শহর যখন ঘুমিয়ে পড়ে, স্মার্টফোনের স্ক্রিন নিভে যায়, দিনের কোলাহল থেমে আসে— ঠিক তখন কিছু মানুষ বিছানা ছেড়ে ওঠে। এটাই তাহাজ্জুদ।
ইসলামের পরিভাষায়, রাতের প্রথম ভাগে ঘুমিয়ে নেওয়ার পর শেষ রাতে উঠে যে নামাজ পড়া হয়, তাকেই তাহাজ্জুদ বলা হয়। এশা থেকে ফজর পর্যন্ত যেকোনো নফল নামাজকে সাধারণভাবে ‘কিয়ামুল লাইল’ বলা হলেও, তাহাজ্জুদের এই বিশেষ রূপটা আলাদা।
নবীজি নিজে কেমন করতেন
নবীজি (সা.) রাতের পর রাত এমনভাবে নামাজে দাঁড়াতেন যে তাঁর পা ফুলে যেত। কেউ একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, আল্লাহ তো আপনার আগে-পরের সব পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন, তাহলে কেন এত কষ্ট করছেন? জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮৩৬)
একবার জয়নব (রা.) মসজিদে দুই পিলারের মাঝে একটা রশি বেঁধে দিয়েছিলেন, যাতে দীর্ঘ নামাজে ক্লান্ত হয়ে পড়লে তিনি সেই রশি ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন। নবীজি এটা দেখে রশিটা খুলে ফেলতে বলেছিলেন। নিজের সাধ্যের মধ্যে আমল করাই তাঁর কাম্য ছিল, কষ্ট করে নিজেকে নিঃশেষ করা নয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৫০)
রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন আর জিজ্ঞেস করতে থাকেন, কে আছ যে ডাকবে, আমি সাড়া দেব? কে আছ যে চাইবে, আমি দেব? কে আছ যে ক্ষমা চাইবে, আমি ক্ষমা করে দেব?
নবীজি বলেছেন, ‘ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে ভালো নামাজ হলো রাতের নামাজ।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ১৬১৪)
পূর্বেকার যত সৎকর্মশীল মানুষ গত হয়েছেন, তাঁদেরও এটা ছিল একটা নিয়মিত অভ্যাস, যা মানুষকে স্রষ্টার কাছাকাছি নিয়ে যায় আর পাপ মুছে দেয়। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৪৯)
কোরআনেও এই রাতের ইবাদতের সাথে একটা বিশেষ মর্যাদার কথা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে ‘মাকামে মাহমুদ’ নামের এক প্রশংসিত স্থানে উন্নীত করেন। (সুরা ইসরা, আয়াত: ৭৯)
এমনকি ফেরেশতাদের এক আলোচনার হাদিসেও দেখা যায়, ক্ষুধার্তকে খাওয়ানো আর নরম কথা বলার পাশাপাশি রাতে ঘুমের ঘোরে নামাজ পড়াকেও শ্রেষ্ঠ আমলের তালিকায় রাখা হয়েছে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩২৩৫)
কোরআন যাদের কথা আলাদা করে বলে
কোরআনে বারবার আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের পরিচয় দিতে গিয়ে রাতের এই অভ্যাসের কথা এসেছে। সুরা ফুরকানে বলা হয়েছে, রহমানের প্রকৃত বান্দারা নম্রভাবে চলাফেরা করে, মূর্খরা তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করলে তারা শুধু শান্তির কথা বলে সরে যায়— আর তারা রাত কাটায় সিজদারত ও দাঁড়ানো অবস্থায়। (আয়াত: ৬৩-৬৪)
সুরা আজ-জারিয়াতে বলা হয়েছে তারা রাতের সামান্য অংশই ঘুমাত, বাকি সময়টা কাটত ইস্তেগফারে। (আয়াত: ১৭-১৮)
সুরা সাজদায় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, ‘তাদের পার্শ্বদেশ শয্যা ত্যাগ করে, তারা ভয় ও আশা নিয়ে তাদের প্রতিপালককে ডাকে... কোনো প্রাণীই জানে না তাদের এই আমলের পুরস্কারস্বরূপ চোখের শীতলতাকারী কী বিপুল নেয়ামত তাদের জন্য লুকিয়ে রাখা হয়েছে।’ (আয়াত: ১৬-১৭)
আরামের বিছানা ছেড়ে যারা অন্ধকারে আল্লাহর দরবারে দাঁড়ায়, তাদের জন্য এমন কিছু অপেক্ষা করছে, যা কল্পনাতেও ধরা যায় না।
যে ব্যক্তি রাতে নিজে জেগে ওঠে এবং সঙ্গীর মুখে সামান্য পানি ছিটিয়ে তাকেও জাগিয়ে তোলে, আল্লাহ তাদের ওপর বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন।সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৩০৮
একটি তির যা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না
ইমাম শাফেয়ি (রহ.) তাহাজ্জুদের দোয়াকে একটি চমৎকার উপমা দিয়ে বলেছেন, এটি এমন এক তির, যা কখনো নিশানা মিস করে না। (ইবনুল জাওযি, সাইদুল খাতির, ১/১২০, দারুল কলম, দামেস্ক, ২০০২)
কেননা, এই ইবাদতে লোকদেখানোর কোনো সুযোগ নেই। দিনের ইবাদতে সামাজিক চোখ থাকে, কিন্তু রাতের অন্ধকারে যখন কেউ দেখছে না, তখন যা হয় তা একেবারে খাঁটি, দুইজনের মধ্যকার একটা গোপন সম্পর্ক।
আর এই সময়টা এমনিতেই বিশেষ। রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন আর জিজ্ঞেস করতে থাকেন, কে আছ যে ডাকবে, আমি সাড়া দেব? কে আছ যে চাইবে, আমি দেব? কে আছ যে ক্ষমা চাইবে, আমি ক্ষমা করে দেব? (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪৫)
প্রতি রাতে খোদ মহাবিশ্বের মালিক যখন এভাবে ডাকেন, তখন প্রিয় বান্দারা ঘুমিয়ে থাকতে পারে না। ইমাম গাজালি লিখেছেন, শেষ রাতে বিছানা ছেড়ে ওঠার এই লড়াই আসলে নফসকে দমন করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। (আল-গাজালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ১/৩৫৫, দারুল খাইর, বৈরুত, ১৯৯৮)
এটি কি শুধু ব্যক্তিগত আমল
তাহাজ্জুদকে অনেকে নিছক ব্যক্তিগত ইবাদত মনে করেন, কিন্তু মদিনায় রাষ্ট্র গড়ার পেছনেও এর একটা ভূমিকা ছিল। মদিনায় পৌঁছে নবীজির প্রথম ভাষণেই তিনি তিনটি কাজের কথা বলেছিলেন: একে অপরের মধ্যে সালাম ছড়িয়ে দাও, ক্ষুধার্তকে খাওয়াও, আর মানুষ যখন ঘুমে থাকে তখন নামাজে দাঁড়াও, তাহলেই নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩২৫১)
মক্কি জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে, যখন নবীজি নির্যাতনে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত, তখনই আল্লাহ সুরা মুজ্জাম্মিলের প্রথম আয়াতগুলো নাজিল করে তাঁকে রাতের নামাজের নির্দেশ দেন, যেন সামনে আসা বিশাল দায়িত্বের জন্য তিনি ভেতর থেকে শক্তি সঞ্চয় করতে পারেন। (আয়াত: ১-৮)
শুরুটা কীভাবে করা যায়
রাতের আরাম ছেড়ে ওঠাটা প্রথম প্রথম কঠিন লাগবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে লড়াইটা আসলে রাতে শুরু হয় না, শুরু হয় আগের দিন থেকেই। দিনে যত কম পাপ আর অনর্থক কাজ থাকে, রাতে ওঠাটা তত সহজ হয়ে যায়।
কেউ যখন নিচু স্বরে রাতের নামাজে কোরআন পাঠ করে, ফেরেশতারা তা শোনার জন্য নেমে আসেন।
রাতে ভারী খাবার আর এশার পর সামাজিক মাধ্যমে সময় নষ্ট করা এড়িয়ে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়টাও শেষ রাতের উঠতে সাহায্য করে। সবচেয়ে জরুরি কথা হলো, প্রথম দিনেই এক-দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পরিকল্পনা না করা। ফজরের মাত্র পনেরো-বিশ মিনিট আগে অ্যালার্ম দিয়ে উঠে দুই রাকাত ছোট নামাজ দিয়েই শুরু করা যায়।
নবীজি বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়—পরিমাণে যতই কম হোক না কেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৫)
স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে এই অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে তার একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি রাতে নিজে জেগে ওঠে এবং সঙ্গীর মুখে সামান্য পানি ছিটিয়ে তাকেও জাগিয়ে তোলে, আল্লাহ তাদের ওপর বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৩০৮)
তাহাজ্জুদ কোনো অসাধারণ মানুষের জন্য সংরক্ষিত কিছু নয়। যে কেউ, নিজের দুর্বলতা আর ভাঙা মন নিয়েই, রাতের কোনো এক মুহূর্তে বিছানা ছেড়ে দাঁড়াতে পারে।
হাদিসে আছে, কেউ যখন নিচু স্বরে রাতের নামাজে কোরআন পাঠ করে, ফেরেশতারা তা শোনার জন্য নেমে আসেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৭৭৯)
প্রতি রাতে এই আমন্ত্রণটা আমাদের দরজায় আসে। প্রশ্ন শুধু, আমরা সাড়া দিতে প্রস্তুত কি না।