খাদিজার প্রতি নবীজির ভালোবাসা

ছবি: পেক্সেলস

ইসলামের ইতিহাসে হজরত খাদিজাতুল কুবরা এমন এক নাম, যাঁর সঙ্গে আল্লাহর রাসুলের সম্পর্ক কেবল স্বামী–স্ত্রীর সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল ভালোবাসা, আস্থা, আত্মত্যাগ, সহযোগিতা ও ইমানি দৃঢ়তার এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত।

নবীজির জীবনে খাদিজা (রা.) ছিলেন প্রথম স্ত্রী, প্রথম বিশ্বাসী, প্রথম সহযোদ্ধা ও সর্বাধিক নির্ভরতার আশ্রয়। তাঁর প্রতি রাসুলের ভালোবাসা ছিল গভীর, স্থায়ী ও মৃত্যুর পরও অমলিন।

খাদিজার জীবদ্দশায় রাসুল (সা.) আর কোনো বিয়ে করেননি। এটি তাঁর প্রতি নবীজির ভালোবাসা ও সম্মানের এক উজ্জ্বল প্রমাণ। সামাজিক ও পারিবারিক বাস্তবতায় বহুবিবাহ তখন স্বাভাবিক হলেও খাদিজার উপস্থিতিতে নবীজি (সা.) তাঁর হৃদয়ের ভালোবাসা অন্য কারও সঙ্গে ভাগ করেননি।

আয়েশা নিজেই বলেছেন, রাসুলের অন্য কোনো স্ত্রীর প্রতি তাঁর এমন ঈর্ষা ছিল না, যেমনটি ছিল খাদিজার প্রতি। কারণ, নবীজির মুখে বারবার খাদিজার প্রশংসা শুনে মনে হতো, তিনি যেন এখনো তাঁদের জীবনে উপস্থিত।

এই একনিষ্ঠতা প্রমাণ করে—খাদিজা (রা.) কেবল স্ত্রী নন; বরং রাসুলের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন। (সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ, ১১/১৫৭)

খাদিজার ইন্তেকালের পরও নবীজির স্মৃতিতে তিনি ছিলেন জীবন্ত। বিভিন্ন সময় তাঁর কথা উঠলেই নবীজি (সা.) প্রশংসায় ভরে উঠতেন। তাঁর মহত্ত্ব, ত্যাগ ও অবদান স্মরণ করতেন গভীর আবেগে।

এ কারণে হজরত আয়েশা (রা.) কখনো কখনো ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়তেন; যদিও খাদিজার সঙ্গে তাঁর কোনো দিন সাক্ষাৎই হয়নি। আয়েশা নিজেই বলেছেন, রাসুলের অন্য কোনো স্ত্রীর প্রতি তাঁর এমন ঈর্ষা ছিল না, যেমনটি ছিল খাদিজার প্রতি।

কারণ, নবীজির মুখে বারবার খাদিজার প্রশংসা শুনে মনে হতো, তিনি যেন এখনো তাঁদের জীবনে উপস্থিত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩,৮১৮, শামাইলুর রাসুল, ১/৪৮০–৪৮১)

আরও পড়ুন

নবীজির ভালোবাসা কেবল কথায় সীমাবদ্ধ ছিল না, তা বাস্তব আচরণেও প্রকাশ পেত। খাদিজার মৃত্যুর পরও তাঁর বান্ধবীদের প্রতি বিশেষ যত্নবান ছিলেন রাসুল (সা.)। কোনো পশু জবাই হলে তা কেটে খাদিজার বান্ধবীদের কাছে পাঠাতেন।

কাউকে কিছু দিতে গিয়ে বলতেন, ‘অমুককে দিয়ে আসো, সে ছিল খাদিজার বান্ধবী।’ এভাবে তিনি খাদিজার স্মৃতিকে সম্মানের সঙ্গে জীবিত রেখেছিলেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৭০০৭)

খাদিজার বোন হালা বিনতে খুওয়াইলিদ যখন একদিন নবীজির কাছে সাক্ষাৎ করতে আসেন। তাঁর কণ্ঠস্বর শুনেই রাসুল (সা.) আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, যেন খাদিজা (রা.) ফিরে এসেছেন।

এ ঘটনায় আয়েশা (রা.) ঈর্ষা প্রকাশ করলে নবীজি (সা.) দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, আল্লাহর কসম, খাদিজার চেয়ে উত্তম কাউকে আল্লাহ দান করেননি। মানুষ যখন আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তখন খাদিজা সত্য বলে গ্রহণ করেছিলেন, সবাই যখন শত্রু ছিল, তখন তিনিই ছিলেন আশ্রয়, কেউ সাহায্যে এগিয়ে না এলে খাদিজা নিজের সম্পদ দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

এই বক্তব্যে খাদিজার প্রতি নবীজির কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। (মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বল, ৬/১১৭, আল মু’জামুল কাবির, ১৩/২৩)

আল্লাহর কসম, খাদিজার চেয়ে উত্তম কাউকে আল্লাহ দান করেননি। মানুষ যখন আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তখন খাদিজা সত্য বলে গ্রহণ করেছিলেন।
হাদিস, মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বল, ৬/১১৭

একাধিক ঘটনায় দেখা যায়, খাদিজার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে নবীজির হৃদয়ের আবেগ। খাদিজার এক খাদেমা যখন রাসুলর কাছে আসেন, তখন তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলেন নবীজি (সা.)। কারণ, তিনি ছিলেন খাদিজার স্মৃতির অংশ।

এমনকি বদর যুদ্ধের পর বন্দী আবুল আস ইবনে রবির মুক্তিপণ হিসেবে যখন খাদিজার দেওয়া একটি মুক্তার হার আসে, সেটি দেখে নবীজি (সা.) গভীরভাবে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। সাহাবিদের অনুরোধ করেন, হারটি ফিরিয়ে দিয়ে বন্দীকে মুক্ত করতে।

সাহাবিরাও নবীজির মর্মবেদনা উপলব্ধি করে সম্মতি জানান। এটি প্রমাণ করে, খাদিজার স্মৃতি নবীজির হৃদয়ে কতটা গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। (সিরাতে ইবনে হিশাম, ১/৬৫৩)

এই গভীর ভালোবাসার পেছনে কারণও ছিল বহু। প্রথম কারণ, নবুয়ত পাওয়ার পর প্রথম যিনি নির্দ্বিধায় ইমান এনেছিলেন, তিনি খাদিজা (রা.)। ওহি অবতরণের পর ভয় ও অস্থিরতায় কাঁপতে কাঁপতে নবীজি যখন ঘরে ফিরে আসেন, তখন খাদিজা (রা.) তাঁকে আশ্বস্ত করেন।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, আল্লাহ কখনো এমন একজন মানুষের অপমান করবেন না, যিনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অসহায়দের সাহায্য করেন, অতিথিদের সম্মান করেন এবং বিপদগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ান। এই কথাগুলো কেবল সান্ত্বনা ছিল না; বরং নবীজির মিশনের প্রতি খাদিজার দৃঢ় বিশ্বাসের প্রকাশ। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩)

খাদিজা (রা.) সর্বাবস্থায় নবীজির পাশে ছিলেন। সংকট, নির্যাতন, অবরোধ—সব পরিস্থিতিতে তিনি অবিচল ছিলেন। এ জন্যই নবীজি (সা.) তাঁকে নিজ যুগের শ্রেষ্ঠ নারীদের একজন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, মারিয়াম বিনতে ইমরানের সঙ্গে তুলনা করে। তাঁর এই মর্যাদা কেবল পারিবারিক সম্পর্কের কারণে নয়; বরং ইমান, চরিত্র ও আত্মত্যাগের কারণেই।

নবীজির সন্তানদের অধিকাংশের মা ছিলেন খাদিজা (রা.)। ইব্রাহিম (আ.) ছাড়া বাকি সব সন্তান তাঁর গর্ভেই জন্ম নিয়েছেন। শুধু তা–ই নয়, খাদিজার পরিবার ছিল ইসলামের প্রথম কেন্দ্র। এখানেই প্রথম তাওহিদের ঘোষণা হয়েছে, নামাজ কায়েম হয়েছে ও পবিত্র কোরআনের ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছে।

তিনি নিজের সম্পদ, শক্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন ইসলামের জন্য। শিয়াবে আবি তালিবের কঠিন অবরোধের সময় নিজের জন্য পাঠানো খাবার অন্য মুসলমানদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন।

এই পরিবারেই বড় হয়েছেন ইতিহাসখ্যাত সাহাবিরা, যেমন আলী ইবনে আবি তালেব, জায়েদ ইবনে হারেসা, উম্মে আয়মান প্রমুখ। অর্থাৎ খাদিজার ঘর ছিল ইসলামের প্রথম পাঠশালা।

ইসলাম প্রচারে খাদিজা (রা.) ছিলেন নবীজির একান্ত সহযোগী। তিনি নিজের সম্পদ, শক্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন ইসলামের জন্য। শিয়াবে আবি তালিবের কঠিন অবরোধের সময় নিজের জন্য পাঠানো খাবার অন্য মুসলমানদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন। দীর্ঘ সময় ওহি বন্ধ থাকলেও তিনি কখনো সন্দেহ করেননি; বরং স্বামীর ওপর অগাধ আস্থা রেখেছেন।

স্বামী হিসেবে রাসুলের প্রতি খাদিজা (রা.) ছিলেন সম্পূর্ণ অনুগত, নিবেদিতপ্রাণ ও ধৈর্যশীলা। কখনো অবাধ্য হননি, কখনো সম্পর্কের অবমাননা করেননি। পুরো বৈবাহিক জীবনে তাঁদের মধ্যে কোনো তিক্ততা বা বিচ্ছেদের ইতিহাস নেই।

এই নিখাদ আনুগত্য ও ভালোবাসাই তাঁকে রাসুলের কাছে সর্বাধিক প্রিয় করে তুলেছিল।

হজরত খাদিজা (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য নারী, যাঁর ভালোবাসা, বিশ্বাস ও আত্মত্যাগ নবীজির জীবন ও মিশনের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেছে। আর আল্লাহর রাসুলের হৃদয়ে তাঁর স্থান ছিল এমনই গভীর ও চিরস্থায়ী যে, জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধানেও সেই ভালোবাসা কখনো ম্লান হয়নি।

আহমাদ সাব্বির : আলেম ও লেখক

আরও পড়ুন