সময়ের চাকা ঘুরে আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ছে পবিত্র মাহে রমজান। রহমত, মাগফিরাত আর নাজাতের বার্তা নিয়ে আসা এই মাসটি মুমিনের জন্য এক আধ্যাত্মিক বসন্তকাল।
বিখ্যাত তাবেয়ি হাসান বসরী (র.) বলতেন, “আল্লাহ তাআলা রমজান মাসকে তাঁর মাখলুকের জন্য একটি প্রতিযোগিতার ময়দান বানিয়েছেন, যেখানে তারা আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টির দিকে ধাবিত হয়। এতে একদল মানুষ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়, আর যারা পিছিয়ে পড়ে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।” (ইবনে রজব হাম্বলি, লাতায়েফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা: ২০৯, দারু ইবনি কাসির, বৈরুত, ২০০৪)
রমজানের এই আধ্যাত্মিক প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হতে শাবান মাসের শেষ দিনগুলোতে আমাদের করণীয় সম্পর্কে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এখানে আলোচনা করা হলো।
১. দোয়া ও শুকরিয়া
রমজান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারা আল্লাহর এক মহান নেয়ামত। আল্লাহর রাসুল (সা.) রজব মাস থেকেই দোয়া করতেন, “আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজাবা ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রমাদান।” অর্থাৎ, হে আল্লাহ, আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৫৯১)
রমজান মাস সন্নিকটে দেখে আমাদের উচিত আল্লাহর কাছে বারবার প্রার্থনা করা এবং এই নেয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করা।
২. সুসংবাদ ও মানসিক প্রস্তুতি
রমজানের আগমনে আনন্দিত হওয়া ইমানের লক্ষণ। আল্লাহর রাসুল (সা.) সাহাবিদের রমজানের সুসংবাদ দিতেন এই বলে যে “তোমাদের কাছে বরকতময় মাস রমজান এসেছে, আল্লাহ তোমাদের ওপর এর রোজা ফরজ করেছেন। এতে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ রাখা হয়।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ২১০৬)
রমজান কেবল একটি মাস নয়, এটি জান্নাতে নিজের মর্যাদা বৃদ্ধির শ্রেষ্ঠ সুযোগ।
৩. তওবা ও সংকল্প
রমজান হলো জীবনের নতুন পাতা খোলার সময়। শাবান মাসেই আমাদের বিগত দিনের গুনাহের জন্য তওবা করে পবিত্র হতে হবে। যদি কেউ রমজানেও নিজেকে সংশোধন করতে না পারে, তবে সে প্রকৃতই হতভাগা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” (সুরা নুর, আয়াত: ৩১)
এখনই সংকল্প করতে হবে যে, এই রমজান হবে আমাদের জীবনের সেরা রমজান।
৪. সঠিক পরিকল্পনা
দুনিয়ার কাজের জন্য আমরা নিখুঁত পরিকল্পনা করি, কিন্তু আখেরাতের জন্য পরিকল্পনা অনেক সময় অবহেলিত থাকে। রমজানে কতটুকু কোরআন তেলাওয়াত করবেন, কোন সময়ে জিকির করবেন, পরিবারের জন্য কতটা সময় দেবেন—তার একটি লিখিত রুটিন আজই তৈরি করুন।
বিশৃঙ্খলা পরিহার করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ইবাদত করলে সময়ের বরকত বাড়ে।
৫. দোয়া ও জিকিরের বিশেষ তালিকা
রমজানে কবুলিয়াতের মুহূর্তগুলো কাজে লাগাতে নিজের প্রয়োজনীয় দোয়ার একটি তালিকা তৈরি করুন। নামাজের পর, কাজের ফাঁকে বা যাতায়াতের সময় কোন জিকিরগুলো করবেন, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করে নিন।
৬. শক্তিতে শুরু
“যাঁর শুরুটা সুন্দর, তাঁর শেষটাও সুন্দর”—এই নীতিতে বিশ্বাসী হতে হবে। রমজানের প্রথম দিন থেকেই পূর্ণ উদ্যমে ইবাদত শুরু করতে হবে।
তবে নিজের শক্তির ওপর ভরসা না করে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। কারণ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া এক কদমও অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়।
৭. পূর্বসূরিদের আদর্শ অনুসরণ
আমাদের পূর্বসূরিরা রমজানে ইবাদতে কেমন নিমগ্ন হতেন, তা জানা জরুরি। ইমাম সুফিয়ান সাওরি (রহ.) রমজান এলে সব কাজ ছেড়ে কোরআন তেলাওয়াতে মগ্ন হতেন। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) রমজান মাসে অন্তত ৬০ বার কোরআন খতম করতেন। (ইবনে রজব হাম্বলি, লাতায়েফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা: ১৭১, দারু ইবনি কাসির, বৈরুত, ২০০৪)
তাঁদের এই ত্যাগ আমাদের অনুপ্রাণিত করবে।
৮. বদভ্যাস ত্যাগ ও আত্মসংযম
রমজান আসার আগেই রাত জাগা, অতিরিক্ত ঘুমানো, অতিভোজন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় দেওয়ার মতো বদভ্যাসগুলো ত্যাগ করার চেষ্টা করতে হবে।
শরীর ও মনকে রোজার উপযোগী করে তুলতে শাবান মাসে কিছু নফল রোজা রাখা অত্যন্ত কার্যকর।
৯. দাওয়াত ও সমাজসেবা
রমজান হলো ইসলাম প্রচারের সুবর্ণ সময়। মানুষের মন এ সময় নরম থাকে। পাড়া-প্রতিবেশী বা দরিদ্রদের মধ্যে ইফতার সামগ্রী বা ছোট ছোট উপহার বিতরণ করে ভালোবাসার বন্ধন তৈরি করা যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “তার চেয়ে উত্তম কথা কার হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে ডাকে, ভালো কাজ করে এবং বলে যে আমি একজন মুসলিম।” (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৩)
১০. দ্বিগুণ সওয়াবের সংকল্প
নিজে রোজা রাখার পাশাপাশি অন্যকে ইফতার করানোর মাধ্যমে সওয়াব দ্বিগুণ করার সুযোগ রয়েছে।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে ওই রোজাদারের সমান সওয়াব পাবে, তবে রোজাদারের সওয়াব থেকে সামান্যও কমানো হবে না।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৮০৭)
১১. আখলাক ও আচরণের উন্নয়ন
রোজা কেবল উপবাস থাকার নাম নয়। এটি চরিত্র গঠনের প্রশিক্ষণ। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা এবং সে অনুযায়ী আমল করা বর্জন করে না, তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০৩)
তাই রাগের নিয়ন্ত্রণ, গিবত বা পরনিন্দা ত্যাগ এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার মাধ্যমে রোজাকে সার্থক করতে হবে।
১২. পরোপকার ও খেদমত
রমজানে মানুষের সেবা করা ইবাদতের অংশ। বিপদগ্রস্তের কষ্ট লাঘব করলে আল্লাহ কেয়ামতের দিন কষ্ট লাঘব করবেন। গৃহকর্মী বা অধীনস্থদের কাজের চাপ কমিয়ে দেওয়াও একটি মহান গুণ, যার বিনিময়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তির ওয়াদা করা হয়েছে।
রমজান আমাদের কাছে আসে আত্মশুদ্ধির সুযোগ হয়ে। আমরা যদি এই ১২টি বিষয়ে এখন থেকেই যত্নশীল হই, তবে ইনশাআল্লাহ রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের জন্য রহমত বয়ে আনবে।