প্রিয়জন কবরে চলে গেলেও তাদের জন্য জীবিতদের করার অনেক কিছু থাকে। আর এই সংযোগের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো দোয়া। মহানবী (সা.) মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন, কারণ মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের আমলের খাতা বন্ধ হয়ে যায় এবং তখন সে সম্পূর্ণভাবে অন্যের দোয়ার মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে।
তিনি আমাদের এমন কিছু বিশেষ দোয়া শিখিয়েছেন, যা সরাসরি মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছায় এবং কবরের জীবনে তার উপকারে আসে।
দাফনের পরই দোয়া
ইসলামে দাফনের ঠিক পরপরই মৃতের জন্য ক্ষমার আবেদন করার বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। দাফনের পর যখন একজন মানুষ একবারে একা হয়ে যায়, সেই মুহূর্তে জীবিত ভাইদের মুখের একটু দোয়া তার জন্য আল্লাহর দরবারে অনেক বড় সুপারিশ হিসেবে কবুল হয়।
নবীজি (সা.) যখন মৃত ব্যক্তির দাফন সম্পন্ন করতেন, তখন কবরের পাশে দাঁড়াতেন এবং বলতেন, “তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং সে যেন অবিচল থাকতে পারে সেই দোয়া করো, কারণ এই মুহূর্তে তাকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩২২১)
তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং সে যেন অবিচল থাকতে পারে সেই দোয়া করো, কারণ এই মুহূর্তে তাকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে।
হাদিসে বর্ণিত মকবুল দোয়া
মহানবী (সা.) বিভিন্ন জানাজায় এবং কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মৃতদের জন্য অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ভাষায় দোয়া করেছেন। হাদিসের কিতাবগুলোতে সেই সমস্ত দোয়া হুবহু সংরক্ষিত রয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও অর্থবহ একটি দোয়া হলো, “হে আল্লাহ, আপনি তাকে ক্ষমা করুন, তার প্রতি দয়া করুন, তাকে পূর্ণ নিরাপদে রাখুন এবং তার ভুলত্রুটিগুলো মার্জনা করুন। তার মেহমানদারী সম্মানিত করুন, তার কবরকে প্রশস্ত করে দিন। আপনি তাকে ধৌত করুন বরফ, পানি ও শীতল শিশির দিয়ে। তাকে গুনাহ থেকে এমনভাবে পরিচ্ছন্ন করুন, যেমন সাদা কাপড়কে ময়লা থেকে পরিচ্ছন্ন করা হয়। তাকে দুনিয়ার ঘরের চেয়ে উত্তম ঘর, পরিবারের চেয়ে উত্তম পরিবার এবং জোড়ের চেয়ে উত্তম জোড় প্রদান করুন। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান এবং কবরের আজাব ও জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯৬৩)
এ ছাড়াও নবীজি (সা.) সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য সাধারণ ক্ষমার এক অনবদ্য প্রার্থনা শিখিয়েছেন, যা আমরা জানাজার নামাজে পড়ে থাকি, “হে আল্লাহ, আমাদের জীবিত ও মৃত, উপস্থিত ও অনুপস্থিত, ছোট ও বড় এবং আমাদের নারী ও পুরুষ সবাইকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ, আমাদের মধ্যে আপনি যাকে জীবিত রাখবেন তাকে ইসলামের ওপর জীবিত রাখুন, আর যাকে মৃত্যু দেবেন তাকে ইমানের সঙ্গে মৃত্যু দিন। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের এর সওয়াব থেকে বঞ্চিত করবেন না এবং এর পরে আমাদের পথভ্রষ্ট করবেন না।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১০২৪)
মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়ার ফজিলত
বিশুদ্ধ হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, জীবিত মানুষের আকুল প্রার্থনা মৃত ব্যক্তির কবরের আজাব লাঘব করে এবং আল্লাহর দরবারে তার মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, “মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তিনটি মাধ্যম ছাড়া তার সমস্ত আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়; এক. সদকায়ে জারিয়া (চলমান দান), দুই. এমন ইলম বা জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়, এবং তিন. এমন সৎ সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)
কবরের জগত এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতার জায়গা, যেখানে মানুষ শুধু একটি ভালো আমলের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে।
আরও যেসব আমল মৃতের কাছে পৌঁছায়
দোয়া ও ইস্তিগফারের পাশাপাশি সুন্নাহর আলোকে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল রয়েছে, যা জীবিতরা করলে তার সওয়াব সরাসরি মৃত ব্যক্তির আমলনামায় যোগ হয়। এগুলো হলো:
দান-সদকা: মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান-সদকা করা। মৃত পিতা-মাতা বা স্বজনদের নিয়তে গরিব-দুঃখীকে সাহায্য করা বা জনকল্যাণমূলক কাজ করা হলে তার সওয়াব মৃত ব্যক্তি পেয়ে থাকেন।
হজ ও ওমরাহ পালন: মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কেউ বদলি হজ বা ওমরাহ পালন করলে তা মৃতের আমলনামায় সওয়াব হিসেবে গণ্য হয়। তবে শর্ত হলো, যিনি বদলি হজ করবেন, তাকে আগে নিজের ফরজ হজ সম্পন্ন করতে হবে।
মানত ও ঋণ পরিশোধ: অনেকে ঋণগ্রস্ত অবস্থায় মারা যান অথবা তার কোনো মানত অপূর্ণ থাকতে পারে। মহানবী (সা.) বলেছেন, “মুমিনের আত্মা তার ঋণের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে, যতক্ষণ না তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করা হয়।” (সুনানেত তিরমিজি, হাদিস: ১০৭৮)
তাই মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বা স্বজনদের নিজস্ব তহবিল থেকে দ্রুত ঋণ ও মানত পূরণ করা জীবিতদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য।
পার্থিব জীবনের সমস্ত ব্যস্ততা আর কোলাহলের মাঝে আমরা প্রায়শই আমাদের সেই প্রিয়জনদের কথা ভুলে যাই, যারা মাটির নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। কবরের জগত এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতার জায়গা, যেখানে মানুষ শুধু একটি ভালো আমলের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে।
আমাদের উচিত, প্রতি ওয়াক্তের নামাজে মৃত আত্মীয়-স্বজন ও সর্বস্তরের মুসলিমদের জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা ভিক্ষা করা। আমাদের এই ছোট্ট আরজি হয়তো আল্লাহর করুণায় তাদের কবরকে জান্নাতের বাগানে পরিণত করতে পারে। (ইমাম নববি, রিয়াদুস সালিহিন, বৈরুত: দারুল মা’রিফাহ, ১৯৯৮, পৃষ্ঠা ২৯৫)