ফোনের নোটিফিকেশন চেক করার মতো দ্রুত কি বাবা-মায়ের ডাকে সাড়া দিই

ছবি: এআই / প্রথম আলো

আধুনিক এই সমাজে এমন এক অদ্ভুত ‘অধিকারবোধ’ তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানও বাবা-মায়ের অসীম ত্যাগের স্বীকৃতি দেওয়ার বদলে তাঁদের প্রতি চরম উদাসীনতা দেখায়।

এমনকি অনেকে তো তর্কের মুখে বলেই বসেন, “আমরা তো জন্ম নিতে চাইনি, তোমরা আমাদের পৃথিবীতে এনেছ, তাই আমাদের চাওয়া-পাওয়া পূরণ করা তোমাদের আইনি দায়িত্ব।”

ইসলামের সুশীতল ছায়ায় দাঁড়িয়ে যখন আমরা এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করি, তখন এর অসারতা খুব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

সন্তানরা কোনো যান্ত্রিক উপজাত নয়, বরং তারা আল্লাহর দেওয়া এক পবিত্র আমানত। ‘জন্ম নিতে চাইনি’—এই যুক্তিটি মূলত রবের ইচ্ছাকে অস্বীকার করার নামান্তর।

জন্ম কোনো জৈবিক দুর্ঘটনা নয়

ইসলাম আমাদের শেখায় যে, একটি শিশুর পৃথিবীতে আসা কোনো কাকতালীয় ঘটনা বা কেবল মানুষের ইচ্ছার ফসল নয়; বরং এটি মহান আল্লাহর এক নিপুণ পরিকল্পনা। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন।” (সুরা শুরা, আয়াত: ৪৯)

সন্তানরা কোনো যান্ত্রিক উপজাত নয়, বরং তারা আল্লাহর দেওয়া এক পবিত্র আমানত। ‘জন্ম নিতে চাইনি’—এই যুক্তিটি মূলত রবের ইচ্ছাকে অস্বীকার করার নামান্তর। বাবা-মা হলেন সেই আমানত রক্ষার মাধ্যম, যাঁদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা একটি আত্মাকে এই নশ্বর পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তাই বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মানেই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া।

আরও পড়ুন

আনুগত্য যখন ইবাদত

ইসলামে বাবা-মায়ের সেবা করা বা তাঁদের প্রতি সদয় থাকা কেবল একটি সামাজিক প্রথা নয়, বরং এটি সরাসরি মহান আল্লাহর ইবাদতের সঙ্গে যুক্ত।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “আপনার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাঁদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়ই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাঁদের ‘উফ’ শব্দটি পর্যন্ত বলো না এবং তাঁদের ধমক দিও না; বরং তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩)

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বাবা-মায়ের অবাধ্য হওয়াকে ইসলামে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করার মতো ভয়াবহ পাপের ঠিক পরেই স্থান দেওয়া হয়েছে। নবীজি (সা.) বলেছেন, “আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় গুনাহগুলো সম্পর্কে বলব না? তাঁরা বললেন, অবশ্যই বলুন হে আল্লাহর রাসুল। তিনি বললেন, আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা এবং বাবা-মায়ের অবাধ্য হওয়া...” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৭৬)

যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শরিক করতে বাধ্য করে যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদের কথা মানবে না; কিন্তু পার্থিব জীবনে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে।
কোরআন, সুরা লোকমান, আয়াত: ১৫

বাবা-মা যদি নিখুঁত না হন

আজকের প্রজন্মের অনেক অভিযোগ, “বাবা-মা আমাদের বোঝেন না”, বা “তাঁরা বড্ড সেকেলে”। এই ধরনের মানসিকতা দূর করার জন্য কোরআন আমাদের সামনে হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পিতা আজরের কথোপকথন তুলে ধরেছে।

আজর কেবল কঠিন হৃদয়েরই ছিলেন না, তিনি ছিলেন মূর্তিপূজারী এবং ইসলামের ঘোর শত্রু। তিনি তাঁর সন্তানকে পাথর ছুড়ে মারার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন। (সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৪৬)

তবুও ইব্রাহিম (আ.) তাঁর বিনয় ত্যাগ করেননি। ইসলাম আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, বাবা-মা যদি আদর্শিক দিক থেকে ভুলও থাকেন বা আমাদের ধর্মের পথে বাধা হন, তবুও পার্থিব জীবনে তাঁদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করতে হবে।

পবিত্র কোরআনের নির্দেশ, “যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শরিক করতে বাধ্য করে যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদের কথা মানবে না; কিন্তু পার্থিব জীবনে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে।” (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৫)

আরও পড়ুন

দিতে শেখার আনন্দ

আমরা আমাদের সন্তানদের শৈশব থেকেই ‘নিতে’ শিখিয়েছি, কিন্তু ‘দিতে’ শেখাইনি। তাঁদের সব চাহিদা মুখ ফুটে বলার আগেই পূরণ করতে গিয়ে আমরা অজান্তেই তাঁদের মধ্যে এক ধরনের অধিকারবোধের অহংকার জন্ম দিয়েছি।

অথচ ইসলামের ইতিহাসে এমন ব্যক্তির উদাহরণ রয়েছে যিনি তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের একনিষ্ঠ সেবার উসিলায় গুহার মুখে আটকে পড়া বিশাল পাথর সরিয়ে আল্লাহর সাহায্য পেয়েছিলেন। সেই ব্যক্তি তাঁর নিজের সন্তানদের আগে বৃদ্ধ বাবা-মাকে দুধ পান না করানো পর্যন্ত নিজে কিছুই খেতেন না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৬৫)

এই ত্যাগের শিক্ষা আজকের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ফিরিয়ে আনা জরুরি। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস আমাদের মায়ের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছে, “এক ব্যক্তি রাসুলের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আমার সুন্দর সাহচর্য পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে? তিনি বললেন, তোমার মা। এভাবে পরপর তিনবার মায়ের কথা বলার পর চতুর্থবার তিনি বাবার নাম বললেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৭১)

তাঁরা চাওয়ার আগেই তাঁদের ছোটখাটো প্রয়োজনগুলো পূরণ করা। হতে পারে এক কাপ চা বানিয়ে দেওয়া কিংবা তাঁদের প্রিয় কোনো জিনিস উপহার দেওয়া।

ভারসাম্য রক্ষার পথে ছোট ছোট পদক্ষেপ

আজকের দিনে আমাদের নিজেদের কাছে কিছু প্রশ্ন করা প্রয়োজন:

  • আমি কি আমার ফোনের নোটিফিকেশন চেক করার মতো দ্রুততার সঙ্গে বাবা-মায়ের ডাকে সাড়া দিই?

  • আমি বাইরে বন্ধুদের সঙ্গে যেমন নম্রভাবে কথা বলি, ঘরে বাবা-মায়ের সঙ্গেও কি তেমন আচরণ করি?

  • আমি কি তাঁদের কেবল মানুষের সামনে সম্মান করি, নাকি নিভৃতেও তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করি?

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের করাল গ্রাস থেকে পরিবারকে বাঁচাতে হলে আমাদের দৈনন্দিন আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। এর জন্য নিচের চর্চাগুলো সহায়ক হতে পারে:

  • নিয়মিত যোগাযোগ: আগ্রহ নিয়ে প্রতিদিন বাবা-মায়ের খোঁজ নেওয়া।

  • অপ্রার্থিত সেবা: তাঁরা চাওয়ার আগেই তাঁদের ছোটখাটো প্রয়োজনগুলো পূরণ করা। হতে পারে এক কাপ চা বানিয়ে দেওয়া কিংবা তাঁদের প্রিয় কোনো জিনিস উপহার দেওয়া।

  • বিনয়ী কথা: মতের অমিল হতেই পারে, কিন্তু সেই সময় গলার স্বর নিচু রাখা এবং ‘উফ’ শব্দটিও না বলা ইবাদতের অংশ।

  • দোয়া করা: তাঁদের জন্য নিয়মিত দোয়া করা। রাসুল (সা.) শিখিয়েছেন যে, নেক সন্তানের দোয়ার সওয়াব মৃত্যুর পরও বাবা-মায়ের কবরে পৌঁছাতে থাকে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)

একদিন বাবা-মায়ের পায়ের শব্দগুলো চিরতরে মিলিয়ে যাবে, তাঁদের পরামর্শ দেওয়ার মুখগুলো কেবল ফ্রেমে বাঁধানো ছবি হয়ে থাকবে। সেই দিন আসার আগেই আমাদের ফিরে আসতে হবে।

আরও পড়ুন