রজব মাসে রোজার বিধান

ওমর (রা.) তাদের হাত ধরে টেনে খাবারের দস্তরখানে বসিয়ে দিতেন যারা কেবল রজব মাসকে রোজার জন্য নির্দিষ্ট করে নিতছবি: ফ্রিপিক

আরবি হিজরি বর্ষপঞ্জির সপ্তম মাস রজব। পবিত্র কোরআনে যে চারটি মাসকে ‘আশহুরুল হুরুম’ বা বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ মাস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, রজব তার মধ্যে অন্যতম।

এই মাসে রোজা রাখা নিয়ে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে অনেক উৎসাহ দেখা যায়, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে এই মাসের রোজার হুকুম কী এবং এর সঙ্গে কোন কোন বিষয়গুলো জড়িত, তা স্পষ্টভাবে জানা অত্যন্ত জরুরি।

রজব মাসে রোজার সাধারণ বিধান

রজব মাসে রোজা রাখা যাবে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর হলো: রজব মাসে রোজা রাখা জায়েজ, তবে এই মাসের জন্য আলাদা বা বিশেষ কোনো ফজিলতের কথা বিশুদ্ধ হাদিসে আসেনি।

  • সাধারণ নফল রোজা: একজন মুসলিম বছরের যেকোনো সময় (নিষিদ্ধ দিনগুলো ছাড়া) নফল রোজা রাখতে পারেন। সেই হিসেবে রজব মাসেও রোজা রাখা বৈধ।

  • বিশেষ ফজিলতের বিশ্বাস: যদি কেউ মনে করেন যে রজব মাসে রোজা রাখলে অন্য মাসের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি সওয়াব হবে বা এই মাসের রোজার বিশেষ কোনো মর্যাদা আছে, তবে সেই বিশ্বাসটি সঠিক নয়। কারণ, রজব মাসের বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসগুলো হয় অত্যন্ত দুর্বল, অথবা বানোয়াট। (ইবনে হাজার আসকালানি, তাবয়িনুল আজাব বিমা ওয়ারাদা ফি ফাদলি রাজাব, পৃষ্ঠা: ১১)

আরও পড়ুন

নবীজি ও সাহাবিগণের আমল

রজব মাসের রোজা নিয়ে হাদিসের কিতাবগুলোতে দুই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়:

সাইদ ইবনে জোবাইর (রহ.)-এর বর্ণনা থেকে জানা যায়, ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, নবীজি (সা.) রজব মাসে কখনো এত বেশি রোজা রাখতেন যে মনে হতো তিনি আর রোজা ভাঙবেন না। আবার কখনো এত বেশি বিরতি দিতেন যে মনে হতো তিনি আর রোজা রাখবেন না।

ইমাম নববী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এর অর্থ হলো, রজব মাসের রোজার ব্যাপারে আলাদা কোনো বিশেষ নির্দেশ বা নিষেধ নেই। এটি অন্য সাধারণ মাসগুলোর মতোই।

এ ছাড়া দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) তাদের হাত ধরে টেনে খাবারের দস্তরখানে বসিয়ে দিতেন যারা কেবল রজব মাসকেই রোজার জন্য নির্দিষ্ট করে নিত। তিনি বলতেন, “এটি এমন এক মাস যাকে জাহেলি যুগে সম্মান করা হতো।” (ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৫/২৯১)

ওমর (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে এটি বোঝানো যে, রজব মাসকে যেন কেউ রমজানের মতো গুরুত্ব না দেয়।

আরও পড়ুন

রজব মাসে যে রোজাগুলো রাখা যাবে

রজব মাসে আলাদা কোনো ‘রজবি রোজা’ না থাকলেও সাধারণ সুন্নত হিসেবে নিচের রোজাগুলো রাখা যেতে পারে:

  • সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোজা: নবীজি (সা.) প্রতি সপ্তাহের এই দুই দিন রোজা রাখতেন।

  • আইয়ামে বিজের রোজা: প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখা সুন্নদ। রজব মাসেও এই তিন দিন রোজা রাখা যাবে।

  • রমজানের প্রস্তুতি: রমজানের আগে নিজেকে প্রশিক্ষিত করতে কেউ যদি এই মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখেন, তবে তা প্রশংসনীয়।

প্রচলিত কিছু ভ্রান্তি ও সতর্কতা

রজব মাসের রোজা নিয়ে সমাজে কিছু ‘বিদআত’ বা নব-উদ্ভাবিত প্রথা লক্ষ্য করা যায়, যা থেকে বিরত থাকা জরুরি:

প্রথম রজবের রোজা: বিশেষ সওয়াবের নিয়তে কেবল প্রথম দিন রোজা রাখার কোনো সহিহ ভিত্তি নেই।

পুরো মাস রোজা রাখা: রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাস পুরোটা রোজা রাখা সুন্নত পরিপন্থী।

২৭ রজবের রোজা : মিরাজের রাত মনে করে ২৭ তারিখে বিশেষ রোজা রাখা বিদআত, কারণ মিরাজের তারিখ নিশ্চিত নয় এবং নবীজি (সা.) কখনো এই দিনে বিশেষ রোজা রাখেননি।

রজব ও শাবান টানা রোজা : রমজানের আগে একটানা দুই মাস রোজা রাখা নবীজি (সা.) থেকে প্রমাণিত নয়।

রজব মাসে রোজা রাখা ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে যদি তা সাধারণ নফল রোজা হিসেবে রাখা হয়। তবে এই মাসকে অন্য মাসের চেয়ে বেশি সওয়াবের মাস মনে করে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে রোজা রাখা বা নির্দিষ্ট কিছু দিনকে ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করা শরিয়তে অনুমোদিত নয়।

আরও পড়ুন