অজু ছাড়া মোবাইল ফোনে কোরআন পড়া যাবে কি

ছবি: পেক্সেলস

ডিজিটাল যুগে মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট বা কম্পিউটারের স্ক্রিনে কোরআন পাঠের প্রচলন বৃদ্ধি পেয়েছে। কর্মব্যস্ত জীবনে বা যাতায়াতের পথে স্মার্টফোনের কোরআন অ্যাপ থেকে পাঠ করা সহজ।

তবে ফিকহ বা ইসলামি আইনশাস্ত্রের একটি বহুল আলোচিত প্রশ্ন হলো, ছাপানো কোরআন শরিফ স্পর্শ করার জন্য যেমন অজুর বাধ্যবাধকতা রয়েছে, মোবাইল ফোনে কোরআন পড়ার ক্ষেত্রেও কি একই বিধান প্রযোজ্য? 

বিশ্লেষণ করা হলো।

ছাপানো কোরআন স্পর্শের বিধান

কোরআন শরিফ (মুসহাফ) অজু ছাড়া স্পর্শ করা ইসলামে সর্বসম্মতভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ এর মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন, ‘যারা পূর্ণ পবিত্র, তারা ছাড়া অন্য কেউ তা (কোরআন) স্পর্শ করবে না।’ (সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৭৯)

সাহাবি আমর ইবনে হাজমকে লেখা এক চিঠিতে মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ যেন কোরআন স্পর্শ না করে।’ (মুওয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস: ৪৬৮)

এই হাদিস ও আয়াতের ভিত্তিতে চার মাজহাবের ফকিহগণ একমত যে অজু ছাড়া ছাপানো কোরআন শরিফের পাতা বা লেখা হাত দিয়ে ধরা নাজায়েজ।

মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে স্ক্রিনের গ্লাস বা কাচ একটি আলাদা আবরণ হিসেবে কাজ করে এবং আয়াতের লেখাগুলো সেই গ্লাসের নিচে প্রতিফলিত হয়। তাই সরাসরি হরফ স্পর্শ করার বিষয়টি এখানে ঘটে না।
আরও পড়ুন

মুঠোফোনের কোরআন কি ‘মুসহাফ’

মোবাইল ফোন বা ডিজিটাল ডিভাইসের স্ক্রিনে দৃশ্যমান কোরআনের আয়াতের ফিকহি মর্যাদা ছাপানো কোরআনের (মুসহাফ) মতো নয়। ছাপানো কোরআনে কালি ও কাগজের বাস্তব অস্তিত্ব থাকে এবং তা স্থায়ী। 

অন্যদিকে ডিজিটাল স্ক্রিনে দৃশ্যমান আয়াতগুলো মূলত ইলেকট্রনিক ডেটা বা আলোর রশ্মি (পিক্সেল), যার কোনো বাস্তব ও স্থায়ী অস্তিত্ব নেই; স্ক্রিন বা অ্যাপ বন্ধ করলেই তা অদৃশ্য হয়ে যায়।

এ কারণে ইসলামি আইনবিজ্ঞানের পরিভাষায় মোবাইল ফোনকে ‘মুসহাফ’ হিসেবে গণ্য করা হয় না।

পর্দার মাধ্যমে স্পর্শ করার বিধান

হানাফি ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো, কোরআন শরিফের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় এমন কোনো আলাদা আবরণ বা পর্দার (যেমন—আলাদা কাপড় বা রুমাল) সাহায্যে মুসহাফ স্পর্শ করা জায়েজ।

ইমাম ইবনে আবিদিন লিখেছেন, ‘মুসহাফের সঙ্গে সেলাই করা বা যুক্ত নয়—এমন আলাদা কোনো আবরণ বা থলের সাহায্যে অজু ছাড়া কোরআন ধরা বা বহন করা বৈধ।’ (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ১/১৭৩, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)

মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে স্ক্রিনের গ্লাস বা কাচ একটি আলাদা আবরণ হিসেবে কাজ করে এবং আয়াতের লেখাগুলো সেই গ্লাসের নিচে প্রতিফলিত হয়। তাই সরাসরি হরফ স্পর্শ করার বিষয়টি এখানে ঘটে না।

আরও পড়ুন
তবে কোরআনের আদব ও শিষ্টাচারের দাবি হলো, স্ক্রিনে যে অংশে কোরআনের আয়াত দৃশ্যমান রয়েছে, অজু ছাড়া সরাসরি সেই হরফগুলোর ওপর আঙুল না লাগানো উত্তম।

সমকালীন স্কলারদের দৃষ্টিভঙ্গি

মোবাইল ফোনে কোরআন পড়ার বিষয়ে সমকালীন ফকিহ ও ফতোয়া বোর্ডগুলো ফিকহের মূলনীতি মেনেই যুগোপযোগী সমাধান দিয়েছেন। দারুল উলুম দেওবন্দসহ সমকালীন ফতোয়া বোর্ডগুলোর সর্বসম্মত মত হলো, যেহেতু মোবাইল ফোন মুসহাফ নয়, তাই অজু ছাড়া মোবাইল ফোন হাতে ধরা এবং স্ক্রিনে দেখে দেখে কোরআন পাঠ করা সম্পূর্ণ জায়েজ।

তবে কোরআনের আদব ও শিষ্টাচারের দাবি হলো, স্ক্রিনে যে অংশে কোরআনের আয়াত দৃশ্যমান রয়েছে, অজু ছাড়া সরাসরি সেই হরফগুলোর ওপর আঙুল না লাগানো উত্তম। স্ক্রিনের খালি জায়গায় বা ফোনের বডিতে ধরে স্ক্রল করা উচিত।

মুখস্থ পাঠের বিধান

অজু ছাড়া কোরআন ধরা নিষেধ হলেও, অজু ছাড়া মুখস্থ পাঠ করা কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে সর্বসম্মতভাবে জায়েজ (গোসল ফরজ হওয়া বা অপবিত্রতার বিশেষ অবস্থা ছাড়া)। তাই মোবাইল ফোন থেকে দেখে পড়াকে মূলত মুখস্থ পড়ার সমতুল্যই ধরা হয়।

পরিশেষে, অজু ছাড়া মোবাইল ফোনে কোরআন পড়া শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বৈধ হলেও, অজুসহকারে পাঠ করা কোরআনের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের শামিল। আল্লাহর কালাম পড়ার সময় শারীরিক ও মানসিক পবিত্রতা বজায় রাখলে পাঠের আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

আরও পড়ুন