পরিখার যুদ্ধ: ইতিহাসের পালাবদল

ছবি: ফ্রিপিক

ইসলামি ইতিহাসের কালপঞ্জিতে পঞ্চম হিজরি বা ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দ এক অত্যন্ত সংকটপূর্ণ ও গুরুত্ববহ বছর। এই বছরেই আরবের বিভিন্ন গোত্র ও ইহুদি শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রকে চিরতরে মুছে ফেলার এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে।

ইতিহাসের পাতায় এটি ‘পরিখার যুদ্ধ’ বা ‘আহজাব’ (মিত্রবাহিনী)–এর যুদ্ধ নামে পরিচিত।

এই যুদ্ধের মাধ্যমেই আরবের রণকৌশলে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয় এবং যুদ্ধের গতিপথ চিরতরে মুসলমানদের অনুকূলে চলে আসে।

যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও কারণ

পরিখার যুদ্ধের মূলে ছিল মদিনা থেকে বহিষ্কৃত ইহুদি গোত্র ‘বনু নাজির’–এর ষড়যন্ত্র। বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে মদিনা থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর তারা খয়বরে আশ্রয় নেয় এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার নেশায় মত্ত হয়।

প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং গভীর পরিখা খননের কাজ শুরু হয়। সাহাবিরা প্রচণ্ড ক্ষুধা ও শীতের মধ্যে কাজ করতে থাকেন। নবীজি নিজেও সাধারণ শ্রমিকের মতো মাটি কাটেন।

বনু নাজিরের নেতারা মক্কায় গিয়ে কুরাইশদের যুদ্ধের উনকানি দেয় এবং আরবের অন্যান্য শক্তিশালী গোত্র যেমন—গাতাফান, বনু আসাদ ও বনু সুলাইমকে এই জোটে শামিল করে।

তারা সম্মিলিতভাবে প্রায় ১০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গঠন করে, যেখানে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ হাজার। (আলী মুহাম্মদ সাল্লাবি, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ: আরদু ওয়াকায়ি ওয়া তাহলিলু আহদাস, পৃষ্ঠা: ৪৫০, দারুল মারিফা, বৈরুত, ২০০৪)

এই বিশাল বাহিনীর লক্ষ্য ছিল একটাই—মদিনা অবরোধ করে ইসলামি আন্দোলনের কেন্দ্রস্থলকে ধ্বংস করা। পবিত্র কোরআনে এই জোটবদ্ধ শক্তির আক্রমণের ভয়াবহতা বর্ণনা করে বলা হয়েছে, “স্মরণ করো, যখন তারা তোমাদের নিকট এসেছিল তোমাদের ওপরের দিক ও নিচের দিক থেকে।” (সুরা আহজাব, আয়াত: ১০)।

সালমান ফারসি ও পরিখা খননের কৌশল

মদিনার গোয়েন্দা বিভাগ যখন মিত্রবাহিনীর অগ্রযাত্রার সংবাদ পায়, তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) সাহাবিদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন। মদিনার ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী তিন দিক ছিল পাহাড় ও ঘন খেজুরবাগানে ঘেরা, যা প্রাকৃতিকভাবেই সুরক্ষিত ছিল। কেবল উত্তর দিক ছিল উন্মুক্ত, যেখান দিয়ে শত্রুর প্রবেশের সম্ভাবনা ছিল।

এই সংকটে পারস্যের সাহাবি সালমান ফারসি (রা.) এক অভিনব পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমরা পারস্যে যুদ্ধের সময় শত্রুবেষ্টিত হওয়ার আশঙ্কা করলে চারদিকে পরিখা বা খন্দক খনন করে নিজেদের রক্ষা করতাম।’ (শাওকি আবু খলিল, আতলাস আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ২৭২, দারুল ফিকর, দামেস্ক, ২০০৩)

আল্লাহর রাসুল এই প্রস্তাব অত্যন্ত পছন্দ করেন। প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং গভীর পরিখা খননের কাজ শুরু হয়। সাহাবিরা প্রচণ্ড ক্ষুধা ও শীতের মধ্যে কাজ করতে থাকেন। নবীজি নিজেও সাধারণ শ্রমিকের মতো মাটি কাটেন এবং কাঁধে করে পাথর বহন করেন।

আরও পড়ুন

পরিখা খননের সময় অলৌকিক নিদর্শন

খননের এই কঠিন সময়ে বেশ কিছু অলৌকিক ঘটনা বা মোজেজা প্রকাশ পায়, যা মুসলমানদের মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছিল:

বিশাল পাথরখণ্ড: খননকালে একটি বিশাল শক্ত পাথর বাধা হয়ে দাঁড়ায়, যা কেউ ভাঙতে পারছিল না। আল্লাহর রাসুল (সা.) কোদাল দিয়ে তাতে তিনটি আঘাত করেন। প্রতি আঘাতে আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হয় এবং তিনি ঘোষণা করেন যে আল্লাহ তাঁকে পারস্য, রোম ও ইয়েমেনের চাবিকাঠি দান করেছেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ৩/২১৯, দারুল কিতাব আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০)

খাবারে বরকত: জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) অত্যন্ত সামান্য খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন কেবল রাসুলের জন্য। কিন্তু রাসুলের দোয়ায় সেই সামান্য খাবার দিয়ে খননকাজে নিয়োজিত প্রায় এক হাজার সাহাবি পেট ভরে খাবার খান এবং এরপরও খাবার উদ্বৃত্ত থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪১০১)

অবরোধ ও বনু কুরাইজার বিশ্বাসঘাতকতা

মিত্রবাহিনী মদিনার সীমান্তে পৌঁছে পরিখা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায়। আরবের রণকৌশলে এটি ছিল সম্পূর্ণ নতুন এবং অভাবনীয়। তারা পরিখা অতিক্রম করতে না পেরে মদিনা অবরোধ করে বসে। টানা তিন সপ্তাহ এই অবরোধ স্থায়ী হয়।

যখন তোমাদের নিকট শত্রুসৈন্য এসেছিল, অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করলাম প্রবল বায়ু এবং এমন এক বাহিনী (ফেরেশতা), যা তোমরা দেখতে পাওনি।
কোরআন, সুরা আহজাব, আয়াত: ৯

এই কঠিন সময়ে মদিনার ভেতরে বসবাসকারী ইহুদি গোত্র ‘বনু কুরাইজা’ মুসলমানদের সঙ্গে সম্পাদিত নিরাপত্তা চুক্তি ভঙ্গ করে শত্রুবাহিনীর সঙ্গে হাত মেলায়। এটি ছিল মুসলমানদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’।

একদিকে বাইরে ১০ হাজার সৈন্য, অন্যদিকে ভেতরে বিশ্বাসঘাতক ইহুদিদের আক্রমণের ভয়। আল্লাহ–তাআলা এই চরম মুহূর্তকে পবিত্র কোরআনে ‘মুমিনদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

যুদ্ধের মোড় পরিবর্তনে নুআইম ইবনে মাসউদ

যখন পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক, তখন গাতাফান গোত্রের নুআইম ইবনে মাসউদ (রা.) গোপনে ইসলাম গ্রহণ করে আল্লাহর রাসুলের কাছে আসেন। নবীজি তাঁকে বললেন, ‘যুদ্ধ তো আসলে একটি কৌশল’ (আল-হারবু খুদআহ্)’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০২৯)

নুআইম (রা.) অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে মিত্রবাহিনী এবং বনু কুরাইজার মধ্যে সন্দেহের বীজ বপন করে দেন। এর ফলে শত্রুশিবিরের ঐক্য ভেঙে যায় এবং তারা একে অপরকে অবিশ্বাস করতে শুরু করে। এটি ছিল খন্দকের যুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট।

আরও পড়ুন

প্রচণ্ড বায়ু ও বিজয়

দীর্ঘ অবরোধের ফলে শত্রুবাহিনী ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এ অবস্থায় নবীজি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, ‘হে কিতাব অবতীর্ণকারী, দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী, এই দলগুলোকে পরাজিত করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৯৩৩)

আল্লাহ–তাআলা তাঁর নবীর দোয়া কবুল করলেন। হঠাৎ এক রাতে প্রচণ্ড বেগে ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করল, যা শত্রুদের তাঁবু উপড়ে ফেলল, হাঁড়ি-পাতিল উল্টে দিল এবং তাদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করল।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের ওপর আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন তোমাদের নিকট শত্রুসৈন্য এসেছিল, অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করলাম প্রবল বায়ু এবং এমন এক বাহিনী (ফেরেশতা), যা তোমরা দেখতে পাওনি।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ৯)

দিশাহারা হয়ে আবু সুফিয়ান তাঁর বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

পরিখার যুদ্ধের ৭টি সুদূরপ্রসারী ফলাফল

খন্দকের যুদ্ধ কেবল একটি বিজয় ছিল না, বরং এটি ছিল একটি নতুন যুগের সূচনা। এর প্রধান ফলাফলগুলো নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

১. চূড়ান্ত বিজয়: আরবের সম্মিলিত শক্তি পরাজয় স্বীকার করে পিছু হঠতে বাধ্য হয়।

২. রণকৌশল পরিবর্তন: রাসুল (সা.) বলেন, ‘এখন থেকে আমরাই তাদের আক্রমণ করব, তারা আমাদের ওপর আক্রমণের সাহস পাবে না’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪১০৯)।

৩. ইহুদি ষড়যন্ত্রের অবসান: বিশ্বাসঘাতকতার কারণে বনু কুরাইজার বিচার করা হয় এবং মদিনা ইহুদি ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত হয়।

৪. রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব: আরবের বিভিন্ন গোত্রের কাছে মদিনা রাষ্ট্র একটি অজেয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

খন্দকের যুদ্ধ আমাদের শেখায় যে সংখ্যাধিক্য বা উন্নত অস্ত্রশস্ত্রই বিজয়ের একমাত্র মাপকাঠি নয়। বরং সঠিক পরিকল্পনা, পারস্পরিক পরামর্শ, নেতার প্রতি আনুগত্য এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলই হলো সাফল্যের চাবিকাঠি।

৫. ইসলাম গ্রহণ: যুদ্ধের পর আরবের বহু মানুষ এবং গোত্র স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে।

৬. মোনাফেকদের মুখোশ উন্মোচন: যুদ্ধের কঠিন সময়ে যারা পলায়নপর ছিল, তাদের আসল পরিচয় প্রকাশ পায়।

৭. নারী ও শিশুদের সুরক্ষা: যুদ্ধের সময় নারী ও শিশুদের নিরাপদ দুর্গে রাখার মাধ্যমে ইসলামি প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মানবিক দিক ফুটে ওঠে।

শিক্ষণীয় দিক

খন্দকের যুদ্ধ আমাদের শেখায় যে সংখ্যাধিক্য বা উন্নত অস্ত্রশস্ত্রই বিজয়ের একমাত্র মাপকাঠি নয়। বরং সঠিক পরিকল্পনা, পারস্পরিক পরামর্শ, নেতার প্রতি আনুগত্য এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলই হলো সাফল্যের চাবিকাঠি।

আল্লাহর রাসুল এই যুদ্ধে প্রথম ‘ফিল্ড হাসপাতাল’ বা ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করেন, যেখানে রুফাইদা আল-আসলামিয়া (রা.) আহতদের সেবা করতেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ৩/২৩৮, দারুল কিতাব আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০)

এটি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানেরও এক অনন্য উদাহরণ।

আরও পড়ুন