সুন্দর ইবাদতে সুস্থতার ৪ প্রভাব

শরীরচর্চার আধ্যাত্মিক গুরুত্বকে আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করিছবি: পেক্সেলস

একটু দ্রুত হাঁটা, কয়েক মাইল দৌড়ানো কিংবা সুইমিংপুলে কয়েকবার সাঁতার কাটা—শারীরিক এই নড়াচড়াগুলো আমাদের শরীরে তাৎক্ষণিক কিছু পরিবর্তন আনে।

আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস গভীর হয়, হৃৎপিণ্ডের গতি বাড়ে এবং ধমনিতে রক্তসঞ্চালন দ্রুততর হয়। ব্যায়ামের কিছুক্ষণ পরেই শরীরে এন্ডোরফিন হরমোনের নিঃসরণ ঘটে, যা আমাদের মানসিক চাপ কমিয়ে একধরনের অনাবিল আনন্দ ও সজীবতা দান করে।

সাধারণত আমরা ব্যায়ামকে কেবল ওজন কমানো বা শারীরিক গঠনের উন্নতির মাধ্যম হিসেবে দেখি। কিন্তু আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে, বিশেষ করে মুসলিম সমাজে যেখানে নারীদের কাজ, পরিবার এবং ইবাদতের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে শরীরচর্চার আধ্যাত্মিক গুরুত্বকে আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি।

একজন মুমিন ব্যক্তির জন্য সুস্থতা কেবল একটি শারীরিক অবস্থা নয়, বরং এটি ইবাদতের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। সক্রিয় জীবনধারা আমাদের আধ্যাত্মিকতাকে শাণিত করতে পারে এবং ইবাদতে নতুন গতি সঞ্চার করতে পারে।

ব্যায়ামহীন জীবনে রাতে দীর্ঘ সময় ঘুমিয়েও সকালে একধরনের অবসাদ কাজ করে। ফলে ফজরের সময় ঘুম থেকে ওঠা কষ্টকর হয়ে পড়ে এবং তড়িঘড়ি করে অজু-নামাজ শেষ করে আবার বিছানায় ফেরার তাগিদ কাজ করে।

১. ক্লান্তি দূর ও ইবাদতে সক্রিয়তা

শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা মানুষকে দ্রুত ক্লান্ত করে ফেলে। দীর্ঘ সময় বসে থাকা বা অলস জীবন যাপন করলে শরীরের শক্তি কমে যায়, ফলে সাধারণ কাজগুলোও তখন বোঝা মনে হয়। যখন কেউ নিয়মিত ব্যায়াম শুরু করেন, তখন তাঁর শরীরের শক্তির স্তর বৃদ্ধি পায়। এটি ঘুমের গুণমানও উন্নত করে। আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একজন সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ব্যায়ামহীন জীবনে রাতে দীর্ঘ সময় ঘুমিয়েও সকালে একধরনের অবসাদ কাজ করে। ফলে ফজরের সময় ঘুম থেকে ওঠা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়ে এবং তড়িঘড়ি করে অজু-নামাজ শেষ করে আবারও বিছানায় ফেরার তাগিদ কাজ করে।

কিন্তু যখন জীবনে শরীরচর্চার অন্তর্ভুক্তি ঘটে, তখন শরীর সতেজ থাকে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম এবং আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)

এখানে শক্তি বলতে কেবল শারীরিক নয়, বরং মানসিক ও আধ্যাত্মিক শক্তিকেও বোঝানো হয়েছে, যা সুস্থ শরীরের মাধ্যমেই অর্জিত হয়। নিয়মিত শরীরচর্চা মানুষকে ফজরের পর কোরআন তিলাওয়াত বা জিকিরের মতো অতিরিক্ত আমলগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও মানসিক প্রস্তুতি প্রদান করে।

আরও পড়ুন

২. শৃঙ্খলার সুদূরপ্রসারী প্রভাব

ইসলামি জীবনদর্শনের একটি মূল ভিত্তি হলো শৃঙ্খলা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রমজানের রোজা—সবই মানুষকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে। ব্যায়ামের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ধরনের শৃঙ্খলার প্রয়োজন হয়।

শরীরচর্চা আমাদের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শেখায়। যখন আমরা জিমের কোনো কঠিন ব্যায়াম বা দীর্ঘ পথ দৌড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করি, তখন আমরা আসলে নিজের নফস বা প্রবৃত্তিকেই জয় করতে শিখি।

শারীরিক এই শৃঙ্খলা আমাদের জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ‘ডমিনো ইফেক্ট’ বা চেইন রিঅ্যাকশনের মতো কাজ করে। যদি কেউ নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারেন, তবে তাঁর জন্য কোরআনের হেফজ করা বা নিয়মিত নফল ইবাদতের জন্য সময় বের করা অনেক সহজ হয়ে যায়।

ইমাম ইবনুল কাইয়িম উল্লেখ করেছেন, শরীরচর্চা কেবল শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় না, বরং এটি মানুষের চিন্তাশক্তি এবং সংকল্পকেও দৃঢ় করে। (যাদুল মাআদ, ৪/১৮৮, মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ, ১৯৯৮)

নিশ্চয়ই তোমার শরীরের তোমার ওপর অধিকার রয়েছে।’
সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৭৫

সুতরাং শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির এই লড়াই প্রকারান্তরে আত্মিক শৃঙ্খলা বৃদ্ধিরই নামান্তর।

৩. মানসিক স্বচ্ছতা ও প্রশান্তি

আধুনিক যুগের এক বড় সমস্যা হলো মানসিক অস্থিরতা ও উদ্বেগ। এই অস্থিরতা আমাদের ইবাদতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। অনেক সময় দেখা যায়, জায়নামাজে দাঁড়িয়েও আমাদের মন দুনিয়াবি দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকে।

একে একধরনের ‘মানসিক কুয়াশা’ বলা যেতে পারে। শরীরচর্চা এই কুয়াশা দূর করতে জাদুর মতো কাজ করে।

যখন রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এবং মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায়, তখন চিন্তার স্বচ্ছতা ফিরে আসে। যাঁরা তীব্র মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যান, তাঁরা ব্যায়ামের মাধ্যমে একধরনের আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করেন।

আল্লাহ–তাআলা কোরআনে বলেন, ‘তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি অবতীর্ণ করেন, যাতে তারা তাদের ইমানের সঙ্গে আরও ইমান বাড়িয়ে নেয়।’ (সুরা ফাতহ, আয়াত: ৪)

শারীরিক পরিশ্রম মানুষের অস্থিরতাকে প্রশমিত করে তাকে এই প্রশান্তি গ্রহণের জন্য উপযুক্ত করে তোলে। প্রশান্ত মন নিয়ে যখন কেউ জায়নামাজে দাঁড়ায়, তখন তার নামাজ কেবল একটি যান্ত্রিক ক্রিয়া থাকে না, বরং তা আল্লাহর সঙ্গে এক গভীর সংযোগে পরিণত হয়।

আরও পড়ুন

৪. একাগ্রতা ও সচেতনতা

আমরা এক চরম বিচ্যুতি বা মনঃসংযোগহীনতার যুগে বাস করছি। আমাদের চারপাশের শত শত নোটিফিকেশন আর কাজের তালিকা আমাদের মনকে সব সময় বিক্ষিপ্ত করে রাখে। এই বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে ইবাদতে একাগ্রতা বা ‘খুশু’ অর্জন করা অসম্ভব।

গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম মানুষের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং স্বনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা উন্নত করে।

ইবাদতের মূল প্রাণ হলো খুশু বা একাগ্রতা। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই সফলকাম হয়েছে সেই মুমিনগণ, যারা নিজেদের নামাজে বিনয়-নম্র ও একাগ্র।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১-২)

শরীর যখন সুস্থ ও সচল থাকে, তখন দীর্ঘ সময় সিজদায় থাকা বা ধীরস্থিরভাবে নামাজ আদায় করা আর কষ্টের কাজ মনে হয় না।

ব্যায়ামের মাধ্যমে যখন আমরা নিজের শরীর ও শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি মনোযোগী হতে শিখি, সেই একই মনোযোগ আমাদের দোয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়। তখন আমাদের দোয়া কেবল মুখস্থ কিছু শব্দের বুলি থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে হৃদয় নিংড়ানো আকুতি।

শরীর যখন সুস্থ ও সচল থাকে, তখন দীর্ঘ সময় সিজদায় থাকা বা ধীরস্থিরভাবে নামাজ আদায় করা আর কষ্টের কাজ মনে হয় না।

শরীর আল্লাহর আমানত

একজন মুমিন হিসেবে আমাদের বিশ্বাস করা উচিত যে এই শরীর আমাদের নিজস্ব কোনো সম্পত্তি নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি আমানত।

কেয়ামতের ময়দানে প্রত্যেক মানুষকে তার শরীরের ব্যবহার সম্পর্কে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমার শরীরের তোমার ওপর অধিকার রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৭৫)

শরীরের এই অধিকার হলো তাকে সুস্থ রাখা, পুষ্টিকর খাবার দেওয়া এবং সচল রাখা। যখন আমরা অলসতা ত্যাগ করে সক্রিয় জীবনধারা বেছে নিই, তখন আমরা আসলে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের শোকর আদায় করি।

একজন সচেতন মুমিন বুঝতে পারেন যে একটি সুস্থ শরীর তাকে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদ পড়তে, হজের মতো কঠিন শারীরিক ইবাদত পালন করতে এবং সমাজ ও মানবতার সেবায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে সাহায্য করে।

আরও পড়ুন