প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইসলামের ৫ বিধান

ছবি: পেক্সেলস

জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে বড় সংকট। ইসলামে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করাকে মানুষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব বা পৃথিবীতে ঐশী প্রতিনিধিত্বের (খিলাফত) অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

পরিবেশ ও প্রকৃতি সুরক্ষায় ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি নির্দেশনা এবং এর একাডেমিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।

১. বৃক্ষরোপণ সদকায়ে জারিয়া

ইসলামে গাছ লাগানো, বনায়ন করা এবং তার যত্ন নেওয়াকে সাধারণ কোনো সামাজিক কাজ নয়, বরং আমৃত্যু সওয়াব পাওয়ার মাধ্যম বা ‘সদকায়ে জারিয়া’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

যদি কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তটিও এসে উপস্থিত হয় এবং তোমাদের কারও হাতে একটি গাছের চারা থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে দেয়।
মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২৯০২

বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে উৎপাদিত ফল, অক্সিজেন বা ছায়া থেকে মানুষ, পশুপাখি বা কীটপ্রত্যঙ্গ যা-ই উপকৃত হবে, তার সওয়াব রোপণকারীর আমলনামায় সদকা হিসেবে যুক্ত হতে থাকবে। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ৫/৪, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি)

মহানবী (সা.) এ বিষয়ে কতটা জোর দিয়েছেন, তা তাঁর একটি যুগান্তকারী হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়। তিনি বলেছেন, ‘যদি কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তটিও এসে উপস্থিত হয় এবং তোমাদের কারও হাতে একটি গাছের চারা থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে দেয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২৯০২)

আরও পড়ুন

২. অপ্রয়োজনে গাছ কাটায় নিষেধাজ্ঞা

বিনা কারণে সবুজ গাছপালা কাটা বা বনের ক্ষতি করা ইসলামি শরিয়তে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.) যখন রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করেন, তখন সেনাপতিদের প্রতি শরিয়তের পরিবেশ নীতি স্পষ্ট করে ১০টি ঐতিহাসিক নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম ছিল কোনো ফলবান গাছ না কাটা এবং শস্যখেত ধ্বংস না করা। (ইমাম মালেক বিন আনাস, আল-মুয়াত্তা, ২/৪৪৭, দারুল ঘারব আল-ইসলামি, বৈরুত, ১৯৯৭)

এমনকি সাধারণ পরিস্থিতিতেও গাছ কাটার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দিয়ে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে কোনো বরই গাছ। (বা মরুভূমির ছায়াদানকারী গাছ) কাটবে, আল্লাহ তাকে উপুড় করে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫২৪১)

নদী বা সমুদ্রের মতো উন্মুক্ত ও বিশাল জলাশয়ের পাশে বসেও অজু বা গোসলের সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা মাকরুহ।

৩. পানির অপচয় রোধ ও জলাশয় সংরক্ষণ

পানির অপচয় রোধ করা এবং প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলো দূষণমুক্ত রাখা ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা অপচয়ের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, ‘আর তোমরা অপচয় করো না, নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)

নদী বা সমুদ্রের মতো উন্মুক্ত ও বিশাল জলাশয়ের পাশে বসেও অজু বা গোসলের সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা মাকরুহ। (ইবনে কুদামাহ, আল-মুগনি, ১/১৪৮, মাকতাবাতুল কাহেরা, কায়রো, ১৯৬৮)

হাদিস শরিফে এসেছে, মহানবী (সা.) এক সাহাবিকে অজুর সময় অতিরিক্ত পানি ব্যয় করতে দেখে সতর্ক করে বললেন, ‘প্রবহমান নদীর তীরে বসেও যদি তুমি অজু করো, তবু অপচয় করো না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫)

আরও পড়ুন

৪. প্রাকৃতিক সম্পদের সুষম বণ্টন

আলো, বাতাস ও পানির মতো প্রাকৃতিক উপাদানগুলো যাতে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে এবং কেউ যেন তা দূষিত বা এককভাবে কুক্ষিগত না করে, শরিয়তে সেই সামষ্টিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

ইসলামে প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত পানির উৎস, চারণভূমি ও উন্মুক্ত জ্বালানি সাধারণ মানুষের যৌথ সম্পদ; রাষ্ট্রপ্রধানেরও এগুলোকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির স্বার্থে একচেটিয়া অধিকার দেওয়ার সুযোগ নেই। (ইমাম আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, ১/১১৮, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, ১৯৭৯)

মহানবী (সা.) সামাজিক এই অধিকারের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘মুসলমানরা তিনটি বিষয়ে সমান অংশীদার: পানি, চারণভূমি ও আগুন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৪৭৭)

৫. জনাকীর্ণ স্থানে পরিবেশদূষণ রোধ

রাস্তাঘাট, মানুষের বিশ্রামের স্থান ও পানির উৎসগুলো নোংরা করাকে ইসলামে অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মানুষের চলাচলের পথ কিংবা ছায়াদার বৃক্ষের নিচে ময়লা ফেলা বা প্রস্রাব-পায়খানা করা জঘন্য অপরাধ। কারণ, এটি মানুষের কষ্টের কারণ হয় এবং পরিবেশের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট করে। (ইমাম নববি, শারহু সহিহ মুসলিম, ৩/১৬১, দারুল ইহয়া আত-তুরাস আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৭২)

ইমানের ৭০টির বেশি শাখা রয়েছে, যার মধ্যে সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু (ময়লা-আবর্জনা) সরিয়ে দেওয়া।
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৫

এই প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা অভিশাপ বয়ে আনা তিনটি কাজ থেকে বেঁচে থাকো: পানির ঘাটে, রাস্তার মাঝে এবং ছায়াদার স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করা।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬)

পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখাকে ইসলামে ইমানের অংশ ঘোষণা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইমানের ৭০টির বেশি শাখা রয়েছে, যার মধ্যে সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু (ময়লা-আবর্জনা) সরিয়ে দেওয়া।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৫)

এ ছাড়া বিনা কারণে যেকোনো পশুপাখি হত্যা বা তাদের খাঁচায় আটকে রেখে কষ্ট দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মহানবী (সা.) বলেছেন, একটি বিড়ালকে আটকে রেখে খাবার না দিয়ে মেরে ফেলার কারণে এক নারীকে জাহান্নামে যেতে হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৬৫)

কার্বন নিঃসরণ, নির্বিচারে বনাঞ্চল ধ্বংস কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো আধুনিক বৈশ্বিক সংকটের মূল কারণ মানুষের সীমাহীন লোভ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ স্পষ্ট বলেছেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।’ (সুরা রুম, আয়াত: ৪১)

আরও পড়ুন