ব্যর্থতার ভাবনাকে মুমিন যেভাবে সাফল্যে পরিণত করে

ছবি: পেক্সেলস

মুঠোফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছেন। পরীক্ষার রেজাল্ট এসেছে। যে নম্বরটা আশা করেছিলেন, সেটা নেই। বুকের ভেতর একটা হাহাকার শুরু হয়েছে। হাত কাঁপছে। মনে হচ্ছে, চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা ভেঙে পড়ল।

মা–বাবাকে কী বলবেন? বন্ধুরা কী ভাববে? এত পরিশ্রম, এত স্বপ্ন, সবকিছু বৃথা গেল? জীবনে অনেক বড় হবার যে স্বপ্নটা দেখেছিলেন, সেটা হয়তো আর পূরণ হবে না। এত কষ্ট এত দোয়ার পরও দিনশেষে ব্যর্থদের কাতারেই আপনার ঠাঁই হলো।

রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় যদি আপনার মনেও এমন চিন্তা ঘুরপাক খায়, তবে এই লেখাটা আপনার জন্য।

বিজ্ঞান কী বলছে

মনোবিজ্ঞানে একটা ধারণা আছে, যার নাম সংকট-উত্তর বিকাশ (পোস্ট-ট্রমাটিক গ্রোথ)।

গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনের কঠিন সময় বা ব্যর্থতা মানুষকে শুধু ভেঙে দেয় না, বরং অনেক ক্ষেত্রে সেই মানুষটিকেই নতুন করে গড়ে তোলে। যে মানুষ একবার হোঁচট খেয়ে আবার উঠে দাঁড়ায়, তার মানসিক দৃঢ়তা আগের চেয়ে বেড়ে যায়। (টেডেশি, আর. জি. এবং ক্যালহাউন, এল. জি., ১৯৯৬, জার্নাল অব ট্রমাটিক স্ট্রেস, ৯/৩, ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর ট্রমাটিক স্ট্রেস স্টাডিজ, আমেরিকা)

যা হয়ে গেছে সেটা নিয়ে মন খারাপ না করে নতুন উদ্যমে কাজে লেগে পড়া উচিত। মন খারাপ করে বসে থাকা কোনো সমাধান নয়।

বিজ্ঞান বলতে চায়, পরীক্ষার ফল খারাপ হলেই জীবন শেষ হয়ে যায় না। বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলে ভালো করার সম্ভাবনা বাড়ে। ঠিক এই কথাটাই কোরআন বলেছে, একটু অন্যভাবে, সহানুভূতির সুরে।

কোরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে রয়েছে স্বস্তি।’ (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৫)

খেয়াল করুন, দুঃসময়ে আল্লাহ–তায়ালা শুধু বান্দাকে সান্ত্বনা দিয়েই ক্ষান্ত হননি। বরং এর পরপরই বলেছেন, ‘সুতরাং যখন অবসর পাও, পরিশ্রমে লেগে যাও। আর তোমার রবের দিকেই মনোযোগী হও।’ (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৭-৮)

অর্থাৎ যা হয়ে গেছে সেটা নিয়ে মন খারাপ না করে নতুন উদ্যমে কাজে লেগে পড়া উচিত। মন খারাপ করে বসে থাকা কোনো সমাধান নয়।

আরও পড়ুন

কোরআনের শিক্ষা

১. কোনো বিপদ সাধ্যাতীত না: আল্লাহ আপনার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা দেন না। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬)

মানে আপনি এখন যে কষ্টটা অনুভব করছেন, সেটা বহন করার ক্ষমতা আল্লাহ আপনাকে দিয়েই রেখেছেন। তিনি জানেন কতটুকু কষ্ট সহ্য করতে পারবেন। তাই নিজের ওপর সর্বদা বিশ্বাস রাখতে হবে যে আপনি পারবেন।

২. বিপদ নবীদেরও ছিল: সব বিপদ আল্লাহর গজব নয়, কিছু বিপদ পরীক্ষাও বটে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘বিপদ যত মারাত্মক হবে, প্রতিদানও তত মহান হবে। আল্লাহ–তাআলা যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন, তখন তাদের পরীক্ষা করেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৯৬)

সুতরাং কেউ বিপদে পড়েছে মানে এই নয় যে আল্লাহ তাকে অপছন্দ করেন। সব নবী-রাসুল ও সাহাবির জীবনে বিপদ ছিল। হতে পারে, আল্লাহ আপনার জন্য বড় কোনো পরিকল্পনা করেছেন, আর এই মুহূর্তটা সেই পথের একটা ধাপ মাত্র।

নবী ইউসুফকে নিজের ভাইয়েরা তাঁকে কূপে ফেলে দিয়েছিল। তারপর দাসত্ব, কারাগার। অথচ সেই ইউসুফ (আ.)-ই একদিন মিসরের রাষ্ট্রীয় ভান্ডারের দায়িত্বে বসেছিলেন।

তাদের নিজেদের মনও তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল, আর তারা বুঝেছিল আল্লাহ ছাড়া বাঁচার কোনো জায়গা নেই। তারপর আল্লাহ তাদের ক্ষমা করলেন।
সুরা তওবা, আয়াত: ১১৮

৩. এক সাহাবির পরীক্ষা: তাবুক যুদ্ধে শুধু অলসতাবশত কা’ব বিন মালিক (রা.) অংশগ্রহণ করেননি। যুদ্ধ থেকে ফিরে নবীজি (সা.) জিজ্ঞেস করলে অন্যরা মিথ্যা অজুহাত দিল। কা’ব (রা.) সত্যি কথাটাই বললেন।

নবীজি নির্দেশ দিলেন, মদিনার কেউ যেন তাঁর সঙ্গে কথা না বলে। পঞ্চাশ দিন ধরে চলল এই বয়কট। কা’ব (রা.) নিজেই পরে বলেছেন, এত বিশাল পৃথিবী তাঁর কাছে সেই পৃথিবীটাই সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল।

পঞ্চাশ দিনের মাথায় তাদের তওবা কবুল হয়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তাদের নিজেদের মনও তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল, আর তারা বুঝেছিল আল্লাহ ছাড়া বাঁচার কোনো জায়গা নেই। তারপর আল্লাহ তাদের ক্ষমা করলেন।’ (সুরা তওবা, আয়াত: ১১৮)

ভাবুন তো। তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার পঞ্চাশটা দিনের পরেই এল জীবনের সবচেয়ে বড় খুশির দিন। আল্লাহর নিজে তাদের ক্ষমা দিলেন। এর চেয়ে খুশির বিষয় আর কী হতে পারে?

নবীজির জীবন থেকে শিক্ষা

১. মক্কা: তেরো বছর ধরে মক্কায় মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা ব্যাপক নির্যাতিত হয়েছেন। উপহাস, বয়কট, অনাহার, শারীরিক নির্যাতন। মানবিক দৃষ্টিতে মনে হতে পারত, এই দাওয়াতের এখানেই শেষ। কিন্তু নবীজি হাল ছাড়েননি। যার ফলাফল আজ আমরা স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি।

মক্কার এই ঘটনা আমাদের শেখায়, খারাপ সময় যত দীর্ঘ হোক না কেন, সেটা কখনো চিরস্থায়ী হয় না। আজকের অন্ধকার সময়টার ঠিক পরেই লুকিয়ে থাকতে পারে জীবনের সবচেয়ে বড় স্বস্তির দিন।

আরও পড়ুন

২. তায়েফ: মক্কায় যখন সবাই প্রত্যাখ্যান করল, মহানবী (সা.) আশা নিয়ে গেলেন তায়েফে। কিন্তু তায়েফের মানুষ তাঁকে উপহাস করল, ছেলেদের লেলিয়ে দিল, পাথর ছুড়ল। নবীজির পা রক্তাক্ত হয়ে গেল।

আয়েশা (রা.) একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, ওহুদের দিনের চেয়েও কঠিন কোনো দিন কি এসেছে তাঁর জীবনে? নবীজি বলেছিলেন, তায়েফের সেই দিনটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৩১)

সেই দিনও তিনি ভেঙে পড়েননি। একটি গাছের আড়ালে গিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, নিজের অসহায়ত্বের কথা বললেন, কিন্তু আশা ছাড়লেন না। ফেরেশতা এসে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, চাইলে তায়েফের দুই পাহাড় মিলিয়ে পুরো জনপদ ধ্বংস করে দেওয়া যায়। তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন।

দেখুন, জীবনের সবচেয়ে খারাপ দিনেও তিনি আশা ছাড়েননি। ভবিষ্যতের ভালো কিছুর কথা ভেবেছেন।

কখনো যদি মনে হয় আপনি ব্যর্থ, প্রচণ্ড হতাশায় আশার আলো খুঁজে না পান, তবে রাসুলের জীবনের দিকে তাকান, সাহাবিদের গল্প শুনুন—ধ্বংসস্তূপ থেকে কীভাবে ফিরে আসা যায়।

৩. হিজরত: মক্কা থেকে জীবন বাঁচিয়ে বের হওয়ার পথে মহানবী (সা.) ও আবু বকর (রা.) সাওর পাহাড়ের একটা গুহায় লুকিয়েছিলেন। শত্রুরা তখন গুহার মুখেই এসে দাঁড়িয়েছিল। আবু বকর (রা.) ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন, একটু নিচু হলেই শত্রুরা তাঁদের দেখে ফেলবে।

নবীজি বললেন, ‘দুঃখ কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা তওবা, আয়াত: ৪০)

জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তেও তিনি আশার কথা বলেছেন, হতাশার নয়।

৪. ওহুদের পর: ওহুদ যুদ্ধে বড় ক্ষতি হয়েছিল। নবীজি নিজে আহত হয়েছিলেন, দাঁত ভেঙে গিয়েছিল, প্রিয় চাচা হামজা (রা.) শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক তার পরদিনই তিনি আহত সাহাবিদের নিয়ে আবার বের হলেন, শুধু নিজেদের মনোবল আর দৃঢ়তা দেখানোর জন্য।

এই ঘটনার কথা কোরআনে এসেছে এভাবে, ‘যারা আঘাত পাওয়ার পরও আল্লাহ ও রাসুলের ডাকে সাড়া দিয়েছিল, তাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল ও তাকওয়াবান, তাদের জন্য আছে মহাপুরস্কার।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৭২)

পরাজয়ের পরদিনই আবার উঠে দাঁড়ানো, এটাই ছিল নবীজির শিক্ষা।

কখনো যদি মনে হয় আপনি ব্যর্থ, প্রচণ্ড হতাশায় আশার আলো খুঁজে না পান, তবে রাসুলের জীবনের দিকে তাকান, সাহাবিদের গল্প শুনুন—ধ্বংসস্তূপ থেকে কীভাবে ফিরে আসা যায়, তার একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা তাঁদের জীবন থেকে পাবেন।

আমাদের কাজ শুধু চেষ্টা করে যাওয়া। সফলতা একদিন আসবেই।

  • মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর : খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন