নারীদের শিক্ষায় উম্মে সালামার অবদান

ছবি: পেক্সেলস

উম্মে সালামা নিজে ছিলেন বিদ্যানুরাগী এবং তিনি ছিলেন নারীদের বিদ্যার্জনের অন্যতম সারথি। বিশেষত তিনি নারীদের উদ্বুদ্ধ করতেন ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠবার জন্য।

উম্মে সালমা ভালো করেই জানতেন, মা-ই একজন সন্তানের প্রথম বিদ্যানিকেতন। জীবনের প্রাথমিক ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎবর্যবহ শিক্ষাটি সন্তান পেয়ে থাকে তার মায়ের কোলেই। একটি আদর্শবান ও ধর্মীয় সমাজ গঠনে নারীদের জ্ঞান অর্জনের বিকল্প নেই।

রাসুলের জীবদ্দশাতে এবং তাঁর ইন্তিকালের পর আরও নিবিড়ভাবে তিনি নারী শিক্ষার জাগরণে আত্মনিয়োগ করেন। নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় মাসায়েল এবং রাসুলের রেখে-যাওয়া দীক্ষায় উজ্জীবিত করতে থাকেন মুসলিম নারীদের। বিশেষত নারীদের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিধিবিধান, যেগুলো কাউকে জিজ্ঞাসা করতে তারা সাধারণত লজ্জাবোধ করে; দাম্পত্য জীবনের নানাবিধ অনুষঙ্গ উম্মে সালামা তাদের খুলে খুলে বলতেন নিজের জীবনের লব্ধ অভিজ্ঞতা এবং নববি দীক্ষার আলোকে।

ইসলামে একজন নারীর পোশাকের বিধান কী, শরীরের কতটুকু তার জন্য ঢেকে রাখা আবশ্যক, তাদের বিশেষ পবিত্রতার জন্য করণীয় কী, স্বামী বিয়োগান্তে একজন নারী সর্বোচ্চ কত দিন শোক পালন করতে পারবে—এসব শেখাতে থাকেন তিনি আন্তরিকভাবে। উম্মুল হাসান বলেন, ‘তাদেরকে উম্মে সালামা বলেছেন, রাসুল ফাতিমা (রা.)-এর কাপড়ের ঝুল এক বিঘত পরিমাণ নির্ধারণ করে দেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১,৭৩২)

এই হাদিসে উম্মুল হাসানের বক্তব্যটি লক্ষণীয়। তিনি আমাদের জানাচ্ছেন, উম্মে সালামা ‘তাদের’ বলেছেন। এ থেকে অনায়াসেই উপলব্ধ হয়, উম্মে সালামা হাদিসের মজলিস করতেন; উম্মুল হাসানকে একাকী বলেননি হাদিসটি, বরং আরও অনেক নারীর উপস্থিতিতে রাসুলের বক্তব্যটি তাদের শুনিয়েছেন উম্মে সালামা।

আবু উবাইদের কন্যা সাফিয়্যা বলেন, ‘নবিপত্নী উম্মে সালামা আমাদের নবীজির সূত্রে জানিয়েছেন—আল্লাহ এবং কেয়ামত-দিবসের ওপর বিশ্বাস রাখে, এমন কোনো নারীর কোনো মৃতের জন্য তিন দিনের অধিক শোক পালন করা বৈধ নয়; স্বামীর কথা আলাদা। কারণ, স্বামী মারা গেলে সে শোক পালন করবে চার মাস দশ দিন। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩,৫০৪)

এবং স্বামীহারা নারীর শোক পালন-সংক্রান্ত বিধান বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি আরও বলেছেন, কোনো নারীর স্বামী মারা গেলে সে রঙিন পোশাক, কারুকার্যখচিত জামা ও অলংকার পরবে না। ব্যবহার করবে না খিজাব ও সুরমা।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২,৩০৪)

উম্মুল হাসান আমাদের জানিয়েছেন, উম্মে সালামা তাকে বলেছেন, ‘নবীজি তাঁর কোনো স্ত্রী ঋতুবতী হলে তার সঙ্গে তিন দিন মিলন-বিরত থাকতেন। তিন দিন পর স্বাভাবিকভাবেই মিলিত হতেন।’ (আল-মুজামুল কাবির, ৩৩/৩৬৫)

আবার নিফাস (গর্ভস্রাব) থেকে পবিত্র হওয়া সংক্রান্ত বিধান শেখাতে গিয়ে নবজির সূত্রে তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদে শিখিয়েছেন, ‘রাসুলের যুগে নিফাসগ্রস্ত মহিলারা ৪০ দিন বা ৪০ রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন। আর আমরা আমাদের মুখমণ্ডলের দাগ দূর করার জন্য তাতে ওয়ার্স (এক প্রকার সুগন্ধিযুক্ত ঘাস বিশেষ) ঘষে দিতাম।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩১১)

এই হাদিসগুলো থেকেও আমরা জানতে পারি, নারীদের শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে উম্মে সালামার বিশেষ আগ্রহ ছিল—তাদের প্রয়োজনীয় বিষয়াবলির শিক্ষা দেওয়া; বিশেষত তাদের দাম্পত্য জীবনের জন্য আবশ্যকীয় বিষয়গুলো এবং যে সকল প্রয়োজনীয় বিষয় কাউকে জিজ্ঞেস করে নিতে তারা লজ্জাবোধ করত, সেসব তিনি অধিক সাগ্রহে তাদের শেখাতেন।

আরও পড়ুন

দুই.

উম্মে সালামার শিক্ষাদানের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি কোরআনের কোনো আয়াত ও তার হুকুম বর্ণনা শেষে ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য এবং আয়াতের মর্মার্থ শিক্ষার্থীদের আরও গভীরভাবে হৃদয়ঙ্গম করানোর লক্ষ্যে নবীজির বর্ণনা ও তাঁর জীবদ্দশায় ঘটিত সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি শিক্ষার্থীদের সামনে হাজির করতেন।

একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। “হে নবী, আপনার স্ত্রী-কন্যাদের এবং অন্যান্য মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন নিজেদের চাদরের কিয়দাংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়।” (সুরা আহজাব (৩৩), আয়াত: ৫৯)

এখন আয়াত অনুযায়ী শরীরে চাদর টেনে দেওয়ার পন্থা কী হবে! যারা রাসুলের সময়কাল পাননি, তাদের জন্য বিষয়টা পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করাটা একটু জটিলই। তবে তখনকার কোনো দৃষ্টান্ত যদি তাদের সামনে হাজির থাকে, তাহলে আর জটিলতা থাকে না।

তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদের আয়াতটির উদ্দেশ্য বোঝানোর জন্য তখনকার ঘটনা হাজির করেছেন। উপস্থিত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “এ আয়াতটি যখন নাজিল হলো, তখন থেকে আনসারি নারীরা তাদের মাথায় এমন চাদর জড়িয়ে বের হতেন, (চাদরের রঙ কালো হওয়ায়) মনে হতো, যেন কাক বসে আছে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪,১০১)

তাঁর শিক্ষা প্রদানের আরেকটি বৈশিষ্ট্যের কথা আমরা স্মরণ করতে পারি! নবীজির উপস্থিতিতে কোনো নারী একটি কাজ করেছেন আর তিনি তাতে বাধা প্রদান না করে মৌনভাবে সম্মতি দিয়েছেন—সাহাবিদের এমন কাজকর্মের কথা তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদের অবগত করাতেন। যেমন, নবীজির সময়ে নারীরা তাঁর সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে উপস্থিত হতেন। নিজেদের শরীর চাদরে এমনভাবে মুড়ে তারা মসজিদ থেকে ফিরতেন, ধূসর অন্ধকারের কারণে তাদের চিনে ওঠা সম্ভব হতো না। (আল-মুজামুল কাবির, ২৩/৩৫৫)

তিনি কেবল বিধিবিধানই শিক্ষা দিতেন না, বরং প্রতিজন শিক্ষার্থীকে তিনি আল্লাহ ও আখিরাতমুখী করবার জন্য বিশেষ প্রয়াস চালাতেন। শিক্ষার্থীদের সতর্ক করতে বলেছেন, ‘নবীজি এক রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে বললেন—সুবহানাল্লাহ, আজ রাতে কত ফিতনা নাজিল করা হলো! রহমতের কত ভাণ্ডার আজ পাঠানো হলো! কিন্তু কে জাগিয়ে দেবে বাড়িঘরের লোকগুলোকে! ওরে, শুনে রাখো, দুনিয়ার বহু পোশাকপরিহিতা আখিরাতে উলঙ্গ হয়ে যাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১,১২৬)

আরও পড়ুন

তিন.

উম্মে সালামা ঘরোয়া মজলিস করতেন, নিয়ম করে নারীদের সামনে হাজির করতেন নবীজির শিক্ষা—এসবের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, নবিজির বাণীর প্রচার। যে কারণে আমরা দেখি, তিনি নবীজির এমন বাণীও পৌঁছে দিচ্ছেন তাঁর শিক্ষার্থীদের কাছে, যা ইচ্ছা করলে তিনি আড়াল করলেও করতে পারতেন।

ঘটনাটি আমাদের জানাচ্ছেন উম্মে সালামার ছাত্রী রুমাইসা বিনতেল হারিস। উম্মে সালামা একবার আয়েশার বিরুদ্ধে নালিশ নিয়ে হাজির হলেন নবীজির সামনে। সব শুনে নবীজি তাঁকে বলেন, ‘তোমরা আমাকে আয়েশার ব্যাপারে কষ্ট দিও না। আল্লাহর শপথ, তোমাদের মধ্যে কেবল আয়েশার লেপের মধ্যে থাকাবস্থাতেই আমার কাছে ওহি এসেছে। আর কারুর সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠতার মুহূর্তে এ রকম ঘটনা ঘটেনি।’

নবীজির মুখে এমন উচ্চারণ শুনে সতর্ক হয়ে যান উম্মে সালমা। আল্লাহর নামে শপথ বাক্য উচ্চারণ করে বলেন, ‘আমার থেকে দ্বিতীয়বার আর এমন ভুল হবে না। আয়েশার ব্যাপারে আপনাকে আর কষ্ট দেব না।’ (মুসনাদে আবি ই’লা, ৬/২৯১; আল-মুজামুল কাবির, ২৩/৩৬২)

চার.

তিনি নবীজির হাদিস কাজে-কর্মে প্রায়োগিকভাবেও দেখিয়ে দিতেন। তাঁর শিক্ষার্থীদের কাছে বর্ণনা করেছেন, নবিজি (সা.) বলেছেন, ‘শিশুপুত্রের প্রস্রাবে পানি ছিটিয়ে দিতে হবে। আর কন্যাশিশু প্রস্রাব করলে তা ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে।’ (মুসনাদে আবি ই’লা, ৬/২৫২।)

উম্মুল হাসান বলেন, ‘তিনি উম্মে সালামাকে দেখেছেন, শক্ত খাদ্য গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি দুগ্ধপোষ্য ছেলের প্রস্রাবে পানি ছিটিয়ে দিতেন। আর শক্ত খাদ্য গ্রহণ শুরু করলে তাদের প্রস্রাব করা কাপড় ধুয়ে ফেলতেন। আর তিনি মেয়েশিশুর প্রস্রাবের কাপড়ও ধুয়ে ফেলতেন।’(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৭৯।)

যা কিছু কল্যাণকর মনে হতো তাঁর কাছে—নবিজির শেখানো আমল, নবিজির উচ্চারিত দোয়াবাক্য, নবীজির ব্যাখ্যাত কোরআনের কোনো আয়াত—সব তিনি শেখাতেন তাঁর কাছে আগত মেয়েদের। নারীদের ধর্মীয় জ্ঞান শেখানোর প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ।

কেননা, উম্মে সালামা বেশ ভালোভাবেই জানতেন, মা যদি ধার্মিক হয়, মা যদি হয় খোদাভীরু—তাহলে সমাজের চিত্রই পালটে যাবে। সমস্ত সমাজই ইসলামের আলোয় হয়ে উঠবে আলোকিত।

আহমাদ সাব্বির: আলেম ও লেখক

আরও পড়ুন