সমাজে একটা বহুল প্রচলিত মানসিকতা হলো—‘লোকে কী বলবে!’ সামাজিক লজ্জার ভয়ে প্রতিবছর কোরবানির ঈদ এলে অনেক পরিবারকে এক চরম ও অনাকাঙ্ক্ষিত টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
নিজের সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও, কিংবা কাঁধে বড় অঙ্কের ঋণ থাকা সত্ত্বেও কেবল লৌকিকতা বা সামাজিক মর্যাদা ধরে রাখতে অনেকে ধারদেনা করে, এমনকি সুদের ওপর টাকা নিয়ে কোরবানি দিয়ে থাকেন।
কিন্তু ইসলামের মূল চেতনা লৌকিকতা নয়, বরং তাকওয়া ও আন্তরিকতা। ঋণগ্রস্ত বা অভাবী মানুষের কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামের আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট এবং যৌক্তিক।
যদি কোনো ব্যক্তির ওপর এমন ঋণ থাকে, যা পরিশোধ করলে তার কাছে আর নেসাব পরিমাণ মাল অবশিষ্ট থাকে না, তবে ইসলামের দৃষ্টিতে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়।
কোরবানি কার ওপর ওয়াজিব
ইসলামে কোরবানি প্রত্যেকের ওপর ফরজ বা ওয়াজিব নয়, বরং এটি কেবল নির্দিষ্ট আর্থিক সামর্থ্যবান বা ‘সাহেবে নেসাব’ ব্যক্তির ওপরই ওয়াজিব।
জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ—এই তিন দিন যার কাছে দৈনন্দিন মৌলিক প্রয়োজন ও ঋণ পরিশোধের পর অতিরিক্ত হিসেবে সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে বাহান্ন তোলা রুপা অথবা সমমূল্যের নগদ অর্থ বা ব্যবসায়ী পণ্য থাকে, কেবল তার ওপরই কোরবানি ওয়াজিব হয়। (নিজামুদ্দিন ও অন্যান্য, ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি, ৫/২৯২, মাকতাবায়ে রশিদিয়া, কোয়েটা, ১৯৮০)
ঋণ ও ইবাদত: কোনটা অগ্রাধিকার
যদি কোনো ব্যক্তির ওপর এমন ঋণ থাকে, যা পরিশোধ করলে তার কাছে আর নেসাব পরিমাণ মাল অবশিষ্ট থাকে না, তবে ইসলামের দৃষ্টিতে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। (ইবনুল আবিদিন, ফাতাওয়ায়ে শামি, ৬/৩১২, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)
ঋণ করে কোরবানি করা সুন্নতও নয়।
ইসলামে নফল বা ওয়াজিব ইবাদতের চেয়ে মানুষের পাওনা বা ঋণ পরিশোধের গুরুত্ব অনেক বেশি। বান্দার হক বা ঋণ অপরিশোধিত রেখে কোরবানি করার মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই।
আল্লাহ কারও ওপর এমন কোনো কষ্টদায়ক দায়িত্ব অর্পণ করেন না, যা তার সাধ্যের অতীত।
এমনকি আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হওয়া ব্যক্তিরও সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করা হলেও ঋণ ক্ষমা করা হয় না। মহানবী (সা.) বলেছেন, “ঋণ ছাড়া শহিদের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৮৬)
‘সামাজিক লজ্জা’ ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ
অনেকে মনে করেন, ঋণ থাকলেও কোরবানি না দিলে বুঝি সমাজে মুখ দেখানো যাবে না, কিংবা সন্তানরা গোশত খাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে। এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ থেকে বাঁচতে অনেকে ঋণগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও নতুন করে ধারদেনা করে কোরবানি দেন।
অথচ ইসলাম মানুষকে সাধ্যের অতিরিক্ত কষ্ট নিতে নিষেধ করেছে; আল্লাহ-তাআলা পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, “আল্লাহ কারও ওপর এমন কোনো কষ্টদায়ক দায়িত্ব অর্পণ করেন না, যা তার সাধ্যের অতীত।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬)
সুতরাং, সামর্থ্য না থাকলে কোরবানি না দেওয়া কোনো পাপ বা লজ্জার বিষয় নয়, বরং ইসলামের এই সহজতাকে মেনে নেওয়াই প্রকৃত ইবাদত।
ঋণের ধরন: কখন কোরবানি দেওয়া যাবে
তবে ঋণের প্রকৃতি ভেদে ইসলামের বিধানে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি দীর্ঘমেয়াদি ঋণে (যেমন: গৃহঋণ বা দীর্ঘমেয়াদি বিজনেস লোন) থাকেন, যার কিস্তি প্রতি মাসে নির্দিষ্ট এবং সেই কিস্তি পরিশোধ করার পরও তার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ উদ্বৃত্ত থাকে, তবে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। (ইবনে নুজাইম, আল-বাহরুর রায়েক, ৮/১৯৭, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়াহ, বৈরুত, ১৯৯৭)
কিন্তু যিনি তাৎক্ষণিক বা জরুরি ঋণে জর্জরিত এবং পাওনাদার টাকা চাচ্ছে, তার জন্য কোরবানির টাকা জমিয়ে না রেখে আগে ঋণ শোধ করা ফরজ। রাসুল (সা.) ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করাকে জুলুম বলে আখ্যায়িত করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২২৮৭)
নি তাৎক্ষণিক বা জরুরি ঋণে জর্জরিত এবং পাওনাদার টাকা চাচ্ছে, তার জন্য কোরবানির টাকা জমিয়ে না রেখে আগে ঋণ শোধ করা ফরজ।
লোকদেখানো সংস্কৃতির অবসান হোক
তাই সামাজিক চাপ বা লৌকিকতার ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের ধর্মীয় অনুশাসনকে বুঝতে হবে। কোরবানি কোনো সামাজিক উৎসবের প্রতিযোগিতা নয়, এটি মহান আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণের নাম।
যার সামর্থ্য নেই, তিনি কোরবানি না দিয়েও ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন। আর সমাজকেও এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে, যেন কোনো কোরবানি না দেওয়া ঋণগ্রস্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারকে অসম্মান বা হীনম্মন্যতার শিকার হতে না হয়।