সুরা নাস্‌র: বিজয়ের আনন্দ ও বিদায়ের মহিমা

ছবি: ফ্রিপিক

পবিত্র কোরআনের অন্যতম ছোট সুরা ‘নাস্‌র’। কিন্তু এই সুরায় লুকিয়ে আছে মুসলিম ইতিহাসের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং এক মহান আত্মার বিদায়ের ইঙ্গিত।

এই সুরাটি একদিকে মক্কা বিজয় ও ইসলামের প্রসারের সুসংবাদ দেয়, অন্যদিকে অত্যন্ত নিভৃতে মহানবী (সা.)-এর পার্থিব জীবনের সমাপ্তি ও মহান রবের সান্নিধ্যে গমনের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেয়।

বিজয়ের সুসংবাদ

সুরা নাস্‌রের প্রথম আয়াতে আল্লাহ–তাআলা নবীজি (সা.)-কে এক মহা-বিজয়ের সংবাদ দিয়েছেন। এর ব্যাখ্যায় আবদুর রহমান আস-সাদি (র.) বলেন, এই সুরাটি মূলত মক্কা বিজয় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সাহায্য পৌঁছানোর চূড়ান্ত ঘোষণা। (আস-সাদি, তাইসিরুল কারিমির রহমান, পৃষ্ঠা: ৯৩৬, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০৩)

আরও পড়ুন

এরপর দ্বিতীয় আয়াতে মানুষের দলে দলে ইসলামে প্রবেশের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ বছরের সবর ও সংগ্রামের পর যখন মক্কা বিজিত হয়, তখন আরবের গোত্রগুলো আর ব্যক্তিগতভাবে নয়, বরং দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। (সুরা নাসর, আয়াত: ২)

তসবিহ ও ইস্তিগফারের রহস্য

বিজয় পরবর্তী সময়ে মানুষকে সাধারণত অহংকার বা বিজয়োল্লাসে মত্ত হতে দেখা যায়। কিন্তু আল্লাহ–তাআলা নবীজি (সা.)-কে নির্দেশ দিলেন তসবিহ ও ইস্তিগফারের। তৃতীয় আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তবে আপনি আপনার রবের প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন; নিশ্চয়ই তিনি পরম তওবা কবুলকারী।’

ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, এই নির্দেশের পেছনে দুটি ইঙ্গিত রয়েছে:

১. কৃতজ্ঞতা ও স্থায়িত্ব: যেকোনো নেয়ামত বা বিজয় কেবল শক্তি দিয়ে ধরে রাখা যায় না, বরং তা আল্লাহর শুকরিয়ার মাধ্যমে স্থায়িত্ব পায়। যেমনটি আল্লাহ সুরা ইবরাহিমে বলেছেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি তোমাদের নেয়ামত বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৭)

আরও পড়ুন

২. বিদায়ের পদধ্বনি: ইবাদত বা মহান কোনো কাজ শেষে ইস্তিগফার করা ইসলামের একটি সুন্দর রীতি। এই সুরায় নবীজি (সা.)-কে ইস্তিগফারের নির্দেশ দেওয়ার অর্থ ছিল—তাঁর নবুয়তের মিশন সম্পন্ন হয়েছে এবং এখন তাঁর মহান রবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় ঘনিয়ে এসেছে। (ইবনে কাসির, তাফসিরু কুরআনিল আজিম, ৮/৫১১, দারুত তাইয়িবাহ, রিয়াদ, ১৯৯৯)

নবীজির নিয়মিত আমল 

সুরাটি নাজিল হওয়ার পর রাসুল (সা.) তাঁর প্রতিটি নামাজে, বিশেষ করে রুকু ও সিজদায় এই দোয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন—‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা রাব্বানা ওয়া বিহামদিকা আল্লাহুম্মাগফিরলি’ (হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক, আপনার পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন)। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৬৮)

ইবনে আব্বাস (রা.) এই সুরার ব্যাখ্যায় বলেছিলেন, ‘এটি ছিল আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের সংবাদ, যা আল্লাহ তাঁকে আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৭০)

সুরা নাসর আমাদের শেখায় যে জীবনের প্রতিটি বড় অর্জনে বিনয়ী হতে হয় এবং মহান রবের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মস্তক অবনত করতে হয়।

আরও পড়ুন