নসিহত: সমাজ সংস্কারের মূলমন্ত্র
আমরা তথ্যের এক অতল মহাসাগরে বাস করছি। স্মার্টফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে জ্ঞান এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তথ্যের এই প্রাচুর্যের ভিড়েও আমরা অনেক সময় নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির পথ হারিয়ে ফেলি।
প্রচুর জানাশোনা থাকা সত্ত্বেও আমরা অনেক সময় অবলীলায় ভুলের ফাঁদে পা দিই। এখানেই ‘নসিহত’-এর অপরিহার্যতা।
নসিহত মানে কেবল ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া উপদেশ নয়; বরং এটি হলো গভীর আন্তরিকতা, সতর্কতা এবং অন্যের মঙ্গলের জন্য এক নিঃস্বার্থ প্রেরণা।
নসিহত কী
নসিহত শব্দটির গভীরতা এর অর্থেই নিহিত:
আভিধানিক অর্থ: কোনো কিছুকে খাঁটি করা, সুপথে পরিচালিত করা বা উপদেশ দেওয়া।
প্রায়োগিক অর্থ: আল্লামা ইবনুস সালাহ (রহ.)-এর মতে, “নসিহত হলো এমন একটি ব্যাপক বিষয়, যা একজন মুসলিমের জন্য সব ধরনের কল্যাণকামিতাকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং যা ইচ্ছা ও কর্ম—উভয় মাধ্যমেই প্রকাশ পায়।”
কোরআনে নসিহত
নবি-রাসুলদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল মানুষকে নসিহত করা। পবিত্র কোরআনে এর গুরুত্ব বারবার এসেছে, “আমি তোমাদের কাছে আমার প্রতিপালকের বাণী পৌঁছে দিচ্ছি এবং আমি তোমাদের একজন বিশ্বস্ত নসিহতকারী।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৬৮)
“আর উপদেশ দাও; নিশ্চয়ই উপদেশ মুমিনদের উপকারে আসে।” (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ৫৫)
এই আয়াতগুলো আমাদের শেখায়, কেউ ভুল পথে চললে চুপ থাকা উচিত নয়। বরং সুন্দরভাবে বুঝিয়ে তাকে সত্যের পথে ফেরানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
হাদিসে নসিহত
আল্লাহর রাসুল (সা.) নসিহতের গুরুত্বকে একটি ছোট কিন্তু গভীর বাক্যে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “দীন হলো নসিহত (কল্যাণ কামনা)।”
জিজ্ঞাসা করা হলো, কাদের জন্য? তিনি পাঁচটি স্তরের কথা উল্লেখ করেন:
আল্লাহর জন্য: শিরক বর্জন করা, তাঁর আদেশ পালন ও নিষেধ মেনে চলা।
আল্লাহর কিতাবের জন্য: কোরআনকে শ্রেষ্ঠ বাণী হিসেবে বিশ্বাস করা এবং এর বিধান জীবনে বাস্তবায়ন করা।
রাসুল (সা.)-এর জন্য: তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ এবং তাঁর শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
শাসকদের জন্য: ন্যায়ের পথে তাদের সহযোগিতা করা এবং ভুল হলে বিনম্রভাবে পরামর্শ দেওয়া।
সাধারণ মুমিনদের জন্য: একে অপরের প্রতি বিদ্বেষমুক্ত থাকা এবং কল্যাণের পথে একে অপরকে সাহায্য করা।
নসিহতের আদব
নসিহত তখনই ফলপ্রসূ হয় যখন তা সঠিক পদ্ধতিতে করা হয়। কঠোর ভাষা বা জনসম্মুখে অপমান নসিহত নয়, বরং তা মানুষের হৃদয়কে আরও কঠোর করে দেয়।
কার্যকর নসিহতের ৫টি শর্ত:
একান্ত আলোচনা: প্রকাশ্যে উপদেশ দিলে মানুষ বিব্রত হতে পারে। তাই গোপনে বুঝিয়ে বলা উত্তম।
সঠিক জ্ঞান: যে বিষয়ে নিজের পূর্ণ ধারণা নেই, সে বিষয়ে উপদেশ দেওয়া উচিত নয়।
আন্তরিকতা ও প্রজ্ঞা: আল্লাহ বলেন, “তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে।” (সুরা নাহল, আয়াত: ১২৫)
ধৈর্য ধারণ: উপদেশ দিতে গিয়ে বিরূপ আচরণ পেলেও ধৈর্য হারানো চলবে না।
নিজে আমল করা: নিজে আমল না করে অন্যকে বললে সেই কথার প্রভাব থাকে না।
সমাজে নসিহতের উপকারিতা
নসিহত কেবল পরকালীন মুক্তি নয়, বরং ইহকালীন শান্তি ও সামাজিক সংহতিও নিশ্চিত করে:
এটি মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি জাগ্রত করে।
আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করে ইমানকে সতেজ রাখে।
সমাজে হিংসা ও বিদ্বেষ দূর করে ভালোবাসার মেলবন্ধন তৈরি করে।
সামষ্টিক অবক্ষয় রোধ করে অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখায়।
শেষ কথা
একজন মুমিন অপর মুমিনের জন্য আয়নার মতো। আয়না যেমন আপনার চেহারার ধুলোবালিটুকু নিখুঁতভাবে দেখায় কিন্তু আঘাত করে না, নসিহতকারীও ঠিক তেমনই। তিনি মমতা আর বিনয়ের সঙ্গে ভাইয়ের ত্রুটি শুধরে দেন।
নসিহতের এই চর্চা যখন ব্যক্তি থেকে সমাজে ছড়িয়ে পড়বে, তখনই আমরা একটি অনাবিল ও সুখী পৃথিবীর সন্ধান পাব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কল্যাণকামী ও সঠিক নসিহতকারী হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
রায়হান আল ইমরান: লেখক ও গবেষক