মানুষ স্বভাবতই স্বাধীনতাপ্রিয়। আধুনিক সভ্যতায় আমাদের ধারণা, নিজেদের ওপর আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আমরা যা ইচ্ছা তা করতে পারি এবং আমাদের সিদ্ধান্ত, বিশ্বাস ও ইচ্ছাশক্তি সম্পূর্ণ আমাদেরই অধীন। কিন্তু আসলেই কি তা-ই?
পবিত্র কোরআনের সুরা আনফালের ২৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ–তাআলা এমন এক গভীর সত্য তুলে ধরেছেন, যা আমাদের এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে নতুন করে ভাবায়।
আয়াতটির অর্থ, ‘হে মুমিনগণ, রাসুল যখন তোমাদের এমন কিছুর দিকে ডাকেন, যা তোমাদের প্রাণবন্ত করে, তখন আল্লাহ ও রাসুলের ডাকে সাড়া দাও। আর জেনে রাখো, আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মাঝখানে অন্তরায় হয়ে যান এবং তাঁরই কাছে তোমাদের সবাইকে একত্র করা হবে।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ২৪)
আল্লাহ যদি জোর করে কাউকে ইমান আনতে বাধা দিতেন, তাহলে তাকে ইমান আনার নির্দেশ দেওয়া যৌক্তিক হতো না।
‘আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মাঝখানে অন্তরায় হয়ে যান’—কোরআনের এই আয়াত ইসলামি ধর্মতত্ত্ব, দর্শন ও তাফসিরশাস্ত্রে সুগভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মুফাসসিরগণ মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও আল্লাহর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণের আলোকে এর তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক নানা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যা জীবনের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
অন্তর আল্লাহর হাতে
বেশির ভাগ মুফাসসির আয়াতের আক্ষরিক ও আধ্যাত্মিক অর্থের দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ও দাহহাক (রহ.)–এর মতে, আল্লাহ কাফের ও তার ইমানের মাঝে এবং মুমিন ও তার কুফরের মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করেন। (তাফসিরে তবারি ও তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা আনফাল ২৪ নম্বর আয়াতের তাফসির)
অর্থাৎ মানুষের হৃদয় সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে; তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা পরিবর্তন করেন। মহানবী (সা.) নিজেও দোয়া করতেন, ‘হে অন্তর পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৪০)
তবে বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আল্লাহ যদি জোর করে কাউকে ইমান আনতে বাধা দিতেন, তাহলে তাকে ইমান আনার নির্দেশ দেওয়া যৌক্তিক হতো না। (ইমাম কুরতুবি ও ফখরুদ্দীন রাজির তাফসির)
এটি অনেকটা অক্ষম ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার নির্দেশ দেওয়ার মতো, যা আল্লাহর পরম ন্যায়বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তা ছাড়া কোরআন নাজিল হয়েছে মানুষের জন্য প্রমাণ (হুজ্জত) হিসেবে।
মানুষ নিজের অন্তরের যতটা কাছে, আল্লাহ তার চেয়েও বেশি কাছে। অন্তরের গহিনে লুকিয়ে থাকা ক্ষুদ্রতম চিন্তাও আল্লাহর কাছে গোপন নয়।
ইমান আনতে বাধা দিয়ে উল্টো শাস্তি দেওয়া হলে কাফেররাই দাবি করত, আল্লাহই তো তাদের বাধা দিয়েছেন। তাই প্রখ্যাত মুফাসসিরগণ আয়াতটির ভিন্ন কিছু ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তাফসিরকারদের মতে, আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করেন উক্ত ব্যক্তিকে মৃত্যুদানের মাধ্যমে। (তাফসিরে ইবনে কাসির)। এর অর্থ, কোনো নেক কাজের তাগিদ অনুভব করামাত্রই তাতে সাড়া দেওয়া উচিত। কারণ, মৃত্যু যেকোনো সময় এসে যেতে পারে এবং তা মানুষের তওবা ও ভালো কাজের ইচ্ছার মাঝে চিরস্থায়ী দেয়াল তুলে দেবে।
প্রখ্যাত তাবেয়ি মুজাহিদ (রহ)–এর মতে, এখানে ‘অন্তর’ বলতে বুদ্ধি বা বিবেক বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে তবারি)। আল্লাহ বার্ধক্য বা রোগের মাধ্যমে মানুষের বিবেক-বুদ্ধি কেড়ে নিতে পারেন।
বুদ্ধি লোপ পেলে মানুষের ওপর আর কোনো দায় থাকে না, আমলের সুযোগও থাকে না। তাই বুদ্ধি-বিবেক সতেজ থাকতেই সৎকাজের দিকে ধাবিত হওয়া প্রয়োজন।
মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের দিকেও আয়াতটিতে গভীর ইঙ্গিত রয়েছে। আয়াতটি নাজিল হয়েছিল বদর যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। শত্রুর বিশাল বাহিনী দেখে মুসলমানরা তখন মানসিকভাবে কিছুটা ভীত ছিলেন।
আল্লাহ বোঝাতে চেয়েছেন, তিনি অন্তরের নিয়ন্তা; চাইলে মুহূর্তেই অন্তরের দুর্বলতা ও ভয় দূর করে সেখানে অসীম সাহস ও শক্তি সঞ্চার করতে পারেন। (তাফসিরে ইবনে কাসির)।
বিখ্যাত তাবেয়ি হাসান বসরি (রহ.) একটি চমৎকার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। (তাফসিরে কুরতুবি)। তাঁর মতে, মানুষ নিজের অন্তরের যতটা কাছে, আল্লাহ তার চেয়েও বেশি কাছে। অন্তরের গহিনে লুকিয়ে থাকা ক্ষুদ্রতম চিন্তাও আল্লাহর কাছে গোপন নয়।
ভালো কাজের প্রেরণা মনে আসা মাত্রই কালক্ষেপণ না করে তা বাস্তবায়ন করা উচিত। কারণ, দিন শেষে আমাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে সেই মহান সত্তার কাছেই।
আয়াতের সতর্কবার্তা
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ বলেছেন, ‘এবং তাঁরই কাছে তোমাদের সবাইকে একত্র করা হবে।’ এই ঘোষণা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। নিজের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের যে অহংকার মানুষ করে, তা মূলত এক বিভ্রম। আমাদের জীবন, সময়, এমনকি ইচ্ছাশক্তিও পরম করুণাময়ের ইচ্ছাধীন।
আয়াতের মূল উদ্দেশ্য মানুষকে অলসতা ও গাফিলতি থেকে জাগিয়ে তোলা। মৃত্যু বা অসুস্থতা যেকোনো মুহূর্তে ভালো কাজের সুযোগ কেড়ে নিতে পারে। আবার নিজেকে পূর্ণ স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে যা খুশি তা করাও উচিত নয়।
কারণ, নিজের মন নিজের অজান্তেই পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।
তা ছাড়া ভালো কাজের প্রেরণা মনে আসা মাত্রই কালক্ষেপণ না করে তা বাস্তবায়ন করা উচিত। কারণ, দিন শেষে আমাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে সেই মহান সত্তার কাছেই, যাঁর হাতে আমাদের অন্তরের চাবিকাঠি।