত, তা আজও পুরোপুরি বোঝা যায়নি।
ক্লাসরুম–রাজদরবার পাশাপাশি
এখানে যা পড়ানো হতো, তার মূলভিত্তি ছিল মালেকি মাজহাবের ফিকহ; যা মারিনিদদের রাষ্ট্রীয় মাজহাব। তবে পাঠ্যক্রম শুধু ধর্মীয় বিষয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; কোরআন আর ফিকহের পাশাপাশি ব্যাকরণ, অলংকারশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা, গণিত আর জ্যোতির্বিদ্যাও পড়ানো হতো (ফেজের ইতিহাস, উইকিপিডিয়া)।
এই বিস্তৃত পাঠ্যক্রমের একটা বড় উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের প্রশাসন চালানোর মতো দক্ষ কর্মকর্তা তৈরি করা— মাদ্রাসা থেকে পাস করা আলেমরাই পরে সুলতানের প্রশাসনে কাজ করতেন।
১৩৫৪ সালের পর ইবনে খালদুন ফেজে আসেন আর সুলতান আবু ইনানের অধীনে রাজকীয় ফরমান লেখার দায়িত্ব পান, ঠিক যে সময়টায় বু ইনানিয়া গড়ে উঠছিল।
এই সংযোগটা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ইবনে খালদুনের মধ্য দিয়ে। ১৩৫৪ সালের পর তিনি ফেজে আসেন আর সুলতান আবু ইনানের অধীনে রাজকীয় ফরমান লেখার দায়িত্ব পান, ঠিক যে সময়টায় বু ইনানিয়া গড়ে উঠছিল। পরে রাজদরবারের চক্রান্তে জড়িয়ে তাকে প্রায় দুই বছর কারাবন্দীও থাকতে হয়েছিল।
তবু এত আয়োজন, এত অর্থ ব্যয় করেও বু ইনানিয়া কখনো ফেজের সবচেয়ে পুরোনো শিক্ষাকেন্দ্র কারাউইয়িনকে টপকাতে পারেনি। কয়েক শতক পর উচ্চশিক্ষার মূল কেন্দ্র হিসেবে কারাউইয়িনই আবার প্রাধান্য পায়। সপ্তদশ শতকে এক ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মাদ্রাসাটি একাধিকবার সংস্কার করা হয়েছে, আর বিংশ শতকেও এর অলংকরণে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনার কাজ হয়েছে।
আজকের বু ইনানিয়া
আজ এই ভবন আর কোনো সক্রিয় মাদ্রাসা নয়। ছাত্রকুঠুরিগুলো খালি, আর পুরো কাঠামোটা এখন ফেজের প্রাচীন মেদিনার একটা সংরক্ষিত অংশ—১৯৮১ সালে যা ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় উঠে আসে।
মরক্কোর যে কয়েকটা মসজিদে অমুসলিমদের প্রবেশের অনুমতি আছে, এটা তার একটা—উঠান পর্যন্ত দর্শনার্থীরা যেতে পারেন, যদিও প্রার্থনাকক্ষে প্রবেশ নিষেধ।
প্রবেশমূল্যের টাকাটা এখন খরচ হয় সাত শতক পুরোনো এই কাঠামো টিকিয়ে রাখার কাজে। ফলে সপ্তদশ শতকের ভূমিকম্প আর আঠারো-বিংশ শতকের একাধিক সংস্কারের পরও যা এখনো দাঁড়িয়ে আছে।
সূত্র: জোনাথন এম ব্লুম, আর্কিটেকচার অব দ্য ইসলামিক ওয়েস্ট, নিউ হ্যাভেন ও লন্ডন: ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২০