বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মুসলিমদের কাছে রমজান আসে আনন্দ, উৎসব আর আধ্যাত্মিকতার বসন্ত নিয়ে, কিন্তু মিয়ানমারের মুসলিমদের কাছে রমজান যেন অগ্নিপরীক্ষা।
বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা এবং দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মুসলিম সংখ্যালঘুদের জন্য রমজান মানে বাড়তি আতঙ্ক, বিধিনিষেধ আর অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। যেখানে ইফতারের টেবিলে খাবারের চেয়ে রক্তের দাগ আর পোড়া গন্ধই বেশি পরিচিতি পেয়েছে গত কয়েক দশকে।
অবরুদ্ধ উপাসনালয়
মিয়ানমারের বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুন থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম—সবখানে রমজানের দৃশ্যপট করুণ। ২০১৭ সাল থেকে ইয়াঙ্গুনের বেশ কিছু এলাকায় ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা মাদ্রাসাগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় মুসলিমরা যেখানে তারাবির নামাজ আদায় করতেন, হঠাৎ করেই প্রশাসন সেগুলো সিলগালা করে দেয়।
এমনকি রাস্তায় দাঁড়িয়ে জামাতে নামাজ পড়ার চেষ্টা করলেও সরকারের পক্ষ থেকে তা ‘আইনশৃঙ্খলার পরিপন্থী’ হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেক এলাকায় মুসলিমদের নিজেদের ঘরেও দলবদ্ধ হয়ে নামাজ পড়তে বাধা দেওয়া হয়।
ফলে মিয়ানমারের মুসলিমদের রমজান কাটে নিভৃতে, বদ্ধ ঘরে অতি সন্তর্পণে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানিয়ে।
ইফতারের বাজারে অলিখিত বয়কট
রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিমদের জন্য রমজানের প্রস্তুতি নেওয়া এক দুঃসাধ্য কাজ। স্থানীয় বৌদ্ধ ব্যবসায়ীরা মুসলিমদের কাছে নিত্যপণ্য বিক্রি করতে অনীহা প্রকাশ করেন।
অনেক ক্ষেত্রে পণ্য বিক্রি করা হলেও তার দাম রাখা হয় আকাশচুম্বী। চাল, ডাল বা তেলের মতো সাধারণ খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করতেও তাদের গোপনে বা অন্যের সাহায্য নিয়ে বাজারে যেতে হয়।
সড়ক ও নৌপথে চলাচলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইফতারের সাধারণ উপকরণগুলোও তাদের কাছে দুর্লভ। শরণার্থী শিবিরগুলোতে জীবনযাপন করা কয়েক লক্ষ মানুষের কাছে ইফতার মানে স্রেফ এক গ্লাস জল আর সামান্য কিছু শুকনো খাবার।
খাবারের বৈচিত্র্য ও টিকে থাকার লড়াই
তবে মিয়ানমারের মুসলিমরা তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করেন। তাদের ইফতারের প্রধান একটি পদ হলো ‘লোরি ফিরা’, যা চালের গুঁড়া ও আটা দিয়ে তৈরি এক বিশেষ ধরনের রুটি। এছাড়া ডালের চচ্চড়ি বা কলার তৈরি বিভিন্ন পদ তাদের ইফতারের তালিকায় থাকে।
ইয়াঙ্গুনের মসজিদগুলোতে দেখা যায় ক্ষুধার্ত মানুষের দীর্ঘ লাইন। এক বাটি ভাত আর কারি (তরকারি) পাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন তারা। যারা একসময় স্বচ্ছল ছিলেন, তারাও অন্যের দেওয়া ইফতারের ওপর নির্ভরশীল।
তবুও এই চরম প্রতিকূলতার মাঝে তারা দিনের বেলা রোজা রাখেন এবং কোরআন তোলাওয়াতের মাধ্যমে মানসিক শান্তি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেন।
দুয়ারে দুয়ারে সংহতি
মিয়ানমারের মুসলিম সমাজ একে অপরের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে। এক টুকরো রুটি তারা ভাগ করে খান। কোথাও উদার বৌদ্ধ প্রতিবেশীরা গোপনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, তবে তা সংখ্যার বিচারে খুবই নগণ্য।
তবুও মিয়ানমারের মুসলিমরা বিশ্বাস করেন, এই দীর্ঘ অন্ধকার রাতের অবসান হবে। ইয়াঙ্গুনের অলিগলিতে আজানের সুমধুর ধ্বনি আবার প্রকাশ্যে বাজবে এবং তারা নির্ভয়ে সেজদায় অবনত হতে পারবেন।