ধর্ষণ প্রতিরোধে ইসলামের ভাবনা ও বিধান

ছবি: পেক্সেলস

ধর্ষণ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম উদ্বেগজনক সামাজিক ব্যাধি। কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ বা শারীরিক নির্যাতনই নয়, এটি মূলত মানুষের সম্মান, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকারের ওপর চরম বর্বর আঘাত।

প্রযুক্তির অভাবনীয় উৎকর্ষ ও আধুনিক আইনগত অগ্রগতির এই যুগেও যখন বিশ্বজুড়ে ধর্ষণের মতো নৃশংস অপরাধের রেখা ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী, তখন প্রমাণিত হয় যে কেবল শুষ্ক আইনি কড়াকড়ি বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে মানুষের ভেতরের এই অসুস্থতা দমন করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন মানুষের চিন্তা, মনস্তত্ত্ব, চরিত্র এবং সামগ্রিক সামাজিক আচরণের আমূল সংস্কার।

ইসলাম এই সমস্যাকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখে না, বরং একে মানুষের ব্যক্তিক, পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর এক গভীর নৈতিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করে।

তাই ধর্ষণ প্রতিরোধে ইসলাম এমন এক বহুমাত্রিক দর্শন উপস্থাপন করেছে, যেখানে মনস্তাত্ত্বিক আত্মশুদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং দৃষ্টান্তমূলক কঠোর ন্যায়বিচারের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।

লিঙ্গসমতার ইসলামি ধারণা

ধর্ষণ মানসিকতার মূলে থাকে ক্ষমতা, আধিপত্য এবং অপরকে অবদমিত করার এক অসুস্থ বিকৃতি। ইসলাম সমাজ থেকে এই আদিম হিংস্রতা দূর করতে সবার আগে মানুষের মৌলিক মর্যাদাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম-সন্তানকে (সর্বোচ্চ) মর্যাদাবান করেছি।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৭০)

এই চিরন্তন ঘোষণার মাধ্যমে ইসলাম স্পষ্ট করেছে যে মানুষের জীবন, সম্মান ও সম্ভ্রম অভিন্ন এবং তা কোনোভাবেই অলঙ্ঘনীয় নয়। প্রাক-ইসলামি জাহেলি সমাজে নারীদের ভোগ ও পণ্যের সামগ্রী মনে করা হতো, যা তাদের বিরুদ্ধে সব ধরনের সহিংসতার পথ প্রশস্ত করেছিল।

মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে... এবং মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।
কোরআন, সুরা নুর, আয়াত: ৩০-৩১

ইসলাম নারীর এই অবমূল্যায়নকে সমূলে উপড়ে ফেলে পুরুষ ও নারীর পারস্পরিক পরিপূরকতার দর্শন এনেছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা (নারীরা) তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৭)

এই আত্মিক ও সামাজিক সমতার চেতনা জাগিয়ে তোলার মাধ্যমে ইসলাম ধর্ষণের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রগুলোকে শুরুতেই অবরুদ্ধ করে।

তাকওয়া ও জবাবদিহি

অপরাধ বিজ্ঞানের পরিভাষায়, অপরাধ দমনের জন্য কেবল বাহ্যিক পুলিশি নজরদারি যথেষ্ট নয়; যতক্ষণ না কোনো ব্যক্তির নিজের ভেতরে বিবেকের মতো ‘অভ্যন্তরীণ পুলিশ’ জেগে না ওঠে। ইসলাম ধর্ষণের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ হিসেবে মানুষের অন্তরে ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহভীতির শক্তিশালী সেন্সর বসিয়ে দেয়।

একজন মানুষ যখন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে যে নির্জন অন্ধকারেও মহান আল্লাহ তার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব কাজ পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রতিটি সূক্ষ্ম কর্মের জন্য পরকালে জবাবদিহি করতে হবে, তখন সে কোনো অপরাধে লিপ্ত হওয়ার আগেই নিজের বিবেকের কাছে বাধাগ্রস্ত হবে।

ইসলাম শাস্তিমূলক আইন প্রয়োগের আগে মানুষের মনস্তত্ত্বে এই নৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, যা যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে মানুষের প্রথম প্রতিরক্ষাব্যুহ।

আরও পড়ুন

দৃষ্টির সংযম ও ডিজিটাল মনস্তত্ত্ব

ধর্ষণ বা যেকোনো যৌন সহিংসতার প্রথম অনুঘটক হিসেবে কাজ করে মানুষের অসংযত দৃষ্টি। বর্তমান যুগে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং পর্নোগ্রাফির বিস্তার মানুষের অপরাধপ্রবণতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ইসলাম এই সমস্যার মনস্তাত্ত্বিক মূলে আঘাত করেছে।

পবিত্র কোরআনে পুরুষ ও নারী উভয়কেই সমানভাবে দৃষ্টি সংযত রাখার আদেশ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে... এবং মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩০-৩১)

অসংযত দৃষ্টি মানুষের মনে কুপ্রবৃত্তির জন্ম দেয়, যা একপর্যায়ে অপরাধে রূপ নেয়। ইসলাম স্বাভাবিক মানবিক বাসনা বা প্রবৃত্তির চাহিদাকে অস্বীকার বা দমন করতে বলে না, বরং একে একটি সুশৃঙ্খল ও পবিত্র কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করার বৈজ্ঞানিক শিক্ষা দেয়।

অপরাধের একক দায়

ধর্ষণ প্রতিরোধে একটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষাকবচ হিসেবে উভয় লিঙ্গের জন্য পোশাক ও আচরণের শালীনতাকে ইসলাম আবশ্যক করেছে। শালীনতা হলো একটি সামগ্রিক সামাজিক আবহ, যা অপরাধের উদ্দীপনা দূর করে সমাজকে শান্ত রাখে।

তবে ইসলামের এই সামষ্টিক শালীনতার শিক্ষাকে ভুল ব্যাখ্যা করে কোনোভাবেই অপরাধীর দায়কে লঘু করার সুযোগ নেই। ধর্ষণ একটি একক ও জঘন্য অপরাধ এবং এর সম্পূর্ণ দায়ভার একচ্ছত্রভাবে কেবল অপরাধীর ওপরই বর্তায়।

হে যুব সম্প্রদায়, তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা তা দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫,০৬৬

কোনো নারীর পোশাক, পেশা, একাকী অবস্থান কিংবা সামাজিক স্বাধীনভীতিক পরিচয়কে এই বর্বরতার কারণ বা অজুহাত (ভিকটিম ব্লেইমিং) হিসেবে দাঁড় করানোর কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। অপরাধী তার নিজের পাশবিক আচরণের জন্য এককভাবে দায়ী এবং সমাজ বা আইন তাকে কোনো অজুহাতেই ছাড় দিতে পারে না।

বৈধ সম্পর্কের সহজীকরণ

সুস্থ ও মূল্যবোধনির্ভর পরিবারই একজন মানুষের সুস্থ মনস্তত্ত্ব গড়ে তোলার প্রথম পাঠশালা। পরিবারে যদি ধর্মীয় অনুশাসন, মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, বোনের প্রতি স্নেহ এবং অন্য নারীদের প্রতি সামাজিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা থাকে, তবে সন্তানরা কখনোই কোনো নারীর মর্যাদা বিনষ্ট করার কথা ভাবতেও পারে না।

অভিভাবকেরা যাতে সন্তানদের নৈতিক ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন করে গড়ে তোলেন, সে বিষয়ে ইসলাম কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। এর পাশাপাশি, সমাজের জৈবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে ইসলাম বৈধ ও স্বাভাবিক বৈবাহিক সম্পর্ককে অত্যন্ত সহজ করার তাগিদ দিয়েছে।

আরও পড়ুন

রাসুল (সা.) যুবসমাজকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘হে যুব সম্প্রদায়, তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা তা দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫,০৬৬)

সমাজে যখন বিয়ের মতো পবিত্র বন্ধন কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে, তখন জেনা ও ধর্ষণের মতো অপরাধের সামাজিক বিস্তার ঘটে।

অপরাধের ধরন ও কঠোর দণ্ডবিধি

ইসলামের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা অতিক্রম করেও যদি কেউ সমাজে ধর্ষণের মতো অপরাধ ঘটায়, তবে ইসলামি বিচারব্যবস্থায় তার জন্য রাখা হয়েছে কঠোর ও আপসহীন শাস্তির বিধান।

ইসলামি দণ্ডবিধিতে ধর্ষণকে কেবল একটি সাধারণ ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না; বরং একে ‘হিরাবাহ’ বা সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিতকারী একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিচার প্রক্রিয়া হতে হবে দ্রুত এবং সর্বসাধারণের সামনে দৃশ্যমান, যা সমাজে বাস করা অন্যান্য অপরাধপ্রবণ মানুষের হৃদয়ে তীব্র ভীতি সঞ্চার করবে এবং সমাজকে পুরোপুরি নিরাপদ করে তুলবে।

ফিকহ শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ধর্ষণের অপরাধে জড়িত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ইসলামি বিচারক বা কাজি অপরাধের ভয়াবহতা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ড (রজম বা তরবারি দ্বারা) বা আজীবন কারাদণ্ডসহ সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে পারেন। (ইবনে কুদামাহ, আল-মুগনি, ৯/৫৯, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৫)

তদুপরি, এই বিচার প্রক্রিয়া হতে হবে দ্রুত এবং সর্বসাধারণের সামনে দৃশ্যমান, যা সমাজে বাস করা অন্যান্য অপরাধপ্রবণ মানুষের হৃদয়ে তীব্র ভীতি সঞ্চার করবে এবং সমাজকে পুরোপুরি নিরাপদ করে তুলবে।

সারকথা

ধর্ষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে ইসলামের এই দর্শন অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ। এটি একদিকে যেমন মানুষের আত্মশুদ্ধি, দৃষ্টির সংযম ও পারিবারিক সংস্কারের মাধ্যমে অপরাধের অভ্যন্তরীণ উৎসে আঘাত করে; অন্যদিকে কঠোর আইনি প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধীর বাহ্যিক বিস্তার রোধ করে।

আজ যদি আমরা একটি নিরাপদ, মানবিক ও ধর্ষণমুক্ত সমাজ গড়তে চাই, তবে কেবল কাগজের আইনের ওপর নির্ভর না করে ইসলামের এই সামগ্রিক সমাজদর্শনকে রাষ্ট্রে ও সমাজে বাস্তবায়ন করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

  • ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ

আরও পড়ুন