রাত ১২টা। চোখে ঘুম নেই। কম্পিউটার তখনো খোলা। অফিসের কাজ করেই যাচ্ছেন। কখন শেষ হবে, তা জানেন না। প্রচুর কাজ জমে আছে। ডেডলাইন মাথার ওপর। বাচ্চাটা কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, খেয়ালই করেননি। স্ত্রীর সঙ্গে আজ সারা দিন ভালো করে দুটি কথাও হয়নি। অথচ কাজ তবু শেষ হচ্ছে না।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ এভাবেই যাচ্ছে। অফিস, মিটিং, টার্গেট। বাসায় ফিরে ক্লান্ত শরীর, খিটখিটে মেজাজ। পরিবারকে সময় দেওয়ার কথা ভাবলেই মনে হয়, সময় কোথায়? কর্মজীবন আর ব্যক্তিগত জীবনের মাঝে সমন্বয় করতে পারছেন না। সমাধান কী?
কেউ কম সময় কাজ করেও ক্লান্ত হয়ে পড়েন, কারণ, কাজটি তিনি পছন্দ করছেন না। ফলে কাজটি তাঁর কাছে বোঝা বলে মনে হয়। সুতরাং প্রশ্ন হলো কাজটি আপনি মন থেকে করছেন কি না।
বিজ্ঞান কী বলছে
গবেষণায় দেখা গেছে, কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে মানুষ দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে ও মানসিক প্রশান্তি হারায়। যাঁরা কাজের সময় ও পরিবারের সময়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন রাখতে পারেন, তাঁদের মানসিক সুস্থতা তুলনামূলক অনেক ভালো থাকে। (ক্রেইনার, জি ই, ২০০৬, জার্নাল অব অর্গানাইজেশনাল বিহেভিয়ার, ২৭/৪, জন উইলি অ্যান্ড সন্স)
সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষজ্ঞরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছেন। সমস্যাটা আসলে সময়ের পরিমাণে নয়, নিয়ন্ত্রণে। কেউ সপ্তাহে ৭০ থেকে ৮০ ঘণ্টা কাজ করেও প্রাণবন্ত থাকতে পারেন, যদি কোন কাজ কখন করবেন, তার ওপর তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং তিনি কাজটাকে ভালোবাসেন।
আবার কেউ কম সময় কাজ করেও ক্লান্ত হয়ে পড়েন, কারণ, কাজটি তিনি পছন্দ করছেন না। ফলে কাজটি তাঁর কাছে বোঝা বলে মনে হয়। সুতরাং প্রশ্নটা এটা নয় যে কতক্ষণ কাজ করছেন। আসল প্রশ্ন হলো কাজটি আপনি মন থেকে করছেন কি না।
কোরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘শপথ সময়ের। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।’ (সুরা আসর, আয়াত: ১-২)
এই আয়াতে আল্লাহ সময়ের নামে শপথ করেছেন। কোরআনে আল্লাহ যখন কোনো কিছুর নামে শপথ করেন, তখন বুঝে নিতে হবে সেটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ‘আসর’ মানে সময়, যুগ।
মহানবী (সা.) বলেন, ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত: সুস্থতা ও অবসর সময়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২)
সুস্থ শরীর আর হাতে থাকা ফাঁকা সময়, এই দুটি জিনিস মানুষ সবচেয়ে বেশি অবহেলা করে। যখন সুস্থ থাকে তখন সময়কে কাজে লাগায় না। যখন সময় হাতে থাকে তখন অকাজে সময় নষ্ট করে।
তোমার প্রতিপালকের হক আছে তোমার ওপর, তোমার নিজের হক আছে তোমার ওপর, তোমার পরিবারের হকও আছে তোমার ওপর। প্রতিটি হকদারকে তার হক দাও।সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৬৮
নবী–জীবনের অভিজ্ঞতা
সাহাবি সালমান ফারসি (রা.) একদিন তাঁর ভাই আবু দারদার ঘরে গেলেন। দেখলেন তাঁর স্ত্রী উদাসভাবে বসে আছেন। জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, ‘তোমার ভাইয়ের দুনিয়ার প্রতি কোনো আগ্রহই নেই। সারাক্ষণ ইবাদতে ডুবে থাকেন।’
আবু দারদা (রা.) ফিরলে সালমান তাঁকে বললেন, ‘তোমার প্রতিপালকের হক আছে তোমার ওপর, তোমার নিজের হক আছে তোমার ওপর, তোমার পরিবারের হকও আছে তোমার ওপর। প্রতিটি হকদারকে তার হক দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৬৮)
আবু দারদা পরে এই কথা নবীজিকে জানালেন। মহানবী বললেন, ‘সালমান সত্যি বলেছে।’ একজন সাহাবি, যিনি রাত জেগে নফল ইবাদত করছিলেন, তাঁকেও নবীজি থামিয়ে দিলেন। কারণ, অতিরিক্ত ইবাদতও যদি পরিবারের হক নষ্ট করে, তাহলে সেটাও ভারসাম্যহীনতা।
মহানবী (সা.) নিজে মাত্র ২৩ বছরে একটা গোটা জাতির চিন্তা, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলে দিয়েছেন। অথচ তাঁর দিনও ছিল ২৪ ঘণ্টার। যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন, বিচার করেছেন, প্রতিনিধিদল গ্রহণ করেছেন, আবার নিজের ঘরের কাজও করেছেন।
আয়েশা (রা.) বলেছেন, তিনি নিজের জামা নিজে সেলাই করতেন, ছাগলের দুধ দোহন করতেন এবং নিজের জুতা নিজে মেরামত করতেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৪৯০৩)
এত বিশাল দায়িত্বের মধ্যেও তিনি পরিবারের ছোট ছোট কাজে সময় বের করতেন। তাঁর এই বিশাল কর্মযজ্ঞের একটা রহস্য ছিল সকালের বরকত। মহানবী (সা.) বলেন, ‘হে আল্লাহ, আমার উম্মতের সকালবেলায় বরকত দাও।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬০৬)
তিনি নিজেও সকালেই গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করতেন। যুদ্ধের অভিযান, ব্যবসার কাফেলা—সবকিছুই ভোরে পাঠাতেন। সাহাবি সাখর ইবনে ওয়াদাআ (রা.) এই সুন্নত মেনে ভোরে ব্যবসা শুরু করতেন। ফলে তাঁর ব্যবসা এত ফুলেফেঁপে উঠেছিল যে টাকা রাখার জায়গা পেতেন না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২১২)
রাসুল এক দিনে অনেক কাজ করতে পেরেছেন। আপনি সামান্য কয়েকটা কাজ শেষ করতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। আসলে পার্থক্যটা সময়ের পরিমাণে নয়, সময়ের ব্যবহার পদ্ধতিতে।
কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবন সমন্বয়ের সমাধান
রাতেই পরিকল্পনা করুন: রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পরবর্তী দিনের কাজগুলো লিখে রাখুন, আগামীকাল কী কী কাজ করবেন।সকালে উঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি দিয়ে শুরু করুন। কথায় আছে পরিকল্পনাহীন জীবন শুকনা পাতার মতো উড়তে থাকে।
অফিসের কাজ বাসায় আনবেন না: অফিসের সময় আর পরিবারের সময়ের মাঝে স্পষ্ট দেয়াল তুলুন। বাসায় ফিরে কাজের সামগ্রী সরিয়ে রাখুন। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর মুহূর্তে অফিসের কথা ভাবলে সেই সময়ের প্রশান্তিটা উপভোগ করতে পারবেন না।
সময়মতো নামাজ: নামাজের ওয়াক্তকে দিনের স্বাভাবিক বিরতি বানান। প্রতিটা নামাজ একটা রিসেট বাটনের মতো। নিয়মিত নামাজ আদায় করলে সময়ে বরকত পাওয়া যায়।
‘না’ বলার অভ্যাস করুন: সব কাজে হ্যাঁ বলবেন না। মহানবী (সা.) নিজে সব দায়িত্ব একা করেননি। সাহাবিদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দিতেন। যে কাজ আপনার না করলেও চলে, সেটাতে না বলতে শিখুন।
ঘুমের আগে দিনের হিসাব: রাতে ঘুমানোর আগে দিনটা একবার হিসাব করুন। আজ কোন কাজে সময় নষ্ট হলো, কোন কাজটা করা উচিত ছিল। একটু ভাবুন। এই ছোট্ট অভ্যাসই ধীরে ধীরে দিনগুলোকে বদলে দেয়।
শেষ কথা
আপনার দিনও ২৪ ঘণ্টার। নবীজির দিনও ছিল ২৪ ঘণ্টার। রাসুল এক দিনে অনেক কাজ করতে পেরেছেন। আপনি সামান্য কয়েকটা কাজ শেষ করতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। আসলে পার্থক্যটা সময়ের পরিমাণে নয়, সময়ের ব্যবহার পদ্ধতিতে।
আজ থেকে একটা কাজ করতে পারেন। অফিসের সময় অফিসে কাজে পরিপূর্ণ মনোযোগ দিন। মুঠোফোন দূরে সরিয়ে রাখুন। বাসায় ফিরে পরিবারের সঙ্গে একনিষ্ঠভাবে সময় দিন। আর দিনের শুরুটা করুন এই দোয়া দিয়ে, ‘হে আল্লাহ, আমার সময়ে বরকত দাও।’
দোয়ায় সময় বাড়বে না, কিন্তু বরকত আসবে। অল্প সময়ে অনেক কাজ করতে পারবেন।
মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর: খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়