মিসওয়াক: নবীজীবনের শেষ মুহূর্তের আমল

ছবি: উইকিপিডিয়া

মিসওয়াক ইসলামি শরিয়তে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি সুন্নত। এটি শুধু দাঁত ও মুখ পরিষ্কারের কোনো সাধারণ শারীরিক মাধ্যমই নয়; বরং মহানবী (সা.) নিজে সারা জীবন নিয়মিত তা পালন করেছেন এবং উম্মতকে এর প্রতি বিশেষভাবে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছেন।

মিসওয়াকের বিধান

আলেমদের মধ্যে এ বিষয়ে ঐকমত্য (ইজমা) রয়েছে যে মিসওয়াক করা মুস্তাহাব তথা অতি উত্তম আমল। তবে ফকিহগণ এ নিয়ে মতভেদ করেছেন যে মিসওয়াক নির্দিষ্টভাবে অজুর সুন্নত, নাকি নামাজের সুন্নাহ, নাকি ইসলামের একটি সাধারণ সুন্নত, যা সর্বাবস্থায় ও সর্বসময়ে কাম্য?

অধিক গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত হলো, মিসওয়াক একটি সর্বজনীন সুন্নত, যা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে পালনীয়। (মুহাম্মাদ আল-মুখতার শানকিতি, শারহু সুনানিন নাসাঈ, ১/৮৮, মাকতাবাতুল মালিক ফাহাদ আল-ওয়াতানিয়্যাহ, রিয়াদ, ১৪২৫ হিজরি)

উপযুক্ত সময়

দিন-রাতের যেকোনো সময় মিসওয়াক করার অবকাশ রয়েছে। তবে কিছু বিশেষ সময়ে মিসওয়াক করার ব্যাপারে আলাদা তাগিদ দেওয়া হয়েছে:

অজু ও নামাজের আগে: অজুর শুরুতে বা কুলি করার সময় এবং প্রতি নামাজের পূর্বে মিসওয়াক করা সুন্নাহ। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হতো, তবে আমি তাদের প্রতি প্রতিটি অজুর সঙ্গে মিসওয়াক করার আদেশ দিতাম।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৯৯২৮)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘আমি তাদের প্রতি প্রতিটি নামাজের পূর্বে মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৭)

আরও পড়ুন
ছবি: পেক্সেলস

ঘুম থেকে ওঠার পর: ঘুমের ফলে মুখে উৎপন্ন দুর্গন্ধ ও শারীরিক আলস্য দূর করতে রাসুল (সা.) রাতে বা সকালে উঠে প্রথম মিসওয়াক করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৫)

ঘরে প্রবেশের পর: বাইরে থেকে ঘরে প্রবেশ করেও তিনি প্রথম কাজটি করতেন মিসওয়াক করা। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৩)

জিকির ও তেলাওয়াতের আগে: আল্লাহর পবিত্র কালাম ও জিকির উচ্চারণের পূর্বে মুখের পবিত্রীকরণের জন্য মিসওয়াক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মুখগুলো কোরআনের পথ, সুতরাং সেগুলোকে মিসওয়াকের মাধ্যমে পবিত্র রাখো।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৯১)

এছাড়া মজলিস বা বৈঠকেও মিসওয়াক করা শিষ্টাচারসম্মত। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩)

মিসওয়াকের গুরুত্ব

মিসওয়াকের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মিসওয়াক হলো মুখের পবিত্রীকরণের মাধ্যম এবং প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জনের উপায়।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৫)

এছাড়া মানুষের সহজাত প্রকৃতি তথা ‘ফিতরাতে’র অন্তর্ভুক্ত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ আমলের মধ্যেও মিসওয়াককে গণ্য করা হয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬১)

মিসওয়াক এতটাই সুগভীর ও প্রেমময় সুন্নত ছিল যে রাসুল (সা.) ওফাতের ঠিক আগমুহূর্তেও তা ত্যাগ করেননি।

আয়েশা (রা.) সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর একটি কাঁচা মিসওয়াক হাতে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) সেটির দিকে তাকালে আমি বুঝলাম তিনি মিসওয়াক করতে চান। আমি চিবিয়ে মিসওয়াকটি নরম করে তাঁর হাতে দিলে তিনি সুন্দরভাবে মিসওয়াক করলেন। আমি তাঁকে এর পূর্বে এত চমৎকার ও নিখুঁতভাবে মিসওয়াক করতে আর কখনো দেখিনি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৪৩৮)

এই ঘটনা প্রমাণ করে, মিসওয়াক ছিল নবীজির জীবনের এমন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা তিনি মৃত্যুশয্যাতেও বর্জন করেননি।

আরও পড়ুন
ছবি: ফ্রিপিক

মিসওয়াকের উপকারিতা

হাদিসশাস্ত্রে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত বহুল প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী মিসওয়াকে প্রধান ১০টি উপকারিতা রয়েছে: ১. মেদ ও দাঁতের ময়লা দূর করে, ২. দৃষ্টিশক্তি উজ্জ্বল করে, ৩. মাড়ি মজবুত করে, ৪. মুখ সুগন্ধময় করে, ৫. কফ ও মিউকাস দূর করে, ৬. ফেরেশতাদের আনন্দিত করে, ৭. প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জন করায়, ৮. সুন্নতের অনুসরণ হয়, ৯. নামাজের সওয়াব বৃদ্ধি করে এবং ১০. শারীরিক সুস্থতা দান করে। (শারহু সুনানিন নাসায়ি, ১/৮৮, মাকতাবাতুল মালিক ফাহাদ আল-ওয়াতানিয়্যাহ, রিয়াদ, ১৪২৫ হিজরি)

পরবর্তী সময়ে হানাফি মাজহাবের প্রখ্যাত ফকিহ আল্লামা শামি (রহ.) মিসওয়াকের আত্মিক ও শারীরিক উপকারিতার পরিধি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন—মিসওয়াকের সর্বনিম্ন উপকারিতা হলো মুখ পরিষ্কার রাখা, আর সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক সুফল হলো মৃত্যুর সময় কালিমা শাহাদত স্মরণে আসা এবং মৃত্যুযন্ত্রণা লাঘব হওয়া।

এছাড়া এটি পাকস্থলী ও মাড়ি শক্তিশালী করে, বাচনভঙ্গি স্পষ্ট করে এবং স্নায়ুমণ্ডলীকে প্রশান্ত রাখে। (ইবনে আবেদিন শামি, রদ্দুল মুহতার আলাদ্দুররিল মুখতার: ফতোয়ায়ে শামি, ১/৩৮৪, দারুস সাকাফাহ ওয়াত্তুরাস, দামেস্ক, ২০০০ খ্রিষ্টাব্দ)

সুতরাং স্পষ্টতই বোঝা যায়, মিসওয়াক কোনো সাধারণ প্রথাগত অভ্যাস নয়; বরং তা রাসুলের সুন্নতের এক জীবন্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত নিদর্শন। দৈনন্দিন জীবনে একে অবহেলা না করে নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে মহানবীর এই পরম সুন্নাহকে বাঁচিয়ে রাখা প্রতিটি সচেতন মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব।

  • সৈয়দ আবিদুল হক: শিক্ষক, জামিয়া ইসলামিয়া এমদাদুল উলুম, নরসিংদী

আরও পড়ুন