এটা জানা বিষয় যে মানুষ ভাষার মাধ্যমে কথা বলে। বস্তুত ভাষার মাধ্যমেই মানুষ পৃথিবীকে দেখতে শেখে। কোনো বাস্তবতা মানুষের চেতনায় প্রবেশ করার আগে তা কোনো না কোনো ভাষাগত রূপ ধারণ করে।
ফলে ভাষা যেমন চিন্তার বাহন, তেমনি সে চিন্তার পরিবেশ। মানুষ যেমন শব্দ ব্যবহার করে, তেমনি শব্দও মানুষকে গঠন করে।
এ কারণেই ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় ভাষা একটি মৌলিক এপিস্টেমিক বিষয়। কারণ, জ্ঞান কখনো ভাষার বাইরে জন্ম নেয় না, আর ভাষাও কখনো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়।
একটি সভ্যতার ভাষা তার বিশ্বদৃষ্টির আয়না। যে সভ্যতা প্রকৃতিকে ‘সম্পদ’ বলে, তার সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক এক রকম; যে সভ্যতা প্রকৃতিকে ‘আমানত’ বলে, তার সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভিন্ন।
যখন একটি সমাজ তার নিজস্ব মৌলিক ধারণাগুলো হারিয়ে ফেলে এবং অন্য একটি সভ্যতার ধারণাগত ভাষা অচেতনভাবে কবুল করে, তখন ধীরে ধীরে তার চিন্তার কাঠামোও পরিবর্তিত হতে থাকে।
পয়লা ভাষা মালিকানার অনুভূতি পয়দা করে, দুসরা ভাষা দায়িত্বের অনুভূতি জাগায়। একই বনকে কেউ বলে ‘কাঠের ভান্ডার’, কেউ বলে ‘বাস্তুতন্ত্র’, আর কেউ বলে ‘আল্লাহর নিদর্শন’।
শব্দের এই ফারাক কি শুধু প্রকাশভঙ্গির পার্থক্য? না। এটি জ্ঞানের পার্থক্য। কারণ, মানুষ যে নামে কোনো বাস্তবতাকে ডাকে, ধীরে ধীরে সে সেই নামের মধ্য দিয়েই বাস্তবতাকে বুঝতে শুরু করে।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা মনে করে, ভাষার প্রথম কাজ অর্থ প্রতিষ্ঠা। একটি শব্দ শুধু কোনো বস্তুকে নির্দেশ করে না; সেই বস্তুর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও নির্ধারণ করে। ‘খিলাফত’, ‘আমানত’, ‘মিজান’, ‘ফিতরাত’, ‘ইহসান’, ‘বরকত’ ইত্যাদি শব্দ অভিধানগত অর্থের চেয়ে অনেক বড় একটি অস্তিত্বদৃষ্টি বহন করে।
এগুলো এমন ধারণা, যার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে, সমাজকে এবং কায়েনাতকে একটি সমন্বিত নৈতিক বিশ্ব হিসেবে দেখতে শেখে।
ফলে শব্দ এখানে পরিভাষার অধিক, সে জ্ঞানতাত্ত্বিক অবকাঠামো। এ কারণেই কোনো ভাষার সংকট যতটা শব্দের সংকট, তার চেয়ে বেশি বিশ্বদৃষ্টির সংকট।
যখন একটি সমাজ তার নিজস্ব মৌলিক ধারণাগুলো হারিয়ে ফেলে এবং অন্য একটি সভ্যতার ধারণাগত ভাষা অচেতনভাবে কবুল করে, তখন ধীরে ধীরে তার চিন্তার কাঠামোও পরিবর্তিত হতে থাকে।
মানুষ তখন হয়তো একই ধর্মীয় শব্দ উচ্চারণ করে, কিন্তু সেই শব্দের অন্তর্নিহিত বিশ্বদৃষ্টি আর আগের মতো থাকে না। ভাষার এই নীরব রূপান্তর সভ্যতার গভীরতম পরিবর্তনগুলোর একটি।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা ভাষাকে বাস্তবতার বিকল্প মনে করে না। শব্দ সত্য সৃষ্টি করে না; সত্যকে সে ধারণের চেষ্টা করে। কিন্তু শব্দ যদি বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ হারায়, তবে ভাষা অলংকারে পরিণত হয়। আবার বাস্তবতা যদি ভাষাহীন হয়ে যায়, তবে তা মানুষের চেতনায় দাখিল হতে পারে না।
অতএব, ভাষা ও বাস্তবতার সম্পর্ক প্রতিনিধিত্বের, প্রতিস্থাপনের নয়। ভাষার দায়িত্ব সত্যকে উদ্ভাসিত করা।
ভাষা মানুষকে পৃথিবীর নাম শেখায়, আবার সেই নামের মধ্য দিয়েই পৃথিবীর অর্থও শেখায়। এ কারণে একটি সভ্যতার পুনর্গঠন শুরু হয় তার ভাষার পুনর্গঠন দিয়ে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ভাষা একটি নৈতিক দায়িত্বও। মিথ্যা ভাষাকে দূষিত করে, অতিশয়োক্তি বিচারকে বিভ্রান্ত করে, প্রচারণা শব্দকে ক্ষমতার যন্ত্রে পরিণত করে এবং অস্পষ্টতা সত্যকে আড়াল করে।
ফলে ভাষার শুদ্ধতা শুধু সাহিত্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়; জ্ঞানতাত্ত্বিক সততার বিষয়ও। যে ভাষা সত্যের প্রতি বিশ্বস্ত নয়, সেই ভাষা ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তাকেও অবিশ্বস্ত করে তোলে।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার ভাষাতত্ত্বের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, সে সংলাপকে দেখে জ্ঞানের শর্ত হিসেবে। কারণ, ভাষা একমুখী ঘোষণার জন্য নয়; পারস্পরিক উপলব্ধির জন্য।
মানুষ যখন অন্যের ভাষা বোঝার কোশেশ করে, তখন সে যেমন অন্যের শব্দ বোঝে, তেমনি সে অন্যের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির জগতে প্রবেশ করে। এই সংলাপ সত্যের দিকে মানুষের সম্মিলিত যাত্রাকে সমৃদ্ধ করে।
অতএব, ভাষা ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় প্রকাশের মাধ্যম যেমন, তেমনি সে জ্ঞান, নৈতিকতা এবং সভ্যতার অন্যতম বনিয়াদ।
ভাষা মানুষকে পৃথিবীর নাম শেখায়, আবার সেই নামের মধ্য দিয়েই পৃথিবীর অর্থও শেখায়। এ কারণে একটি সভ্যতার পুনর্গঠন শুরু হয় তার ভাষার পুনর্গঠন দিয়ে।
যখন শব্দ আবার ফিতরাতের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন চিন্তা আবার মিজানের দিকে ফিরে আসে; আর চিন্তা যখন মিজানে ফিরে আসে, তখন জ্ঞান আবার হিকমাহর পথে অগ্রসর হতে শুরু করে।
অতএব ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার ভাষাতত্ত্বের লক্ষ্য কোনো নতুন পরিভাষা নির্মাণে সীমিত নয়। ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্র মানুষের ভাষাকে তার অস্তিত্বগত সত্য, নৈতিক দায়িত্ব এবং কায়েনাতের সঙ্গে আবার সংযুক্ত করতে চায়।
ভাষা মানুষকে বলে, জগৎ কী? এরপর সওয়াল করে, ‘এই জগতের মধ্যে তোমার অবস্থান কী, তোমার দায়িত্ব কী এবং তুমি কীভাবে এর সঙ্গে বসবাস করবে?’
যে ভাষা মানুষকে তার খিলাফত, আমানত ও মিজানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, সে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না। সে হয়ে ওঠে আত্মপরিচয় ও সভ্যতা নির্মাণের আশ্রয়।
তখন ভাষা মানুষকে বলে, জগৎ কী? এরপর সওয়াল করে, ‘এই জগতের মধ্যে তোমার অবস্থান কী, তোমার দায়িত্ব কী এবং তুমি কীভাবে এর সঙ্গে বসবাস করবে?’
এই জায়গা থেকেই ফিতরাতি জ্ঞানতত্ত্ব ভাষাতত্ত্বকে অতিক্রম করে একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিক বিশ্বদৃষ্টিতে পরিণত হয়।
মুসা আল হাফিজ : লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান