সফর: ইসলামের ইতিহাসে এক ঘটনাবহুল মাস

ছবি: ফ্রিপিক

এখন সফর মাস। ইসলামি ক্যালেন্ডারের দ্বিতীয় মাস সফর। আরবি ‘সফর’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘শূন্য’ বা ‘রিক্ততা’। প্রাক-ইসলামি যুগে আরবরা এই সময়ে খাদ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বসতবাড়ি ছেড়ে মরুভূমিতে পাড়ি জমাত, ফলে জনপদগুলো জনশূন্য হয়ে পড়ত। (ইবনে মানজুর, লিসানুল আরব, ৪/৩৮৫, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৯৪)

এই ব্যুৎপত্তিগত অর্থ থেকে পরবর্তীকালে এক ভিত্তিহীন কুসংস্কারের জন্ম হয়—সফরকে ‘অশুভ মাস’ ভাবার প্রবণতা, যা ইসলাম আগমনের পরও সমাজের গভীরে রয়ে গেছে।

সফরের কুসংস্কার কী

জাহেলি যুগের আরবরা বিশ্বাস করত, সফর মাসে বিপদ-আপদ বেশি নেমে আসে, এমনকি কারও কারও ধারণা ছিল সফর মানুষের পেটে বসবাসকারী এক সাপ, যা ক্ষুধার্ত হলে যন্ত্রণা দেয়।

এই ধরনের একাধিক কুসংস্কার প্রাক-ইসলামি সমাজে প্রচলিত ছিল। নবীজি (সা.) এই ভিত্তিহীন বিশ্বাসগুলো এক বাক্যেই খণ্ডন করে দিয়েছেন। বলেছেন, ‘কোনো ‘আদওয়া’ নেই, কোনো পাখির অশুভ লক্ষণ নেই, কোনো ‘হামাহ’ নেই, সফর মাসেও কোনো অশুভত্ব নেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭০৭)

‘আদওয়া’ নেই মানে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো সংক্রামক ব্যাধি ছড়ায় না। আর ‘হামাহ’ মানে তারা বিশ্বাস করত, কোনো মানুষ খুন হলে তার হাড় বা আত্মা একধরনের পেঁচা বা পাখিতে রূপান্তরিত হয়ে যেত, আর সেই পাখি কবরের ওপর বা আশেপাশে উড়ে বেড়িয়ে চিৎকার করত, যতক্ষণ না নিহতের প্রতিশোধ নেওয়া হতো।

আরও পড়ুন

সফর মাসের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সফর মাস ইতিহাসের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী।

১. হিজরতের প্রস্তুতি: ইসলামের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত। এর চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু হয় সফর মাসেই। ২৭ সফর নবীজি (সা.) আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে মক্কার ঘর ত্যাগ করেন এবং সাওর গুহায় আশ্রয় নেন, যেখানে তিন দিন অবস্থানের পর তাঁরা মদিনার পথে রওনা হন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/৪৮০, মোস্তফা আল-বাবি আল-হালাবি, কায়রো, ১৯৫৫)

কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, আমরা সাধারণত হিজরতের বছরকে মহররম দিয়ে গণনা শুরু করি, অথচ প্রকৃত যাত্রাটা শুরু হয়েছিল সফরের শেষভাগে।

২. খাইবার বিজয়: সপ্তম হিজরির সফর মাসে সংঘটিত হয় খাইবার বিজয়। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে ইহুদি অধ্যুষিত খাইবার দুর্গ মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং মদিনার রাষ্ট্রব্যবস্থা আরও সুসংহত হয়। (আত-তাবারি, তারিখুর রাসুল ওয়াল মুলুক, ৩/১১-১৫, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৬৭)

আরও পড়ুন

৩. ফাতিমা–আলীর বিবাহ: দ্বিতীয় হিজরির সফর মাসে নবীজির প্রিয় কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর সঙ্গে আলী (রা.)-এর বিবাহ সম্পন্ন হয়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/১৭৬, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৮)

এই বিবাহ থেকেই পরবর্তীতে হাসান-হোসাইন (রা.)-এর জন্ম, যাঁরা ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

৪. ওসামা ইবনে জায়েদের বাহিনী: একাদশ হিজরির সফর মাসে নবীজি (সা.) রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য ওসামা ইবনে জায়েদের নেতৃত্বে একটা সেনাবাহিনী গঠন করেন। এটি ছিল তাঁর জীবনের শেষ সামরিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি। (ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত-তারিখ, ২/৩১৮, দারুল কিতাব আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৯৭)

উল্লেখযোগ্য, এই অভিযান রওনা হওয়ার আগেই নবীজির অসুস্থতা শুরু হয়ে যায়। অনেক বর্ণনামতে এই অসুস্থতার সূচনাও সফর মাসের শেষভাগেই ঘটে, যা পরে রবিউল আউয়ালে তাঁর ইন্তেকাল পর্যন্ত গড়ায়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫/৪২০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৮)

৫. ইমাম হাসানের শাহাদত: নবীজির দৌহিত্র ইমাম হাসান (রা.) ৫০ হিজরির ২৮ সফর বিষপ্রয়োগে শাহাদাত বরণ করেন। এই ঘটনা কারবালার ট্র্যাজেডির (৬১ হিজরি) প্রায় এগারো বছর আগে ঘটেছিল।

আরও পড়ুন