মানুষের জীবন এক বহমান স্রোত, যেখানে সুখ-দুঃখ আর স্বস্তি-কষ্ট পালাক্রমে আসে। কখনো জীবনকে মনে হয় বসন্তের নির্মল বাতাস, আবার কখনো প্রতিটি দিন যেন পাহাড়সম বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
জীবনের এই কঠিন মুহূর্তগুলোয় বান্দার মনে স্বভাবত প্রশ্ন জাগে, এই দুনিয়ার প্রকৃত বাস্তবতা কী? কেন কেউ প্রাচুর্যের শিখরে থাকে, আর কেনই–বা কেউ অবিরাম পরীক্ষার সম্মুখীন হয়?
ইসলাম এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছে অত্যন্ত গভীর ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।
মুমিনের কারাগার ও কাফেরের জান্নাত
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফেরের জন্য জান্নাত।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২,৯৫৬, জামেউত তিরমিজি, হাদিস: ২,৩২৪)
এই হাদিস আমাদের সামনে দুনিয়া ও আখেরাতের বাস্তব চিত্রটি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে। কারাগারকে যেমন কোনো সুস্থ মানুষ তার স্থায়ী আবাস মনে করে না, তার মন সর্বদা ছটফট করে কখন সে আপন নিবাসে, পরম আকাঙ্ক্ষিত প্রিয় ঠিকানায় প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে পৌঁছাবে—ঠিক তেমন অবস্থাই বিরাজ করে একজন মুমিনের অন্তরে।
দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফেরের জন্য জান্নাত।
সে দুনিয়াকে একটি সাময়িক সরাইখানা মনে করে অপেক্ষা করে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের, যখন সে গুনাহে নিমজ্জিত এই নশ্বর ধরণি থেকে বিদায় নিয়ে পরম রবের সান্নিধ্যে পৌঁছাবে।
মুমিনের জন্য এই দুনিয়া কারাগার হওয়ার আরেকটি অর্থ হলো, কারাগারে যেমন কয়েদিকে জেলারের আইন মেনে চলতে হয়, নিজের ইচ্ছামতো সবকিছু করার সুযোগ থাকে না, তেমনি মুমিনকেও আল্লাহর দেওয়া বিধিবিধানের সীমানায় আবদ্ধ থাকতে হয়।
অন্যদিকে, কাফির বা অবিশ্বাসী যেহেতু পরকালে বিশ্বাস করে না, তাই সে তার প্রবৃত্তির চাহিদা অনুযায়ী দুনিয়াকে ভোগের বস্তু বানিয়ে নেয়। প্রকৃতপক্ষে দুনিয়ার জীবন আল্লাহ–তাআলার কাছে একটি মাছির ডানার চেয়েও মূল্যহীন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২,৩২০)
এই মূল্যহীন দুনিয়াতেই আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের যাচাই করেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করেন—কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ। তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।’ (সুরা মুলক, আয়াত: ২)
যাঁরা প্রকাশ্য কোনো বড় পাপে লিপ্ত নন, তবু তাঁদের জীবনে একের পর এক ঝড় আসতেই থাকে। এই ঝড়ের তীব্রতায় হতবিহ্বল হয়ে কেউ কেউ হয়তো বলে ফেলেন—‘আল্লাহ, আমার সঙ্গেই কেন বারবার এমনটা হচ্ছে?’
পরীক্ষার স্বরূপ ও মুমিনের অভিযোগ
জীবনপথে চলতে গিয়ে অসুস্থতা, আর্থিক ক্ষতি কিংবা মানসিক অস্থিরতা আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। মুমিনদের জন্য এসব বিপদ আসলে একেকটি পরীক্ষা এবং আত্মিক উন্নয়নের সোপান।
তবে এখানে আমাদের আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন—আমরা কি সত্যিই খাঁটি মুমিন হতে পেরেছি? আমাদের বিপদগুলো কি কেবলই পরীক্ষা, নাকি আমাদেরই কৃত পাপের সংশোধন?
অনেক মুমিন আছেন যাঁরা প্রকাশ্য কোনো বড় পাপে লিপ্ত নন, তবু তাঁদের জীবনে একের পর এক ঝড় আসতেই থাকে। এই ঝড়ের তীব্রতায় হতবিহ্বল হয়ে কেউ কেউ হয়তো বলে ফেলেন—‘আল্লাহ, আমার সঙ্গেই কেন বারবার এমনটা হচ্ছে?’
একজন প্রকৃত মুমিনের জন্য এ ধরনের অভিযোগ করা ঠিক নয়। এতে আল্লাহ–তাআলার ফয়সালার ওপর প্রশ্ন তোলা হয়। আল্লাহ তো জানিয়েছেন যে তিনি অবশ্যই পরীক্ষা নেবেন, ‘আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ ও প্রাণের ক্ষতি এবং ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। আর সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫)
পাপ থেকে মুক্তির মহৌষধ
বিপদ যেমন পরীক্ষা হতে পারে, তেমনি তা হতে পারে বান্দার পাপমুক্তির উপায়। কেউ যদি নিজের আমলের দিকে তাকিয়ে মনে করে—আমি অনেক পাপ করছি, তবে সে এই বিপদগুলোকে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে ভাবতে পারে।
এই শাস্তি আসলে তার চিরস্থায়ী কল্যাণের জন্য, যেন তাকে পরকালের ভয়াবহ শাস্তি ভোগ করতে না হয়।
মুমিন বান্দার যেকোনো ক্লান্তি, অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট, এমনকি উদ্বিগ্নতা কিংবা শরীরে কাঁটার সামান্য আঘাতের বিনিময়েও আল্লাহ–তাআলা তার পাপ ক্ষমা করে দেন।সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫,৬৪১
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন বান্দার যেকোনো ক্লান্তি, অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট, এমনকি উদ্বিগ্নতা কিংবা শরীরে কাঁটার সামান্য আঘাতের বিনিময়েও আল্লাহ–তাআলা তার পাপ ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫,৬৪১, সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২,৫৭৩)
বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘বিপদ-আপদ কেবল পাপ মোচন করে না, বরং এর মাধ্যমে মুমিনের মর্যাদা বৃদ্ধি পায় যদি সে ধৈর্য ধারণ করে।’ (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ১০/১০৫, দারুল মারিফা, বৈরুত)
তাই একজন মুসলিমের উচিত যখনই কোনো দুঃখ-কষ্ট আসবে, তখন এর বিনিময়ে আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা করা। যদি দুনিয়াতেই সামান্য কষ্ট ও অসুস্থতার মাধ্যমে পাপ থেকে বিশুদ্ধ হওয়া যায়, তবে সেই পাপ আর পরকালের কঠিন শাস্তি হিসেবে জমা থাকবে না—মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় সুসংবাদ আর কী হতে পারে?
ইসমত আরা : শিক্ষক ও লেখক