সন্তান যখন ঘর ছাড়ে: পরিবারের সংকটে ইসলামের সমাধান

সম্মান সহিংসতায় নয়; বরং ধৈর্যে নিহিতছবি: পেক্সেলস

একটি আদর্শ মুসলিম পরিবারে যখন কোনো সন্তান ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়, তখন সেই পরিবারটি কেবল একটি সংকটের মধ্য দিয়েই যায় না; বরং এক চরম সামাজিক ও মানসিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়।

অনেক ধর্মভীরু পরিবারও আজকাল এই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। এমন অবস্থায় বাবার সম্মান রক্ষার জেদ বনাম ইসলামের ধৈর্যশীল শিক্ষার মধ্যে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়, তা থেকে উত্তরণের উপায় খোঁজা দরকার।

সংকটের মূলে: দুটি অতি চরমপন্থা

পশ্চিমা সমাজ বা আধুনিক সংস্কৃতির প্রভাবে যখন কোনো তরুণ–তরুণী ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তার পেছনে সাধারণত দুটি কারণ কাজ করে:

১. অতিরিক্ত স্বাধীনতা ও নির্দেশনার অভাব: কিছু পরিবার পশ্চিমা জীবনধারার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সন্তানদের এমন অবাধ স্বাধীনতা দেয় যে, সেখানে ধর্মীয় বা নৈতিক শাসনের কোনো বালাই থাকে না। ফলে সন্তানেরা ধীরে ধীরে নিজের শিকড় ভুলে বিপথে চলে যায়।

২. অতিরিক্ত কঠোরতা ও ভীতিকর পরিবেশ: অনেক সময় ধার্মিক অভিভাবকেরা সন্তানদের বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখতে চান। বাড়িকে তারা এমন এক জেলখানায় পরিণত করেন, যেখানে স্বাভাবিক আনন্দ বিনোদনও ‘হারাম’ বলে গণ্য হয়। যখন স্কুল বা বন্ধুদের মধ্যে সন্তানেরা এক রঙিন জগৎ দেখে আর ঘরে কেবল শাস্তির ভয় পায়, তখন তারা প্রথম সুযোগেই এই ‘বন্দিদশা’ থেকে মুক্ত হতে চায়।

কেউ অন্য কারও বোঝা বহন করবে না।
কোরআন, ’সুরা ফাতির, আয়াত: ১৮

ইসলাম আমাদের মধ্যমপন্থা শিক্ষা দেয়। সন্তানকে কেবল শাসন নয়, বরং মমতায় আগলে রেখে তাকে সঠিক ও ভুলের পার্থক্য বুঝিয়ে দিতে হয়, যাতে সে নিজেই ভুল পথকে ঘৃণা করতে শেখে।

আরও পড়ুন

সম্মান বনাম ইসলাম: বাবার প্রতি নসিহত

সন্তান ঘর ছেড়ে যাওয়ার পর একজন দ্বীনদার বাবার কাছে সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় তার ‘সম্মান’ বা ‘ইজ্জত’। বিশেষ করে তিনি যদি সমাজের গণ্যমান্য বা ‘শায়খ’ পর্যায়ের কেউ হন, তবে তার মনে হয় সবাই তাকে নিয়ে উপহাস করছে।

এই ‘মর্যাদা রক্ষা’র তাগিদে অনেকে নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া বা চরম কোনো সহিংস পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবেন; কিন্তু ইসলামি শরিয়তে নিজের হাতে শাস্তি তুলে নেওয়া সম্পূর্ণ হারাম এবং অগ্রহণযোগ্য।

এমন পরিস্থিতিতে একজন বাবার জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো স্মরণ করা জরুরি:

১. নবীদের জীবন থেকে শিক্ষা

পবিত্র কোরআনে হজরত নুহ (আ.)-এর কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। তিনি ছিলেন আল্লাহর একজন মহান রাসুল; কিন্তু তাঁর নিজের সন্তান তাঁর অবাধ্য ছিল এবং কুফরির ওপর মৃত্যুবরণ করেছিল। আল্লাহ–তাআলা নুহ (আ.)-কে তাঁর অবাধ্য সন্তানের কারণে লজ্জিত করেননি; বরং তাঁকে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

একজন বাবা যখন নিজের অহংকার বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্য ধরেন, তখন তিনি আল্লাহর কাছে আরও বেশি সম্মানিত হন।

একইভাবে হজরত লুত (আ.)-এর স্ত্রী অবাধ্য ছিল। সন্তান বা পরিবারের কেউ পথভ্রষ্ট হলে তার দায়ভার নবিদের ওপর পড়েনি। সুতরাং, সম্মান কেবল আল্লাহর হাতে; সন্তানের ভুলের কারণে একজন নেককার বাবার মর্যাদা আল্লাহর কাছে কমে যায় না।

কোরআন মাজিদে বলা হয়েছে, ‘কেউ অন্য কারও বোঝা বহন করবে না।’ (সুরা ফাতির, আয়াত: ১৮)

২. ধৈর্য ও প্রজ্ঞা

বিজয় বা সম্মান সহিংসতায় নয়; বরং ধৈর্যে নিহিত। যদি কোনো বাবা রাগের বশবর্তী হয়ে সন্তানের ওপর চড়াও হন বা চরম কোনো পদক্ষেপ নেন, তবে তিনি কেবল নিজের পরিবারকেই ধ্বংস করবেন না; বরং ইসলামের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করবেন।

ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে যে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণকারীই প্রকৃত শক্তিশালী। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সে ব্যক্তি প্রকৃত বীর নয় যে কুস্তিতে অন্যকে আছাড় দেয়; বরং প্রকৃত বীর সেই যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬,১১৪)

আরও পড়ুন

সমাধানের পথে করণীয়

এই কঠিন সংকট কাটিয়ে উঠতে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের কিছু বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া: বাবাকে বোঝাতে হবে যে হিদায়েত দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। তিনি তাঁর সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন, এখন ফলাফল আল্লাহর হাতে।

সহিংসতা পরিহার: নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া কেবল দুনিয়াবি ক্ষতিই নয়, পরকালেও জাহান্নামের কারণ হতে পারে। আইনগত কোনো সমস্যা থাকলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।

আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা মুমিনের অন্যতম গুণ।
সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৯৬

আলোচনার দ্বার খোলা রাখা: মেয়েটি চরম অবাধ্য হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষীণ পথটুকুও বন্ধ করা ঠিক নয়। তাকে অনুভব করতে দিতে হবে যে সে ফিরে আসতে চাইলে তার পরিবারের দরজা সবসময় খোলা। তওবা করার সুযোগ আল্লাহ সবাইকে দেন।

সামাজিক সচেতনতা: এ ঘটনাকে শিক্ষা হিসেবে নিয়ে সমাজের অন্যান্য অভিভাবককে সচেতন করা যেতে পারে, যাতে তারা সন্তানদের লালন-পালনে অতি কঠোরতা বা অতি শিথিলতা—কোনোটিই না করেন।

একটি মুসলিম পরিবারের জন্য সন্তানের বিচ্যুতি বড় কষ্টের। তবে এই কষ্ট যেন আমাদের ইসলামের সীমানা লঙ্ঘন করতে বাধ্য না করে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা মুমিনের অন্যতম গুণ।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৯৬)

একজন বাবা যখন নিজের অহংকার বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্য ধরেন, তখন তিনি আল্লাহর কাছে আরও বেশি সম্মানিত হন। পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, সমাধান খুঁজতে হবে সুন্নাহর আলোকে, ক্রোধের বশবর্তী হয়ে নয়।

আরও পড়ুন