‘তোমার ওপর তোমার শরীরের হক রয়েছে’

ছবি: পেক্সেলস

আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রল করলেই ‘সেলফ-কেয়ার’ বা আত্মপরিচর্যার চোখধাঁধানো সব ছবি চোখে পড়ে। সুগন্ধি মোমবাতি, দামী বাথটাব, চকোলেট কিংবা শপিং স্প্রি—এগুলোকেই যেন আত্মপরিচর্যার মাপকাঠি বানিয়ে ফেলা হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, আত্মপরিচর্যা কি কেবলই ভোগ্যপণ্য বা কেনা যায় এমন কোনো বিলাসিতা?

আত্মপরিচর্যা এখন নারীদের জন্য আরও একটি বাড়তি চাপে পরিণত হয়েছে—যেখানে তাকে প্রমাণ করতে হয় যে তিনি কতটা নিখুঁতভাবে নিজের যত্ন নিচ্ছেন। অথচ প্রকৃত আত্মপরিচর্যা সবসময় সুন্দর বা দেখানোর মতো হয় না; এর একটি ‘অসুন্দর’ বা কঠিন দিকও আছে।

প্রকৃতপক্ষে, আত্মপরিচর্যা মানে নিজেকে প্যাম্পার করা নয়, বরং নিজের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।

ভোগের সংস্কৃতি বনাম প্রকৃত যত্ন

আমরা যখন নিয়মিতভাবে কেনাকাটা বা বিলাসিতার মাধ্যমে নিজের ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করি, তার মানে হলো আমরা আত্মপরিচর্যার মূল ধারণা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি।

নিশ্চয়ই তোমার ওপর তোমার শরীরের হক রয়েছে।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৭৫

আত্মপরিচর্যা কোনো আপদকালীন ব্যবস্থা নয় যা আপনি একদম নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পর গ্রহণ করবেন। বরং এটি হলো প্রতিদিনের সচেতন সিদ্ধান্ত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন যে, আমাদের শরীরের ওপর আমাদের অধিকার আছে। একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: ‘নিশ্চয়ই তোমার ওপর তোমার শরীরের হক রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৭৫)

এই ‘হক’ বা অধিকার আদায়ের মানে কেবল দামী প্রসাধনী ব্যবহার নয়, বরং শরীর ও মনকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া এবং তাকে অপব্যবহার থেকে রক্ষা করা।

আরও পড়ুন

আত্মপরিচর্যার কঠিন দিক: আত্মসমীক্ষা

আত্মপরিচর্যার সবচেয়ে কঠিন এবং ‘অসুন্দর’ দিকটি হলো নিজের জীবনের হিসাব নেওয়া। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে এই প্রশ্ন করা—আমার জীবনে আসলে কী কাজ করছে আর কী করছে না? আমরা অনেক সময় নিরাপত্তাহীনতা বা অস্বীকারের চাদরে নিজেকে ঢেকে রাখি।

ক্লান্ত হয়েও আমরা হাসিমুখে সব সামলানোর অভিনয় করি কারণ আমরা ‘পারফেক্ট’ হতে চাই।

কিন্তু নিজেকে নিয়ে সৎ হওয়া এবং নিজের ব্যর্থতাগুলো স্বীকার করা হলো সুস্থতার প্রথম ধাপ। এর জন্য হয়তো আপনাকে অনেক অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি হতে হবে, যা মোটেও আরামদায়ক নয়।

বর্তমান সমাজ এক অদ্ভুত চাপ তৈরি করে রেখেছে, বিশেষ করে নারীদের নিশানা করে। ঘর পরিপাটি থাকতে হবে, আবার নিজেকেও সবসময় আকর্ষণীয় দেখাতে হবে।

‘সাধারণ’ হওয়ার সাহস রাখা

বর্তমান সমাজ এক অদ্ভুত চাপ তৈরি করে রেখেছে, বিশেষ করে নারীদের নিশানা করে। ঘর পরিপাটি থাকতে হবে, রান্না হতে হবে ইনস্টাগ্রামের ছবির মতো নিখুঁত, আবার নিজেকেও সবসময় আকর্ষণীয় দেখাতে হবে। আত্মপরিচর্যা মানে মাঝে মাঝে এই ‘নিখুঁত’ হওয়ার দৌড় থেকে নিজেকে সরিয়ে আনা।

সিংকের এক গাদা নোংরা বাসন পড়ে আছে, কিন্তু আপনার মন এখন একটু কবিতা পড়তে বা রঙ করতে চাইছে—এমন মুহূর্তে বাসন ধোয়া বাদ দিয়ে নিজের মানসিক প্রশান্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়াটাই হলো প্রকৃত আত্মপরিচর্যা।

বাসনগুলো পরেও ধোয়া যাবে, কিন্তু মানসিক ক্লান্তি নিয়ে কাজ করলে সেই কাজের মান বা আপনার মেজাজ—কোনোটাই ভালো থাকবে না।

আরও পড়ুন

‘না’ বলতে শেখার আমূল পরিবর্তন

আমরা প্রায়ই আফসোস করি, ‘দিনটা যদি আরও কয়েক ঘণ্টা বড় হতো!’ কিন্তু সত্যি বলতে, দিন বড় হলেও আমরা সেখানে আরও এমন কিছু কাজ ঢুকিয়ে দিতাম যা আমরা ‘না’ বলতে পারছি না বলে গ্রহণ করেছি।

নিজের ভালো থাকার জন্য অন্যদের প্রত্যাশায় ‘না’ বলতে পারাটা আত্মপরিচর্যার একটি বিপ্লবী রূপ। এটি আপনার দায়িত্বের চেয়ে আপনার সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দিতে শেখায়।

‘ব্যস্ততা’র অজুহাত থেকে মুক্তি

আমরা অনেক সময় ‘আমি খুব ব্যস্ত’ কথাটিকে বুক ফুলিয়ে বলি। এই ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে আমরা ব্যায়াম বাদ দেই, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা বাতিল করি, এমনকি ঠিকমতো নামাজ পড়তে বা সুষম খাবার খেতেও ভুলে যাই।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের সময়ের বরকত এবং ইবাদতের মাধ্যমে প্রশান্তি খোঁজার শিক্ষা দিয়েছেন। যখন আমরা নিজেদের যত্ন নেওয়া শুরু করি এবং রুটিন মেনে চলি, তখন আমাদের জীবনের অনেক সমস্যা এমনিতেই সমাধান হয়ে যায়।

জীবনটাকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন প্রতিটা দিনই আপনি নিজের ভেতর এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করেন।

নিজেকে জানা ও প্রভুকে চেনা

সুফি দর্শনে একটি গভীর কথা প্রচলিত আছে—’যে নিজেকে চিনেছে, সে তার রবকে চিনেছে।’

আমরা যদি সারাক্ষণ অন্যদের খুশি করতে গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলি, তবে আমরা স্রষ্টার সঙ্গে আমাদের সংযোগ কীভাবে দৃঢ় করব? নিজেকে জানা মানে হলো নিজের সীমাবদ্ধতাগুলো জানা।

যেমন, যদি আপনি জানেন যে রাত ১০টার মধ্যে না ঘুমালে পরের দিন আপনি ঠিকমতো কাজ করতে পারবেন না, তবে ১০টায় ঘুমানোটাই আপনার জন্য সেলফ-কেয়ার—তাতে লোকে হাসাহাসি করলেও কিছু যায় আসে না।

আত্মপরিচর্যা মানে নিজেকে সংশোধন করা নয়, বরং নিজেকে গ্রহণ করা। এটি এমন একটি ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়া যার হওয়ার অধিকার আপনার আছে। জীবনটাকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন প্রতিটা দিনই আপনি নিজের ভেতর এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করেন।

আরও পড়ুন