“আমি শপথ করছি এ নগরের। আর আপনি এ নগরের অধিবাসী।”
প্রথমে সুরা বালাদের এই আয়াত দুটির ওপর তাফসিরকারকদের কয়েকটি প্রাসঙ্গিক মন্তব্য জেনে নিই, ‘এটি আল্লাহ-তাআলার পক্ষ থেকে জনপদসমূহের জননী মক্কার শপথ; যে অবস্থায় এর অধিবাসীগণ ইহরাম অবস্থায় থাকে না; যাতে করে এর অধিবাসীগণ ইহরামরত থাকা অবস্থায় এর মহান মর্যাদার ব্যাপারে সাবধান করা যায়।’ (ইবনে কাসির)
নগর বলে মক্কা নগরীকে বোঝানো হয়েছে। সুরাটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় নবীজি (সা.) মক্কাতেই অবস্থিত ছিলেন। তাঁর জন্মস্থানও ছিল মক্কা শহর। অর্থাৎ আল্লাহ-তাআলা নবীজি (সা.)-এর জন্মস্থান ও বাসস্থানের কসম খেয়েছেন। এ কারণে তার অতিরিক্ত মর্যাদার কথা সুস্পষ্ট হয়। (তাফসির আহসানুল বায়ান)
শাওকানি (রহ.) বলেন, এর অর্থ ‘আর তুমি এই নগরের অধিবাসী’ তখন সঠিক হবে, যখন আরবি ভাষায় এ কথা প্রমাণিত হবে, ‘হিল্লুন’ শব্দটি বাস করার অর্থেও ব্যবহার হয়ে থাকে। আর এ আয়াত বাগ্ধারার মাঝে পৃথক বাক্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
‘হিল্লুন’ শব্দটি হালুল থেকে উদ্ভূত হলে তার অর্থ কোনো কিছুতে অবস্থান নেওয়া, থাকা ও অবতরণ করা। সেই হিসেবে আয়াতের মর্মার্থ এই—মক্কা নগরী নিজেও সম্মানিত ও পবিত্র, বিশেষত আপনিও এ নগরীতে বসবাস করেন। বসবাসকারীর শ্রেষ্ঠত্বের দরুনও বাসস্থানের শ্রেষ্ঠত্ব বেড়ে যায়। কাজেই আপনার বসবাসের কারণে এ নগরীর মাহাত্ম ও সম্মান দ্বিগুণ হয়ে গেছে। (ফাতহুল কাদির)
এ নাগরিকতা মানে কী
নাগরিক ও নাগরিকতার আলোচনা পুরোনো গ্রিক সভ্যতায় শুরু হয়। বর্তমানেও পরিভাষাটি বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচ্য। তবে সবাই নাগরিকতা অর্জনের দুটি পদ্ধতি—জন্মসূত্র ও অনুমোদনসূত্র সম্পর্কে একমত। নবীজি (সা.)-এর মক্কার নাগরিকতা জন্মসূত্রে হয়েছিল। ভাবছেন এ আর নতুন কী?
কানাডার এক গবেষকের নাম দানিয়েল ড্যান গিবসন। এই গবেষকের প্রাথমিক গবেষণার আগ্রহটি ছিল ‘প্রাচীন বাণিজ্যের ইতিহাস: বিশেষত আরব এবং নবতিয় (খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ থেকে ৫০০ অবধি)’। ভদ্রলোক ২০১১ সালে ‘কোরআনিক জিওগ্রাফি: আ সার্ভে অ্যান্ড ইভাল্যুশন অব দ্য জিওগ্রাফিক্যাল রেফারেন্সেজ ইন দ্য কোরআন উইথ সাজেস্টেড সলিউশনস ফর ভ্যারিয়াস প্রবলেমস অ্যান্ড ইস্যুজ’ শিরোনামের একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন।
তিনিই উম্মিদের মধ্যে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে, যিনি তাদের কাছে তেলাওয়াত করেন তার আয়াতসমূহ, তাদের পবিত্র করেন এবং তাদের শিক্ষা দেন কিতাব ও হেকমত; যদিও ইতিপূর্বে তারা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে।কোরআন, সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৯
তাঁর গবেষণাটি ‘কোরআনিক জিওগ্রাফি’ নামে প্রকাশিত হয়। সেই গ্রন্থের আলোকে ইংরেজি ভাষায় ‘দ্য স্যাক্রেড সিটি’ নামের একটি ডকুমেন্টারি ভিডিও নির্মাণ করা হয়।
ড্যান গিবসন এ সিদ্ধান্তে আসেন যে প্রত্নতাত্ত্বিক নথি ও আরবের প্রচলিত ইতিহাসের উপাত্ত উভয়ের ইসলামের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। গিবসনের ধারণা, নবীজি (সা.) মক্কায় নয়, বরং পেত্রায় (বর্তমান জর্ডানে) জন্মগ্রহণ ও বসবাস করেন। এতে তিনি মক্কার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন স্থাপনা ও ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন।
কী বিস্ময়! অথচ নবীজি (সা.) জীবনে জর্ডানের সে শহরে কখনো ভ্রমণ করেছেন বলে কোনো তথ্য ইসলামের ইতিহাসে নেই। গিবসন যেসব স্থানকে বির্তক করার প্রচেষ্ঠা করেছেন, তার প্রতিটি যথাস্থানে আলাপ হবে, ইনশা আল্লাহ। এখানে নবীজির জন্মস্থানের বিষয়টি তুলে ধরা হলো।
মক্কায় নবীজির নাগরিকতার প্রসঙ্গে উদ্ধৃত আয়াতদ্বয়ে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্মস্থান যে তার নাগরিক পরিচয় হতে পারে, সেই স্বীকৃতি দেওয়া আছে। ইব্রাহিম (আ.) এ নগরীতে বসবাসকারীদের মধ্য থেকে এই উম্মতের জন্য একজন রাসুল প্রেরণের যে দোয়া করেছিলেন, সেই দোয়া আল্লাহ-তাআলার পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাসুল হিসেবে মুহাম্মাদ (সা.)–এর পক্ষেই কবুল হয়েছে। তিনি এ শহরের নাগরিক হিসেবেই প্রেরিত হয়েছেন।
‘তিনিই উম্মিদের মধ্যে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে, যিনি তাদের কাছে তেলাওয়াত করেন তার আয়াতসমূহ, তাদের পবিত্র করেন এবং তাদের শিক্ষা দেন কিতাব ও হেকমত; যদিও ইতিপূর্বে তারা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৯)
নবীজির (সা.)-এর জন্মের কারণে এ শহরের শপথের মাধ্যমে আল্লাহ-তাআলা এ নগরীর মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি করেছেন। পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা নিজেকে এ নগরের পালনকর্তারূপে পরিচয় দিয়েছেন! ‘আমি তো আদিষ্ট হয়েছি এ নগরীর মালিকের এবাদত করতে, যিনি একে সম্মানিত করেছেন। সকল কিছু তাঁরই। আমি আরও আদিষ্ট হয়েছি, যেন আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত হই।’ (সুরা নামল, আয়াত: ৯১)
নবীজির মক্কায় জন্মগ্রহণ করার পক্ষে আর কী কী দলিল আছে
খলিফা ইবনে খাইয়াত বলেন, ‘এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞগণ একমত, নবীজির (সা.) জন্ম হয়েছিল হস্তীবর্ষে।’ (ইবনে হিশাম, ১/১৫৮) কাইস ইবনে মাখরামা ইবনিল মুত্তালিব ইবনে আবদি মানাফ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি ও আল্লাহর রাসুল (সা.) হস্তীবর্ষে জন্মগ্রহণ করেছি। আমরা সমবয়সী, একই সময়ে জন্ম।’ (মুসনাদ আহমদ)
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল (সা.) হস্তীবর্ষে জন্মগ্রহণ করেছেন।’ (তাবারানি)
এটা হচ্ছে ইয়েমেনের শাসক আবরাহা হস্তীবাহিনী নিয়ে মক্কায় অভিযান চালানোর বছর। পেত্রা নগরীর সে ইতিহাস কোথায়? নবীজির জন্ম শহর মক্কাকে যে ঐশ্বরিক প্রক্রিয়ায় সুরক্ষা দেওয়া হয়, সুরা ফিল সে ইতিহাসের দলিল, ‘আপনি কি দেখেননি আপনার রব হাতির অধিপতিদের প্রতি কী করেছিলেন? তিনি কি তাদের কৌশল ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে দেননি? আর তাদের বিরুদ্ধে তিনি ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি পাঠান, যারা তাদের ওপর শক্ত পোড়ামাটির কঙ্কর নিক্ষেপ করে। অতঃপর তিনি তাদের চিবানো তৃণসদৃশ করেন।’ (সুরা ফিল, আয়াত: ১-৫)
আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর জন্মের পর বানু সা’দ গোত্রের নারীদের সঙ্গে হালিমা বিনতে হারিস মক্কায় আসেন। উদ্দেশ্য দুধের শিশু খোঁজা।’ (ইবনে হিব্বান)
তাঁর পেত্রায় যাওয়ার প্রমাণ কী? পেত্রায় হালিমার বাড়ি কোথায়?
হুনাইন যুদ্ধের গনিমত বণ্টনের সময় একটি হৃদয় নাড়ানো ঘটনা ঘটে। নবীজি (সা.)–এর একটি প্রাজ্ঞ কৌশলের ব্যাপারে প্রাথমিক অবস্থায় কোনো কোনো লোকের মতো সুস্পষ্ট ধারণা সৃষ্টি না হওয়ার কারণে কিছু মৌখিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল।
আম্মাজান আমেনা নবীজিকে নিয়ে প্রাণপ্রিয় স্বামীর কবর জেয়ারত করার জন্য উম্মে আইমানসহ মক্কা থেকে প্রায় ৪৬০ কিলোমিটার উত্তরে মদিনায় যান। মদিনায় পৌঁছে নাবেগা আল-জা’দির পারিবারিক কবরস্থানে স্বামীর কবর জিয়ারত করেন। অতঃপর এক মাস বিশ্রাম নিয়ে মক্কার উদ্দেশে রওনা হন।
কিন্তু কিছু দূর এসেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ‘আবওয়া’ নামের স্থানে মৃত্যুবরণ করেন, যা বর্তমানে মদিনা থেকে মক্কার পথে ২৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি শহরের নাম। উম্মে আইমান শিশু মুহাম্মদ (সা.)–কে মক্কায় নিয়ে আসেন। (ইবনে হিশাম, ১/১৬৮)
১২ বছর বয়সে পিতৃব্য আবু তালিবের সঙ্গে প্রথম ব্যবসা উপলক্ষে শাম বা সিরিয়া সফর করেছিলেন। কিন্তু ‘বাহিরা’ রাহেবের কথা শুনে চাচা তাঁকে সঙ্গে সঙ্গেই মক্কায় ফেরত পাঠিয়েছিলেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৬২০; মিশকাত, ৫৯১৮)
ওরাকা ইবনে নওফল ভবিষ্যদ্বাণী প্রদানকালীন মক্কা থেকে বের করে দেওয়ার কথা শুনে আল্লাহর রাসুল (সা.) বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে প্রশ্ন করেন, ‘তারা আমাকে বের করে দেবে?’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬২)
সত্যিই একসময় আল্লাহর রাসুল (সা.) অমানুষিক অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে আল্লাহর নির্দেশে প্রিয় জন্মভূমি মক্কা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করে যাওয়ার সময় বারবার মক্কার দিকে তাকাচ্ছিলেন।
তিনি বারবার কাবার দিকে ফিরে মক্কার পাহাড়–প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘কতই না পবিত্র শহর তুমি, আমার নিকট তুমি কতই না প্রিয় শহর, যদি তোমার জাতি আমাকে বের করে না দিত, তাহলে তুমি ছাড়া অন্য কোনো শহরে আমি বসবাস করতাম না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৯২৬)
আবদুল্লাহ ইবনে আদি ইবনে হামরা বলেন, ‘আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)–কে খাজওয়ারা নামের স্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। সেখানে তিনি বলেছেন, “আল্লাহর শপথ, আল্লাহ-তাআলার জমিনে তুমিই সর্বশ্রেষ্ঠ, আল্লাহ-তাআলার নিকট তাঁর জমিনে তুমি সর্বাপেক্ষা বেশি প্রিয়, যদি তোমার কাছ থেকে আমাকে বের করে দেওয়া না হতো, তাহলে আমি তোমায় ছেড়ে যেতাম না।”’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৯২৫)
আল্লাহ-তাআলা মক্কাকে পছন্দ ও সম্মানিত করেছেন। এ জন্য পৃথিবীর প্রথম দিন থেকেই এ শহরে সব প্রকার হত্যা নিষিদ্ধ থাকে। আল্লাহর ঘর ও পবিত্র হারামের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে মক্কা থেকে হস্তীবাহিনীকে বিরত রেখেছেন এবং এ শহরকে মূর্তি, শিরক, ‘জাহিলি’ কার্যকলাপ থেকে পবিত্র করার লক্ষ্যে তাঁর শ্রেষ্ঠ নাগরিক নবীজি (সা.)–কে স্বল্প সময় হত্যা ও রক্তপাত বৈধ করেন।
নবীজি (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ-তাআলা মক্কা থেকে হস্তীবাহিনীকে বিরত রেখেছেন এবং মক্কার ওপর তাঁর বিশ্বস্ত রাসুল ও মুমিনদের কর্তৃত্ব দিয়েছেন। এ মক্কা নগরী আমার পূর্বে কারও জন্য হালাল ছিল না এবং দিনের এক প্রহর আমার জন্য হালাল করে দেওয়া হয়েছে এবং আমার পর এ শহর কখনো আর কারও জন্য হালাল হবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৩৪)
আল্লাহর রাসুল যখন মক্কা বিজয়ের পরিপূর্ণতা অর্জন করলেন এবং এটা সর্বজনবিদিত ব্যাপার যে মক্কাই ছিল নবীজির আবাসস্থল এবং জন্মভূমি ও মাতৃভূমি। আনসাররা পরস্পর বলাবলি করতে থাকলেন যে নিজ শহর ও জন্মভূমি বিজয়ের পর নবীজি (সা.) কি মক্কাতেই অবস্থান করতে থাকবেন? ওই সময় তিনি হাত দুটি উত্তোলন করে সাফা পাহাড়ের ওপর ইবাদতরত ছিলেন।
নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কী কথা বলেছ?’ তাঁরা বললেন, ‘তেমন কিছু নয় হে আল্লাহর রাসুল।’ কিন্তু নবীজি (সা.) বিষয়টি জানানোর ব্যাপারে মত পরিবর্তন না করায় তাঁরা তাঁদের আলোচনার বিষয়টি তাঁর নিকট প্রকাশ করলে তিনি বললেন, ‘আল্লাহর আশ্রয়, এখন জীবন ও মরণ তোমাদের সঙ্গেই হবে।’ (আসদুল্লাহ আল-গালিব, সিরাতে রাসুলিল্লাহ)
হুনাইন যুদ্ধ পরবর্তী একটি ঘটনা
হুনাইন যুদ্ধের গনিমত বণ্টনের সময় একটি হৃদয় নাড়ানো ঘটনা ঘটে। নবীজি (সা.)–এর একটি প্রাজ্ঞ কৌশলের ব্যাপারে প্রাথমিক অবস্থায় কোনো কোনো লোকের মতো সুস্পষ্ট ধারণা সৃষ্টি না হওয়ার কারণে কিছু মৌখিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল। বিশেষ করে আনসারদের ওপর এর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া ছিল সবচেয়ে বেশি। হুনাইন যুদ্ধের সব প্রকার সুযোগ–সুবিধা থেকে তাঁরা বঞ্চিত হয়েছিলেন!
আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন: নবীজি (সা.) কোরাইশ ও অন্য আরব গোত্রগুলোকে গনিমত বণ্টন করে দিলেন, আনসারদের ভাগে কিছুই পড়ল না। তখন তাঁরা মনে মনে অত্যন্ত দুঃখিত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। তাঁদের মনে এ–সংক্রান্ত অনেক প্রশ্নের উদয় হলো।
এমনকি তাঁদের মধ্য থেকে একজন বলেই বসলেন, ‘আল্লাহর শপথ! নবীজি (সা.) তাঁর নিজ কওমের সঙ্গে মিশে গেছেন।’ এ পরিপ্রেক্ষিতে সা’দ (রা.) নবীজি (সা.)–এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, ‘হে আল্লহার রাসুল, ফাই (বিনা যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ) বণ্টনের ব্যাপারে আপনি যে ব্যবস্থা অবলম্বন করেছেন, তাতে আনসারগণ আপনার প্রতি দুঃখিত ও মনঃক্ষুণ্ন হয়েছেন। আপনি নিজ কওমের লোকদের মধ্যেই তা বণ্টন করেছেন এবং তাঁদের অনেক বেশি বেশি পরিমাণ দান করেছেন, কিন্তু আনসারদের কিছুই দেননি।’
নবীজি (সা.) বললেন, ‘ সা’দ, এ সম্পর্কে তোমার ধারণা কী?’ তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমিও তো আমার কওমের লোকদের মধ্যে একজন।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘আচ্ছা তাহলে তোমার কওমের লোকদের তুমি অমুক স্থানে একত্র করো।’
সা’দ (রা.) তাঁর কওমের লোকদের নির্ধারিত স্থানে সমবেত করলেন। কিছুসংখ্যক মুহাজির আগমণ করলে তাঁদের সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলো। কিছুসংখ্যক অন্য লোক সেখানে আগমন করলে তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হলো। যখন সংশ্লিষ্ট লোকেরা সেখানে একত্র হলেন, তখন সা’দ (রা.) নবীজি (সা.)–এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, ‘আনসারগণ আপনার জন্য একত্র হয়েছেন।’ নবীজি (সা.) তৎক্ষণাৎ সেখানে আগমন করলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করার পর বললেন—
‘ওহে আনসারগণ! কী কারণে তোমরা আমার ব্যাপারে অসন্তুষ্টি পোষণ করেছ? আমি কি তোমাদের নিকট এমন অবস্থায় আসিনি, যখন তোমরা পথভ্রষ্ট ছিলে? আল্লাহ তোমাদের হিদায়াত দান করেছেন। তোমরা অসহায় ছিলে, তিনি তোমাদের সহায়–সম্পদ দান করেছেন। তোমরা পরস্পর পরস্পরের শত্রু ছিলে, তিনি তোমাদের মধ্যে মহব্বতের বন্ধন সৃষ্টি করে দিয়েছেন।
‘আনসারগণ! তোমরা আমার কথার উত্তর দিচ্ছ না কেন?’ আনসারগণ বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আমরা কী উত্তর দেব? অবশ্যই এ সবকিছুই আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর বড়ই অনুগ্রহ।’
নবীজি (সা.) বললেন, ‘দেখো, আল্লাহর কসম, ইচ্ছা করলে তোমরা বলতে পারো, সত্য কথাই বলবে এবং তোমাদের কথা সত্য বলে ধরে নেওয়া হবে, “আপনি আমাদের নিকট এমন সময় এসেছিলেন, যখন আপনাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করা হচ্ছিল। আমরা আপনাকে সত্য বলে স্বীকার করেছি। আপনি যখন ছিলেন বন্ধুবান্ধব ও সহায়–সম্বলহীন, তখন আমরা আপনাকে সহায়তা দান করেছিলাম। আপনাকে যখন বিতাড়িত করা হয়েছিল, তখন আমরা আপনাকে আশ্রয় দান করেছিলাম। আপনি যখন ছিলেন অভাবগ্রস্ত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, আমরা তখন দুশ্চিন্তা থেকে আপনাকে সাহায্য করেছিলাম।”
নবী ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক মক্কার উপকণ্ঠে এ শহরে নবীজি (সা.)–এর আগমনের যে সুসংবাদ প্রকাশ করেছিলেন, নগরীর অধিবাসীরা প্রজন্মান্তরে তার অপেক্ষায় কাটিয়েছে তিন সহস্রাব্দ কাল! অথচ মহান আল্লাহ শহরটিকে নবীজির জন্য সাজাচ্ছিলেন পৃথিবী সৃষ্টির সূচনা থেকে।
‘হে আনসারগণ! একটি নিকৃষ্ট ঘাসের জন্য তোমরা নিজ নিজ অন্তরে অসন্তুষ্ট হয়েছ, অথচ এর মাধ্যমে আমি তোমাদের অন্তরকে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা মুসলিম হয়ে ইসলামের প্রতি সমর্পিত হয়ে যাও। হে আনসারগণ! তোমরা কি সন্তুষ্ট নও যে সেসব লোক উট ও বকরি নিয়ে ফিরে যাবে, আর তোমরা স্বয়ং আল্লাহর রাসুল (সা.)–কে নিয়ে নিজ কওমের নিকট ফিরে যাবে? সে সত্তার কসম, যাঁর হাতে রয়েছে আমার জীবন! যদি হিজরতের বিধান না হতো, তবে আমিও হতাম আনসারদের মধ্যকার একজন। যদি অন্য লোকেরা এক পথে চলেন এবং আনসারগণ অন্য পথে চলেন, তাহলে আমিও আনসারদের পথে চলব। হে আল্লাহ! আনসারদের তাঁদের সন্তানদের এবং তাঁদের সন্তানদের (অর্থাৎ নাতিপুতিদের) প্রতি রহম করুন।’
নবীজির ভাষণ শুনে উপস্থিত সবাই এতই কাঁদলেন যে তাঁদের মুখমণ্ডলের দাড়িগুলো ভিজে গেল। তাঁরা বলতে লাগলেন, ‘আমরা এ জন্য সন্তুষ্ট যে নবীজি আমাদের অংশে এবং সঙ্গে রয়েছেন।’ অতঃপর নবীজি (সা.) ফিরে আসেন এবং লোকজনও বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন। (সহিহ বুখারি, ২/৬২০-৬২১; ইবনে হিশাম, ২/৪৯৯-৫০০)
শেষ কথা
মক্কার অদূরে বসে নবীজি (সা.)–এর জাতীয়তা, নাগরিকতা, বংশীয় সংহতি, ভ্রাতৃত্ববোধ ইত্যাদির প্রশ্নে ইসলামের যে রূপরেখা দিয়েছিলেন, হুনাইনের মাঠ ও জিআরানার মসজিদ এখনো সেই স্মৃতি বহন করে চলছে।
এসব স্মৃতিচিহ্ন কী পেত্রায় আছে? সেখানে ওয়াদি আবওয়া কোথায়, যেখানে নবী-জননী ঘুমিয়ে আছেন? কোথায় সেখানে আলা মাক্কা কিংবা আসফালা মাক্কা? কোথায় কাদা আর কোথায় কুদা? মুআল্লা কবরস্থানটিই-বা কোথায়? কোথায় তুয়া কূপ? কোথায় হাজুন, আবতাহ কিংবা বাতহা? এত নিকটবর্তী স্থানগুলো? মক্কার কাছাকাছি কিংবা পাশের হাজার হাজার গ্রাম-শহরের মিল কীভাবে হবে?
মুসলিম জাতির পিতা নবী ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক মক্কার উপকণ্ঠে এ শহরে নবীজি (সা.)–এর আগমনের যে সুসংবাদ প্রকাশ করেছিলেন, নগরীর অধিবাসীরা প্রজন্মান্তরে তার অপেক্ষায় কাটিয়েছে তিন সহস্রাব্দ কাল! অথচ মহান আল্লাহ শহরটিকে নবীজির জন্য সাজাচ্ছিলেন পৃথিবী সৃষ্টির সূচনা থেকে। কাল থেকে কালান্তরে।
‘আর আপনার রব যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং যা ইচ্ছা মনোনীত করেন, এতে ওদের কোনো হাত নেই। আল্লাহ পবিত্র, মহান এবং তারা যা শরিক করে, তা থেকে তিনি ঊর্ধ্বে!’ (সুরা কাসাস: ৬৮)
ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক : অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়