বড় বড় ব্যবসায়িক চুক্তি বা টেন্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রে অনৈতিক লেনদেনের খবর প্রায়ই সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়। ইসলামি শরিয়তে ঘুষকে কেবল অপরাধ বলা হয়নি, বরং একে মহাপাপ সাব্যস্ত করা হয়েছে।
দুর্ভাগ্যবশত, মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশেই আজ এই প্রথা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতি ও নৈতিকতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ঘুষ হলো অন্যের হক নষ্ট করার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি জঘন্য মাধ্যম। পবিত্র কোরআনে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
হাদিসে এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষণের কথা বলা হয়েছে।
শর্ত পূরণ হলে অনেক ফকিহর মতে দাতা গুনাহগার হবেন না, কারণ তিনি পরিস্থিতির শিকার। তবে যিনি এই অর্থ গ্রহণ করবেন, তিনি সর্বাবস্থায় হারামখোর ও অভিশপ্ত হিসেবে গণ্য হবেন।
পরকালীন পরিণাম
ঘুষের ভয়াবহতা বোঝাতে গিয়ে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়ের ওপর আল্লাহর লানত।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩১৩)
লানত শব্দের অর্থ হলো আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত হওয়া। শুধু দাতা বা গ্রহীতা নয়, বরং এই প্রক্রিয়ায় যারা মধ্যস্থতা করে (দালাল), যারা চুক্তিনামা লেখে এবং যারা সাক্ষী হিসেবে থাকে—তারাও এই অভিশাপের অন্তর্ভুক্ত। কারণ তারা একটি পাপাচার ও অনৈতিক কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে।
ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ মূলত ‘বাতিল’ বা হারাম সম্পদ। এটি মানুষের অন্তরে কালিমা লেপন করে এবং দোয়া কবুলের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
ঘুষ কখন বৈধ
ইসলামি শরিয়ত অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘুষ হারাম হলেও আধুনিক যুগের ফকিহ ও মুজতাহিদগণ বিশেষ কিছু পরিস্থিতির আলোকে তিনটি শর্তসাপেক্ষে একে ‘অনিবার্য প্রয়োজন’ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ দিয়েছেন।
তবে এই ছাড় কেবল ঘুষদাতার জন্য, গ্রহীতার জন্য কখনোই নয়। শর্তগুলো হলো:
১. নিজের ন্যায্য অধিকার রক্ষা: দাতা ঘুষের বিনিময়ে অন্য কারো হক নষ্ট করবেন না। বরং নিজের যে পাওনা বা অধিকারটি পাওয়ার কথা, সেটি নিশ্চিত করতেই কেবল তিনি বাধ্য হয়ে অর্থ দেবেন। কোনো অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়ার জন্য নয়।
২. বিকল্প পথের অভাব: যদি নিজের বৈধ অধিকারটি পাওয়ার জন্য আইনি বা প্রশাসনিক আর কোনো পথ খোলা না থাকে এবং ঘুষ দেওয়া ছাড়া সেই অধিকার আদায়ের কোনো উপায় না থাকে।
৩. জরুরি প্রয়োজন: বিষয়টি এমন জরুরি হতে হবে যে সেই অধিকারটি না পেলে দাতা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবেন অথবা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার মতো পরিস্থিতি থাকবে না।
যে যেকোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা যা মানুষকে সত্য থেকে বিচ্যুত করে, তা-ই ঘুষ।
এই তিনটি শর্ত পূরণ হলে অনেক ফকিহর মতে দাতা গুনাহগার হবেন না, কারণ তিনি পরিস্থিতির শিকার। তবে যিনি এই অর্থ গ্রহণ করবেন, তিনি সর্বাবস্থায় হারামখোর ও অভিশপ্ত হিসেবে গণ্য হবেন।
অপরের হক নষ্ট করার পরিণাম
যদি উপরোক্ত শর্তগুলোর কোনো একটিও লঙ্ঘিত হয়, তবে সেই লেনদেন সর্বসম্মতভাবে হারাম। যেমন—ঘুষ দিয়ে অন্য কোনো যোগ্য ব্যক্তির সুযোগ কেড়ে নেওয়া, টেন্ডারে কারচুপি করা কিংবা নিজের অযোগ্যতা আড়াল করে বড় কোনো চুক্তি হাতিয়ে নেওয়া।
এটি কেবল ঘুষ নয়, বরং এটি অন্যের ওপর জুলুম ও আমানত খিয়ানত। এমন ক্ষেত্রে দাতা, গ্রহীতা ও মধ্যস্থতাকারী—সবাই সমানভাবে অপরাধী।
যে সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ঘুষ প্রধান হয়ে ওঠে, সেখানে যোগ্যতার চেয়ে অর্থ বড় হয়ে দেখা দেয়, ফলে মেধার অবমূল্যায়ন ঘটে এবং অযোগ্যদের দাপট বৃদ্ধি পায়।
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তাঁর উল্লেখ করেছেন যে, প্রকাশ্য ও অকাট্য হারাম বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকা ইমানের অন্যতম মূল ভিত্তি। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের হক নষ্ট করতে ঘুষের আশ্রয় নেয়, তারা মূলত ইসলামের নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। (মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩১/২৮৭, দারুল ওফা, কায়রো)
ঘুষকে অনেক সময় ‘কমিশন’, ‘স্পিড মানি’ বা ‘উপহার’ নামে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু নামের পরিবর্তনে হুকুম বা বিধানের পরিবর্তন হয় না।
আধুনিক ব্যবসায় নৈতিক সংকট
বর্তমান করপোরেট দুনিয়ায় ঘুষকে অনেক সময় ‘কমিশন’, ‘স্পিড মানি’ বা ‘উপহার’ নামে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু নামের পরিবর্তনে হুকুম বা বিধানের পরিবর্তন হয় না।
ইসলামি শরিয়ত অনুসারে, নাম যা-ই হোক না কেন, যদি এর উদ্দেশ্য হয় অনৈতিক সুবিধা লাভ বা ক্ষমতার অপব্যবহার, তবে তা ঘুষ হিসেবেই গণ্য হবে।
ইমাম নববি (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে যেকোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা যা মানুষকে সত্য থেকে বিচ্যুত করে, তা-ই ঘুষ। (শারহু সহিহ মুসলিম, ১২/২১৯, দারু ইহয়াইত তুরাসিল আরাবি, ১৯৭২)
ব্যবসায়িক লেনদেনে স্বচ্ছতা বজায় রাখা কেবল একটি নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি ইমানের দাবি। ঘুষের মতো ব্যাধি সমাজ থেকে দূর করতে হলে সামগ্রিক সচেতনতা প্রয়োজন।
একদিকে যেমন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে প্রতিটি মুসলিমকে পরকালীন জবাবদিহিতার ভয় অন্তরে লালন করতে হবে।