বর্তমান সমাজে মা-বাবাদের মধ্যে প্রধানত তিনটি ধারার অভিভাবকত্ব দেখা যায়। এক শ্রেণির মা-বাবা পরিবারকে কোনো সেনা ব্যারাকের মতো কঠোর মনে করেন। তাঁদের নির্দেশই সেখানে শেষ কথা; সন্তানের আবেগ বা মতামতের কোনো সুযোগ থাকে না। এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা সন্তানরা ভেতর থেকে হীনম্মন্যতায় ভোগে।
ঠিক এর বিপরীত মেরুতে আছেন আরেক দল অভিভাবক, যাঁরা সন্তানের কোনো ইচ্ছাতেই ‘না’ বলতে পারেন না। অতিরিক্ত প্রশ্রয় পেয়ে বেড়ে ওঠা এসব সন্তান জীবনের বাস্তব চাপ ও প্রতিকূলতা সহ্য করতে পারে না।
এই দুই প্রান্তিকতার বাইরে রয়েছেন সচেতন অভিভাবকেরা। তাঁরা ভালো করেই জানেন যে শাসন ছাড়া সন্তানের নীতিবোধ তৈরি হয় না, আবার ভালোবাসাহীন শাসন শিশুর আত্মাকে ভেঙে দেয়। তাঁরা নিয়ম তৈরি করেন স্নেহের ভাষায়, ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন পরম মমতায়, কিন্তু নৈতিকতার প্রশ্নে থাকেন অবিচল।
সচেতন অভিভাবকেরা শাসন ছাড়া সন্তানের নীতিবোধ তৈরি হয় না, আবার ভালোবাসাহীন শাসন শিশুর আত্মাকে ভেঙে দেয়। তাঁরা নিয়ম তৈরি করেন স্নেহের ভাষায়, ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন পরম মমতায়।
কোরআনের পারিবারিক দর্শন
ইসলাম এই ভারসাম্যপূর্ণ ধারাকেই সন্তান প্রতিপালনের মূল ভিত্তি বানিয়েছে। বাইরের মানুষকে সত্যের পথে ডাকার শিষ্টাচার জানিয়ে আল্লাহ–তাআলা নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘আপনি আপনার রবের পথে আহ্বান করুন প্রজ্ঞা এবং উত্তম উপদেশের মাধ্যমে; আর তাদের সঙ্গে বিতর্ক করুন সবচেয়ে সুন্দর পন্থায়।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ১২৫)
বাইরের মানুষকে বোঝানোর ক্ষেত্রে যেখানে এমন প্রজ্ঞার নির্দেশ, সেখানে নিজের সন্তানের ক্ষেত্রে তা আরও কত বেশি প্রযোজ্য!
পরিবারে কর্কশ মেজাজ সন্তানের মনকে দূরে ঠেলে দেয়। আল্লাহ তাঁর নবীকে লক্ষ্য করে বলেছেন, ‘আল্লাহর দয়াতেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছেন; যদি আপনি রূঢ়ভাষী ও কঠিন মনের হতেন, তবে তারা সবাই আপনার চারপাশ থেকে দূরে সরে যেত।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
তবে সন্তানকে উদাসীনভাবে ছেড়ে দেওয়াও ইসলামের শিক্ষা নয়। পরিবারকে সচেতন রাখার তাগিদ দিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ইমানদারগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত: ৬)
পরিবারে সন্তানের ভুল হলে তা ক্ষমার চোখে দেখার পরামর্শ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘আর যদি তোমরা ক্ষমা করো, তাদের ভুল উপেক্ষা করো এবং দোষ মার্জনা করো—তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা তাগাবুন, আয়াত: ১৪)
সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন হওয়ার তাগিদ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আর তাদের ভয় করা উচিত, যারা নিজেদের পেছনে অসহায় সন্তানসন্ততি রেখে গেলে তাদের ব্যাপারে শঙ্কিত হতো; অতএব তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং সঠিক ও ন্যায়সংগত কথা বলে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৯)
নবীজির পাঠশালায় স্নেহ ও সান্নিধ্য
রাসুল (সা.) শিশুদের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতেন। তিনি দৌহিত্র হাসানকে বুকে জড়িয়ে ধরে দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ, আমি একে ভালোবাসি; অতএব আপনিও একে ভালোবাসুন এবং যে একে ভালোবাসে তাকেও ভালোবাসুন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪২২)
এক বেদুইন নবীজিকে শিশুদের আদর করতে দেখে অবাক হয়ে বলল, ‘আপনারা কি শিশুদের চুমু দেন? আমার তো দশটি সন্তান রয়েছে, আমি কখনো কাউকে চুমু খাইনি!’ রাসুল (সা.) ব্যথিত হয়ে বললেন, ‘আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে দয়া ও মায়া ছিনিয়ে নিয়ে থাকেন, তবে আমার কী করার আছে!’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৮)
নম্রতার গুরুত্ব জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘যেকোনো বিষয়ের সঙ্গে যখন কোমলতা যুক্ত হয়, তখন তা সেই বিষয়কে সুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ করে তোলে; আর যে বিষয় থেকে কোমলতা কেড়ে নেওয়া হয়, তা কলুষিত হয়ে পড়ে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৯৪)
তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান দেখায় না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯১৯)
নবীজির দীর্ঘ দশ বছরের সেবক হজরত আনাস (রা.) সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন, ‘পরিবার ও শিশুদের প্রতি নবীজির চেয়ে অধিক দয়ালু মানুষ আমি আর কাউকে দেখিনি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩১৬)
যেকোনো বিষয়ের সঙ্গে যখন কোমলতা যুক্ত হয়, তখন তা সেই বিষয়কে সুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ করে তোলে; আর যে বিষয় থেকে কোমলতা কেড়ে নেওয়া হয়, তা কলুষিত হয়ে পড়ে।সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৯৪
বয়স অনুযায়ী দীক্ষা
সন্তানকে কোনো ভালো কাজে অভ্যস্ত করতে হলে প্রচুর সময় ও সহনশীলতার প্রয়োজন। নামাজের মতো মৌলিক বিধানের ক্ষেত্রে রাসুল (সা.) সুন্দর এক পদ্ধতি নির্ধারণ করে বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও এবং দশ বছর বয়সে (প্রয়োজনে শাসনের মাধ্যমে) অভ্যস্ত করো, আর তাদের শোয়ার বিছানা পৃথক করে দাও।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৫)
সাত থেকে দশ বছর—এই তিন বছরের ব্যবধানে সন্তান প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ওয়াক্ত নামাজের মুখোমুখি হয়। মা-বাবা যদি তিন বছর ধরে প্রতিদিন ভালোবেসে নামাজের কথা মনে করিয়ে দেন, তবে দশ বছর বয়সে এসে মারধরের কোনো প্রয়োজনই পড়ে না।
অথচ অনেকে বছরের পর বছর সন্তানকে কিছু না শিখিয়ে হঠাৎ একদিন ক্ষোভে গায়ে হাত তোলেন, যা ইসলামের শিক্ষা নয়।
শারীরিক শাসনের ইসলামি সীমা
ইসলামে সন্তানকে শারীরিক প্রহার করা চরম অবাধ্যতার ক্ষেত্রে সংশোধনের সর্বশেষ উপায়। ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলোতে সন্তান শাসনের কিছু সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়েছে:
১. দশ বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত: দশ বছর বয়সের আগে কোনো অবস্থাতেই সন্তানের গায়ে হাত তোলা জায়েজ নয়। সাত থেকে দশ বছর কেবল মুখে বুঝিয়ে ও স্নেহের সঙ্গে অভ্যাস করানোর সময়। (রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ১/৩৫২)
২. উদ্দেশ্য হতে হবে সংশোধন: প্রচণ্ড ক্ষোভের মুহূর্তে সন্তানকে আঘাত করা জায়েজ নয়। কারণ রাগের বশে মানুষ নিজের ক্ষোভ নিবারণ করে, যা অবিচারে রূপ নেয়। (আল-মাবসুত লিস-সারাখসি, ৯/৬৮)
৩. সংবেদনশীল অঙ্গে আঘাত নিষিদ্ধ: শাসনের নামে শিশুর মুখ, মাথা, চোখ বা পেটে আঘাত করা সম্পূর্ণ হারাম। রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ প্রহার করে, সে যেন অবশ্যই চেহারা পরিহার করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬১২; আল-বাহরুর রায়েক, ৫/৪৪)
৪. ক্ষত সৃষ্টি না হওয়া: আঘাত এমন হতে হবে যাতে চামড়া না কাটে, রক্ত বের না হয় কিংবা শরীরে কোনো কালশিটে বা লাল দাগ না পড়ে। শরীরে দাগ ফেলা শরিয়তের দৃষ্টিতে অপরাধ ও ক্ষতিপূরণযোগ্য। (বাদায়িউস সানায়ে, ৭/৬৩; আল-মুগনি লি-ইবনে কুদামাহ, ৮/৩২৫)
৫. লাঠি ব্যবহার নিষিদ্ধ: হাত বা হালকা কাঠি দিয়ে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ এক থেকে তিনটি মৃদু প্রতীকী আঘাতের অনুমতি রয়েছে। রড, চামড়ার বেল্ট বা ভারী লাঠি দিয়ে আঘাত করা শরিয়তে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। (আল-ফতোয়া আল-হিন্দিয়্যাহ, ৫/৩৫৫)
আয়েশা (রা.) নবীজির আচরণ তুলে ধরে বলেন, ‘নবীজি কখনো নিজ হাত দিয়ে কাউকে আঘাত করেননি—কোনো নারীকে নয়, কোনো সেবককে নয়; কেবল আল্লাহর পথে জিহাদের ময়দান ছাড়া।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩২৮)
নবীজির মূল নীতি ছিল, ‘তোমরা মানুষের জন্য সহজ করো, কঠিন কোরো না; সুসংবাদ দাও, দূরে ঠেলে দিয়ো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৯)
অনেক সময় মুখের কটু কথা শিশুর মনোজগতে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। সন্তানকে অপমান করা, বা অপয়া বলে গালমন্দ করা কিংবা অভিশাপ দেওয়া মহাপাপ।
গালমন্দের কঠোর নিষেধাজ্ঞা
অনেক সময় মুখের কটু কথা শিশুর মনোজগতে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। সন্তানকে অপমান করা, বা অপয়া বলে গালমন্দ করা কিংবা অভিশাপ দেওয়া মহাপাপ (কবিরা গুনাহ)।
রাসুল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘একজন খাঁটি মুমিন কখনো খোঁটাদানকারী, অভিশাপকারী, অশ্লীলভাষী কিংবা কটুভাষী হতে পারে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৭৭)
সন্তানের ওপর বদদোয়া করতে নিষেধ করে নবীজি বলেন, ‘তোমরা নিজেদের ওপর বদদোয়া কোরো না এবং তোমাদের সন্তানদের ওপরও বদদোয়া কোরো না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩০০৯)
সন্তান মহান আল্লাহর দেওয়া এক পরম আমানত। শাসনের লক্ষ্য প্রতিশোধ বা ক্ষোভ ঝাড়া নয়, বরং ভালোবাসা ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে সন্তানকে সুন্দর মানুষ বানানো। ধৈর্য, প্রজ্ঞা এবং মা-বাবার নিজেদের সচ্চরিত্রের মাধ্যমেই কেবল একটি শিশুকে সৎ ও আল্লাহভীরু হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।