পৃথিবীতে মা-বাবা হলেন সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় নেয়ামত। তাঁদের মৃত্যু সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা তৈরি করে। মানুষ মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের আমলের বা পুণ্য অর্জনের সব দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
কবরের জীবনে একজন মৃত ব্যক্তি নিজের জন্য আর এক রাকাত নামাজও পড়তে পারেন না বা সামান্য দানও করতে পারেন না। তখন মৃত ব্যক্তি সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েন এবং জীবিতদের দোয়ার অপেক্ষায় থাকেন। ইসলামে একে ‘ইসালে সওয়াব’ (পুণ্য পৌঁছানো) বলা হয়।
মৃত মা-বাবার জন্য সবচেয়ে উপকারী ও ফলপ্রসূ ৩টি আমল আলোচনা করা হলো।
১. নিয়মিত ক্ষমা প্রার্থনা করা
মা-বাবার জন্য সন্তানের সবচেয়ে বড় এবং সরাসরি উপকারী আমল হলো তাঁদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। সন্তান যখন মা-বাবার জন্য দোয়া করে, তখন তা বিনা বাধায় কবুল হয় এবং কবরে তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘বেহেশতে একজন মানুষের মর্যাদা হঠাৎ বৃদ্ধি করে দেওয়া হবে। তখন তিনি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করবেন, হে আল্লাহ, আমার এই মর্যাদা কীভাবে হলো? তখন তাঁকে বলা হবে, তোমার জন্য তোমার সন্তানের ক্ষমা প্রার্থনা (ইস্তিগফার) করার কারণে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৬৬০)
মসজিদ তৈরি, পানির ব্যবস্থা করা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনুদান দেওয়া বা গাছ লাগানো। মৃত মা-বাবার নিয়তে এই কাজগুলো করলে এর সওয়াব অবিরত তাঁদের কবরে পৌঁছাতে থাকে।
পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ তাআলা মা-বাবার জন্য এই দোয়ার ভাষা শিখিয়ে দিয়েছেন, ‘রব্বির হামহুমা কামা রব্বায়ানি সগিরা (হে আমার প্রতিপালক, তাঁদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন)।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৪)
প্রতিদিনের নামাজ শেষে বা যেকোনো ইবাদতের পর এই দোয়াটি পড়া একজন নেক সন্তানের প্রধান দায়িত্ব।
২. তাঁদের পক্ষ থেকে ‘স্থায়ী’ দান করা
এমন দান, যার উপকারিতা দীর্ঘস্থায়ী হয়। একে বলা হয় ‘সদকায়ে জারিয়া’। যেমন—মসজিদ তৈরি, পানির ব্যবস্থা করা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনুদান দেওয়া বা গাছ লাগানো। মৃত মা-বাবার নিয়তে এই কাজগুলো করলে এর সওয়াব অবিরত তাঁদের কবরে পৌঁছাতে থাকে।
সাহাবি সাদ ইবনে উবাদাহর মায়ের মৃত্যু হলে তিনি নবীজির কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন, আমি যদি মায়ের পক্ষ থেকে সদকা করি, তবে কি তা তাঁর উপকারে আসবে? নবীজি (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ।’
সাদ (রা.) জানতে চাইলেন, ‘কোন সদকা সবচেয়ে উত্তম?’ নবীজি বললেন, ‘পানির ব্যবস্থা করা।’ এরপর সাদ একটি কূপ খনন করেন এবং বলেন, ‘এটি সাদের মায়ের জন্য।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩৬৬৪)
চারটি কাজ: তাঁদের জন্য দোয়া ও ক্ষমাপ্রার্থনা করা, তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁদের প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিগুলো বাস্তবায়ন করা, তাঁদের বন্ধুদের সম্মান করা এবং তাঁদের আত্মীয়তার সম্পর্কগুলো, যা তাঁদের মাধ্যম ছাড়া যুক্ত নয়, তা বজায় রাখা।
জীবিত ব্যক্তি তাঁর যেকোনো আর্থিক বা শারীরিক ইবাদতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে বখশিয়ে দিতে পারেন। যেকোনো নফল ইবাদত, যেমন—নামাজ, রোজা, কোরআন পাঠ বা সদকার সওয়াব অন্য কোনো মৃত ব্যক্তির রুহে পৌঁছে দেওয়া যায়; এতে মৃত ব্যক্তি উপকৃত হন এবং এই সওয়াব তাঁদের কাছে পৌঁছে।’ (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ২/২৪৩, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)
৩. তাঁদের আত্মীয়–বন্ধুদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা
মা-বাবা দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর তাঁদের স্মৃতি ও ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম উপায় হলো তাঁদের আত্মীয়স্বজন (যেমন—চাচা, ফুফু, মামা, খালা) এবং জীবিত বন্ধুদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। মা-বাবা যদি কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন বা তাঁদের কোনো ঋণ থাকে, তা দ্রুত পূরণ করা।
একবার বনু সালামা গোত্রের এক ব্যক্তি নবীজির কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার মা-বাবার মৃত্যুর পরও কি তাঁদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার কোনো দায়িত্ব আমার ওপর বাকি আছে?’
রাসুল (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, চারটি কাজ: তাঁদের জন্য দোয়া ও ক্ষমাপ্রার্থনা করা, তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁদের প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিগুলো বাস্তবায়ন করা, তাঁদের বন্ধুদের সম্মান করা এবং তাঁদের আত্মীয়তার সম্পর্কগুলো, যা তাঁদের মাধ্যম ছাড়া যুক্ত নয়, তা বজায় রাখা।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫১৪২)
মা-বাবার মৃত্যুর পর সন্তানই হলো তাঁদের সবচেয়ে বড় ‘সদকায়ে জারিয়া’। রাসুল (সা.) বলেছেন, মানুষ মারা গেলে তিনটি কাজ ছাড়া সব আমল বন্ধ হয়ে যায়: সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)
সুতরাং, সন্তান যদি নিজে সৎ পথে চলে এবং ইবাদত-বন্দেগিতে লিপ্ত থাকে, তবে আলাদাভাবে কোনো আমল না করলেও সেই নেক সন্তানের প্রতিটি ভালো কাজের একটি নির্দিষ্ট সওয়াব স্বয়ংক্রিয়ভাবে মা-বাবার পুণ্যের খাতায় যুক্ত হতে থাকে।