কথা মানুষের ব্যক্তিত্বের অন্যতম পরিচয়। একটি সুন্দর ও মার্জিত বাক্য যেমন মানুষের হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দিতে পারে, তেমনি একটি অসতর্ক কথা কারও সম্মান, সম্পর্ক এবং আত্মমর্যাদায় গভীরভাবে আঘাত হানতে পারে।
অনেক সময় মুখের একটি ছোট ভুলও আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরনিন্দা (গিবত) এমনই এক ভয়াবহ পাপ, যা অনেক সময় মানুষ অজান্তেই নিজের কথাবার্তার মাধ্যমে করে ফেলে।
তাই একজন মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব হলো, নিজের জিবকে সংযত রাখা এবং সর্বাত্মক চেষ্টা করা, যেন তার কথা কারও সম্মানহানি বা কষ্টের কারণ না হয়।
নিচে পরনিন্দা বা গিবত থেকে আত্মরক্ষার ৭টি বাস্তব উপায় তুলে ধরা হলো।
১. কথা বলার আগে ভাবা
জিব আল্লাহর দেওয়া অমূল্য নেয়ামতগুলোর একটি। তবে এর সঠিক ব্যবহার না হলে এটিই মানুষের ক্ষতির কারণ হতে পারে। অনেক সময় চিন্তাহীন একটি সাধারণ বাক্য থেকেই গিবতের সূচনা হয়।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ইমান রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৩৮)
কোনো কথা বলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, কথাটি কি সত্য? এটি কি প্রয়োজনীয়?
এটি কি কারও সম্মান ক্ষুণ্ন করবে? যদি এসব প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক না হয়, তবে নীরব থাকাই শ্রেয়।
২. জিবকে কল্যাণকর কাজে ব্যস্ত রাখা
অর্থহীন আলোচনা ও গিবতের অন্যতম কারণ হলো অবসর সময়ের অপব্যবহার। তাই জিবকে এমন কাজে ব্যস্ত রাখা উচিত, যা দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় ক্ষেত্রেই কল্যাণকর।
কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, ইস্তিগফার ও দোয়ার মাধ্যমে জিবকে পবিত্র কাজে নিয়োজিত রাখা যায়।
হাদিসে এসেছে, নবীজি (সা.) এক ব্যক্তিকে বলেছিলেন, ‘তোমার জিহ্বা যেন সর্বদা আল্লাহর জিকিরে সিক্ত থাকে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৭৫)
আল্লাহর স্মরণে জিব ব্যস্ত থাকলে অনর্থক কথা ও গিবতে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা অনেকাংশে কমে যায়।
৩. গিবতের আসর এড়িয়ে চলা
কোনো মজলিশে যদি কারও অনুপস্থিতিতে তার সমালোচনা শুরু হয়, তবে নীরব শ্রোতা হয়ে থাকা উচিত নয়। সম্ভব হলে আলোচনার বিষয় পরিবর্তন করা কিংবা বিনয়ের সঙ্গে গিবত থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া উচিত। পরিস্থিতি অনুকূল না হলে সে স্থান ত্যাগ করাই উত্তম।
কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘যখন তুমি দেখবে তারা আমার আয়াত নিয়ে অনর্থক আলোচনায় লিপ্ত, তখন তারা অন্য প্রসঙ্গে না যাওয়া পর্যন্ত তাদের থেকে দূরে থাকো।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ৬৮)
যদিও আয়াতটি নির্দিষ্ট একটি প্রসঙ্গে নাজিল হয়েছে, তবে এর শিক্ষা সব ধরনের গুনাহপূর্ণ ও অনর্থক আলোচনা থেকে দূরে থাকার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
৪. অপরের নয়, নিজের দোষ খোঁজা
অন্যের দোষ খোঁজার পরিবর্তে নিজের আমল, চরিত্র ও দুর্বলতাগুলো সংশোধনের চেষ্টা করা একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
যে ব্যক্তি নিয়মিত আত্মসমালোচনা করে, তার কাছে অন্যকে নিয়ে ভাবা এবং তার ত্রুটি নিয়ে সমালোচনার আগ্রহ ও সুযোগ কমে যায়।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের হিসাব নাও, তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগে।’ (মুসনাদে ফারুক: ২/৬১৮)
নিজের ভুল নিয়ে চিন্তা করলে হৃদয়ে বিনয় সৃষ্টি হয়, অহংকার দূর হয় এবং অন্যের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায়।
৫. অন্যের সম্মান রক্ষার অভ্যাস গড়ে তোলা
একজন মুমিন যেমন নিজের সম্মান রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন, তেমনি অন্য মুসলিম ভাই-বোনের সম্মান রক্ষাকেও নিজের দায়িত্ব মনে করেন। কারও দুর্বলতা প্রকাশ না করে তার জন্য দোয়া করা এবং গোপনে সংশোধনের চেষ্টা করাই ইসলামের শিক্ষা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অপর কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ–তাআলা ইহকাল ও পরকাল—উভয় জগতেই তার দোষ গোপন রাখবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)
৬. মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করা
মৃত্যুর স্মরণ মানুষের অন্তরকে কোমল করে এবং তাকে দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করে। যে ব্যক্তি মনে রাখে, একদিন তাকে আল্লাহর সামনে প্রতিটি কথা ও কাজের জবাব দিতে হবে, সে সহজে কারও সম্মানহানি করতে পারে না।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিনষ্টকারী তথা মৃত্যুকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ১৮২৩)
মৃত্যুচিন্তা মানুষের অন্তরে জবাবদিহির অনুভূতি জাগ্রত করে এবং জিবকে সংযত রাখতে শক্তিশালী প্রেরণা জোগায়।
৭. গিবত হয়ে গেলে দ্রুত তওবা করা
মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তবে অসাবধানতায় কারও গিবত হয়ে গেলে সেটিকে হালকা করে দেখা উচিত নয়। বরং দ্রুত আল্লাহর কাছে তওবা করা, ভবিষ্যতে এ গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার দৃঢ় সংকল্প করা এবং যার গিবত করা হয়েছে তার জন্য দোয়া করা উচিত।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, হে মুমিনগণ, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩১)
সত্যিকারের তওবা মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং একই ভুল পুনরাবৃত্তি থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে।
আল্লাহ–তাআলা আমাদের সবাইকে গিবত থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।
রায়হান আল ইমরান: লেখক ও গবেষক