যে ৭ কারণে মানুষ হেদায়েত থেকে বঞ্চিত হয়

ছবি: পেক্সেলস

হেদায়েত আল্লাহ–তাআলার মহান নেয়ামত, যা মানুষকে সত্যের দিকে পরিচালিত করে। তবে কিছু নৈতিক ও আত্মিক ব্যাধি এ পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এসব প্রতিবন্ধকতার কথা স্পষ্টভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

হেদায়েত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কয়েকটি প্রধান কারণ সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো।

১. হিংসা ও অহংকার

হিংসা-অহংকার হেদায়েত লাভের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। আল্লাহ কোনো অহংকারীকে হেদায়েত দান করেন না। কোরাইশ নেতাদের হেদায়েত না পাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল এই হিংসা এবং সত্যের প্রতি বিদ্বেষ।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে অহংকার করে আমি তাদের আমার নিদর্শনসমূহ থেকে বিমুখ রাখব। তারা আমার সব রকম নিদর্শন দেখলেও তাতে ইমান আনবে না। তারা হেদায়েতের সরল পথ দেখলেও সে পথ গ্রহণ করবে না। কিন্তু ভ্রষ্টতার পথ দেখলে সেটা গ্রহণ করবে। এটা এ কারণে, তারা আমার নিদর্শনসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তারা এ থেকে উদাসীন।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৪৬)

হিংসা-অহংকার হেদায়েত লাভের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। আল্লাহ কোনো অহংকারীকে হেদায়েত দান করেন না।

২. নেতৃত্ব বা পদমর্যাদার লোভ

নেতৃত্ব বা পদমর্যাদার লোভ হেদায়েত লাভের পথে বড় প্রতিবন্ধক। এ ক্ষেত্রে হিরাক্লিয়াসের অবস্থা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মদিনার দূত দাহিয়া কালবি (রা.) তাঁর নিকট নবীজির পক্ষ থেকে চিঠি পৌঁছান। তিনি পত্র পাঠ করে আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে নবীজির অবস্থা জানেন। কিন্তু ইমান আনার ইচ্ছা সত্ত্বেও নেতৃত্ব ও পদমর্যাদার লোভের কারণে হেদায়েতের সরল পথ গ্রহণ করতে পারেননি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭)

এই ব্যাধিই ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের ইমানের পথে বাধা হয়েছিল। সত্যের আহ্বান তাদের কাছে আসার পরে সে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে বিরূপ মন্তব্য করেছিল।

আরও পড়ুন

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা বলল, আমরা কি আমাদের মতোই দুজন মানুষের প্রতি ইমান আনব, অথচ তাদের সম্প্রদায় (বনি ইসরাইল) আমাদের দাসত্ব করছে।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৪৭)

বর্তমানেও বহু মানুষ হক জেনেও তা গ্রহণ করে না শুধু পদমর্যাদা বা নেতৃত্ব হারানোর ভয়ে।

৩. প্রবৃত্তির অনুসরণ

প্রবৃত্তির পূজা মানুষকে হেদায়েত থেকে বঞ্চিত করে রাখে। তাকে হক ও সত্য থেকে বিচ্যুত করে দেয়। সে মিথ্যাকে তার সামনে সুশোভিত করে হাজির করে এবং সেও অন্ধভাবে তা বিশ্বাস করে নেয়।

আল্লাহ বলেন, ‘আর আপনি প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না। তাহলে তা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ২৬)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর আপনি ওই ব্যক্তির আনুগত্য করবেন না, যার অন্তরকে আমি আমার স্মরণ থেকে উদাসীন করে দিয়েছি এবং সে তার খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে এবং তার কার্যকলাপ সীমা ছাড়িয়ে গেছে।’ (সুরা কাহফ, আয়াত: ২৮)

যখন তাদের বলা হয়, আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তোমরা সেদিকে এবং রাসুলের দিকে এসো, তখন তারা বলে আমাদের জন্য তা-ই যথেষ্ট, যার ওপর আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের পেয়েছি।
কোরআন, সুরা মায়েদা: ১০৪

ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘প্রবৃত্তিপূজারিকে তার খেয়াল-খুশি অন্ধ ও বধির করে দেয়। ফলে সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্য তার করণীয় কী তা ভুলে যায় এবং তা সে অনুসন্ধানও করে না। বরং আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের রাজি-খুশির প্রতি সে সন্তুষ্ট হয় না এবং তাঁদের অসন্তোষের বিষয়ে তার মনে কোনো অনুশোচনা জাগে না। বরং প্রবৃত্তির চাহিদায় সে খুশি হয় এবং নিজের খেয়াল-খুশির বিরোধিতা করাটা তার জন্য অস্বস্তিকর হয়ে যায়।’ (ইমাম ইবনে তাইমিয়া, মিনহাজুস সুন্নাহ, ৫/২৫৬, জামিয়াতুল ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সাউদ, ১৯৮৬)

৪ ও ৫. স্বজন ও সম্পদের সীমাহীন ভালোবাসা

পরিবার-পরিজন, ঘরবাড়ি, ধনসম্পদ ইত্যাদির ভালোবাসা থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু এসবের ভালোবাসা যদি সীমা অতিক্রম করে তাহলে এগুলোই হেদায়েত বঞ্চিত হওয়ার কারণ হয়।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবী! আপনি মুসলমানদের) বলে দিন, তোমাদের কাছে যদি তোমাদের পিতা, পুত্র, ভাই, স্ত্রী, গোত্র ও ধনসম্পদ যা তোমরা উপার্জন করো, ব্যবসা-বাণিজ্য যার মন্দা পড়ার আশঙ্কা করো এবং বসবাসের সেই ঘর যা তোমরা পছন্দ করো (এগুলো যদি) আল্লাহ তাঁর রাসুল এবং তাঁর পথে জিহাদ করা অপেক্ষা বেশি প্রিয় হয় তবে অপেক্ষা করো, তাহলে আল্লাহর ফয়সালা আসার অপেক্ষা করো। আল্লাহ অবাধ্য সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ২৪)

আরও পড়ুন

৬. পূর্বপুরুষের অজুহাত

পূর্বপুরুষের অনুসরণ মানুষকে অন্ধ বানিয়ে দেয়। ফলে সত্য-মিথ্যা যাচাই করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে এবং বাপ-দাদার কর্মনীতিই তাদের কাছে শ্রেয় মনে হয়। রাসুল (সা.) যখন মুশরিকদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করতেন, তখন তারা বাপ-দাদার কথা বলে তার আহ্বান এড়িয়ে যেত।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর যখন তাদের বলা হয়, আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তোমরা সেদিকে এবং রাসুলের দিকে এসো, তখন তারা বলে আমাদের জন্য তা-ই যথেষ্ট, যার ওপর আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের পেয়েছি। যদিও তাদের পূর্বপুরুষেরা কিছু জানত না এবং তারা সুপথপ্রাপ্তও ছিল না।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ১০৪)

আবু তালেব সম্পর্কে হাদিস এসেছে, ‘তার মৃত্যু নিকটবর্তী হলে, রাসুল (সা.) তার কাছে এসে কালেমার দাওয়াত দিতে থাকলেন। সেখানে উপস্থিত ছিল আবু জাহল ও আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়া। তারা বারবার বলছিল, তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করবে? তখন আবু তালিব বললেন, আমি আবদুল মুত্তালিবের মিল্লাতের ওপর আছি, এবং তিনি কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করতে অস্বীকৃতি জানালেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৭৭২)

সারকথা হলো, আল্লাহর দিকনির্দেশনা এবং নবী-রাসুলদের পদাঙ্ক অনুসরণ করলে মানুষ হেদায়েত লাভে ধন্য হবে। এর বিপরীত হলে হেদায়েত থেকে বঞ্চিত হবে।

৭. শয়তানের অনুসরণ

শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করার জন্য আল্লাহর সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করেছে। সে মানুষকে সরল পথ থেকে বিচ্যুত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করে। তার অনুসরণ যে করবে সে কখনো হেদায়েতের সরল পথ পাবে না।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু। সুতরাং তাকে শত্রুরূপেই গ্রহণ করো। সে তার অনুসারীদেরকে এ জন্যই দাওয়াত দেয়, যাতে তারা জাহান্নামবাসী হয়ে যায়।’ (সুরা ফাতির, আয়াত: ৬)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর আপনি তাদেরকে ওই ব্যক্তির ঘটনা পড়ে শোনান, যাকে আমি আমার নিদর্শনাবলি দিয়েছিলাম, কিন্তু সে তা সম্পূর্ণ বর্জন করে। ফলে শয়তান তার পিছু নেয়। পরিণামে সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৭৫)

সারকথা হলো, আল্লাহর দিকনির্দেশনা এবং নবী-রাসুলদের পদাঙ্ক অনুসরণ করলে মানুষ হেদায়েত লাভে ধন্য হবে। এর বিপরীত হলে হেদায়েত থেকে বঞ্চিত হবে।

  • মাহমুদ হাসান ফাহিম : শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, টঙ্গী

আরও পড়ুন