অজ্ঞতা ও জ্ঞানবিকৃতি: জাহালাতের স্বরূপ

ছবি: এআই / প্রথম আলো

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার জ্ঞানতত্ত্বে জাহালাতের আলোচনা ছাড়া ইলমের বোঝাপড়া কখনো পূর্ণ হতে পারে না। কারণ, জ্ঞান কেবল আলোর উপস্থিতি নয়; জাহালাত সেই অন্ধকার, যার মধ্যে আলো নিজের অর্থ হাসিল করে। যে দর্শন কেবল সত্যের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করে, কিন্তু অসত্যের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে পারে না, তার জ্ঞানতত্ত্ব নাতামাম থেকে যায়।

অতএব ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার সামনে একটি মৌলিক সওয়াল হাজির হয়—মানুষ কেন ভুল জানে? কেন সত্য হাজির থাকার পরও তাকে ইনকার করে? কেন একই কায়েনাত, একই ফিতরাত এবং একই ইনসানি অভিজ্ঞতার মধ্যে থেকেও মানুষ পরস্পরবিরোধী বাস্তবতার নির্মাণ করে? এমন প্রশ্নগুলোর উত্তর তলবই জাহালাতের দর্শনের মতলব।

এখানে একটি মৌলিক তফাত নির্ধারণ করে রাখি। অজ্ঞতা মানেই তথ্যের অভাব নয়। অনেক সময় মানুষ জানে না, কারণ জানার সুযোগ পায়নি; এটি জ্ঞানগত অপূর্ণতা। কিন্তু আরও গভীর একধরনের জাহালাত রয়েছে।

যেখানে জেনেও মানুষ সত্যকে বিকৃত করে, আংশিক সত্যকে পূর্ণ সত্য বলে দাবি করে, অথবা নিজের স্বার্থের অনুকূলে হাকিকতকে পুনর্নির্মাণ করে। প্রথমটি সীমাবদ্ধতা; দ্বিতীয়টি বিকৃতি। ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার প্রধান আলোচ্য এই দ্বিতীয় ক্ষেত্র। কারণ, মানবসভ্যতার বড় সংকটগুলো সাধারণত জ্ঞানের বিকৃতি থেকে পয়দা হয়।

ইতিহাসে বহু বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান অর্থনৈতিক স্বার্থে গোপন করা হয়েছে, বহু ধর্মীয় ব্যাখ্যা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য পরিবর্তিত হয়েছে, বহু ঐতিহাসিক বয়ান বিজয়ীদের দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্লিখিত হয়েছে।

এই দর্শনে জাহালাতকে দেখে অস্তিত্বগত ভারসাম্যচ্যুতি হিসেবে। মানুষ কেবল চিন্তার সত্তা নয়; তার সত্তায় আছে নফস, আকল, ক্বালব, ফিতরাত এবং সামাজিক অভিজ্ঞতার মজমা। এই স্তরগুলোর কোনো একটি যখন তার যথার্থ মাকাম অতিক্রম করে অন্য স্তরকে গ্রাস করতে চায়, তখন জ্ঞানের মিজিন বিপন্ন হয়।

ফলে ভুল সিদ্ধান্তের সূচনা ঘটে মানুষের অস্তিত্বের অভ্যন্তরেই। এ কারণে আল কোরআনের ভাষায়, জাহালাত অনেক সময় আখলাকি বিচ্যুতির সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ, সত্যকে জানার ক্ষমতা হারানোর আগে কোনো কোনো মানুষ সত্যকে কবুলের ইচ্ছাই হারিয়ে ফেলে।

আরও পড়ুন

এখানে নফসের ভূমিকা মৌলিক। নফস মানুষের প্রয়োজন, প্রত্যাশা ও আত্মরক্ষার মরকজ। কিন্তু যখন সে নিজের সীমা অতিক্রম করে, তখন সে হাকিকতকে নিজের ইচ্ছামতো দেখতে ও দেখাতে শুরু করে। তখন মানুষ সত্যকে অনুসরণ করে না; বরং এমন সত্য নির্বাচন করে, যা তার নফসানিয়াতকে জায়েজ বানায়।

ফলে জাহালাতের সূচনা হয় তথ্য বিকৃতির উসিলায় যতটা, ইচ্ছার বিকৃতির মাধ্যমে তার চেয়ে বেশি। আকল তখন আর বিচারক থাকে না; নফসের উকিলে পরিণত হয়। মানুষ যুক্তি ব্যবহার করে পূর্বনির্ধারিত অবস্থানকে রক্ষা করার জন্য। এ অবস্থায় জ্ঞান আত্মপক্ষসমর্থনের উপকরণে পরিণত হয়।

জাহালাতের আরেকটি উৎস ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা। ক্ষমতা শুধু রাজনৈতিক নয়; জ্ঞানগত ক্ষমতাও মানুষের মধ্যে আধিপত্যের প্রবণতা পয়দা করে। যখন কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা স্কুল ঘোষণা করে যে বাস্তবতার বৈধ ব্যাখ্যা একমাত্র তার হাতেই ন্যস্ত, তখন জ্ঞান ধীরে ধীরে মতাদর্শে রূপান্তরিত হয়।

মতাদর্শের প্রধান খাসলত হলো, সে প্রথমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, পরে দলিল তালাশ করে। অথচ ইলমের স্বভাব এর বিপরীত; সে প্রথমে হাকিকতকে জানে, তারপর ফয়সালায় পৌঁছায়। অতএব জ্ঞানবিকৃতির একটি বড় কারণ হলো জ্ঞানকে ক্ষমতার যন্ত্রে পরিণত করা।

তথ্যের প্রাচুর্যকে অনেকেই জ্ঞানের সমার্থক বলে ধরে নিচ্ছে। অথচ তথ্যের সঞ্চয় এবং প্রজ্ঞার বিকাশ এক বিষয় নয়। ডিজিটাল অ্যালগরিদম মানুষের মনোযোগকে তার পূর্বপছন্দে আবদ্ধ রাখে।

লোভও জাহালাতের একটি সূক্ষ্ম উৎস। সম্পদের পাশাপাশি মর্যাদা, খ্যাতি, প্রভাব ও নিরাপত্তার জন্যও মানুষ বাস্তবতাকে বিকৃত করে।

ইতিহাসে বহু বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান অর্থনৈতিক স্বার্থে গোপন করা হয়েছে, বহু ধর্মীয় ব্যাখ্যা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য পরিবর্তিত হয়েছে, বহু ঐতিহাসিক বয়ান বিজয়ীদের দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্লিখিত হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে জ্ঞানের সংকট তথ্যগত নয়; নৈতিক। সত্য উপস্থিত ছিল, কিন্তু স্বার্থ তার ওপর পর্দা বিস্তার করেছে।

ফলে জাহালাত বহু সময় মিথ্যার উৎপাদন নয়; সত্যের নিজস্ব নির্বাচন।

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা আদর্শিক পক্ষপাতকেও জ্ঞানবিকৃতির একটি শক্তিশালী কারণ হিসেবে দেখে। প্রত্যেক মানুষ একটি ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও চিন্তার পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠে। এই পরিমণ্ডল তাকে জগৎ বোঝার একটি কাঠামো দেয়, যা অপরিহার্য।

কিন্তু সেই কাঠামো যখন নিজেকে চূড়ান্ত বাস্তবতা বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন মানুষ এমন সব তথ্যও এনকার করে, যা তার পূর্বধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ অবস্থায় মানুষ সত্যকে না দেখে নিজের মানসিক মানচিত্রকে দেখে। ফলে জাহালাত শুধু অন্ধত্ব নয়; নির্বাচিত দৃষ্টিশক্তি।

জ্ঞানগত তাকাব্বুরি জাহালাতের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপগুলোর একটি। মানুষ যখন মনে করে যে তার হাসিল জ্ঞানই বাস্তবতার চূড়ান্ত ব্যাখ্যা, তখন তার শেখার ক্ষমতা ক্ষীণ হতে থাকে। সে সওয়ালকে ভয় পায়, ইসলাহকে (সংশোধন) অপমান মনে করে এবং হককে হুমকি হিসেবে দেখে। এই অহংকার ব্যক্তি, সম্প্রদায় এবং সভ্যতার সব তবকায় জন্ম নিতে পারে।

আরও পড়ুন

অথচ প্রকৃত ইলমের বৈশিষ্ট্য হলো, সে নিজের অসম্পূর্ণতা সম্পর্কে সচেতন থাকে। জাহালাতের খাসলত হলো, সে নিজেকে পরিপূর্ণ মনে করে। তাই অনেক সময় অজ্ঞ মানুষ জানে না যে সে জানে না; সে নিশ্চিত থাকে, সে সব জানে। এই আত্মনিশ্চয়তাই জাহালাতকে দীর্ঘস্থায়ী বানায়।

হালে প্রযুক্তি জাহালাতের একটি নতুন রূপ পয়দা করেছে। তথ্যের প্রাচুর্যকে অনেকেই জ্ঞানের সমার্থক বলে ধরে নিচ্ছে। অথচ তথ্যের সঞ্চয় এবং প্রজ্ঞার বিকাশ এক বিষয় নয়। ডিজিটাল অ্যালগরিদম মানুষের মনোযোগকে তার পূর্বপছন্দে আবদ্ধ রাখে।

ফলে মানুষ ক্রমশ এমন এক জগতে বসবাস করতে থাকে, যেখানে সে কেবল নিজের বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি শুনতে পায়। এই প্রযুক্তিগত গুমরাহি মানুষের সামনে বাস্তবতার নির্বাচিত খণ্ডাংশ হাজির করে।

ধীরে ধীরে মানুষ তথ্যসমৃদ্ধ হয়েও লোকেরা সত্যবিমুখ হতে থাকে। এই হালতকে ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা নতুন ধরনের জাহালাত হিসেবে বিবেচনা করবে, যেখানে তথ্যের প্রাচুর্যই অনেক সময় হয়ে ওঠে হিকমাহর সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক।

যে হৃদয় সত্যকে কবুল করতে প্রস্তুত নয়, তার কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণও অকার্যকর। আবার যে হৃদয় সত্যের জন্য বিনয়ী, সে সীমিত তথ্য থেকেও সঠিক হেদায়েত হাসিল করতে পারে।

তবে জাহালাতের সবচেয়ে গভীর স্তর হলো ফিতরাতের নিস্তব্ধতা। মানুষ যখন বারবার সত্যকে ইনকার করে, অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে কবুল করে এবং নিজের আখলাকি সংবেদনশীলতাকে উপেক্ষা করে, তখন তার অন্তর্গত সাক্ষ্য কমজোর হয়ে পড়ে।

সে তখন কেবল ভুল জানে না; ভুলকে স্বাভাবিক বলেও ভাবতে থাকে। এ অবস্থায় জাহালাত অস্তিত্বগত অভ্যাসে পরিণত হয়। তখন মানুষের বাহ্যিক জ্ঞান বৃদ্ধি পেলেও তার অন্তর্দৃষ্টি সংকুচিত হতে থাকে।

এ কারণেই ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় জাহালাতের প্রতিষেধক শুধু আরও বেশি তথ্য নয়। তথ্য অজ্ঞতার একটি অংশ দূর করতে পারে; কিন্তু জ্ঞানবিকৃতি দূর করার জন্য প্রয়োজন তাজকিয়াহ, নৈতিক শুদ্ধি, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা, সমালোচনামূলক আত্মসমীক্ষা এবং সত্যের প্রতি আন্তরিক আনুগত্য।

কারণ, যে হৃদয় সত্যকে কবুল করতে প্রস্তুত নয়, তার কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণও অকার্যকর। আবার যে হৃদয় সত্যের জন্য বিনয়ী, সে সীমিত তথ্য থেকেও সঠিক হেদায়েত হাসিল করতে পারে।

অতএব ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার ভাষায় জাহালাত শুধু জ্ঞানের বিপরীত দশা নয়; জাহালাত হচ্ছে জ্ঞানের নেজাম থেকে বিচ্যুতি। আকলের পরাজয়টাই জাহালাত নয়, সে হচ্ছে আকল, নফস, ক্বালব ও ফিতরাতের মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার নতিজা।

ফলে ইলমের প্রকৃত গরজ মানুষের ভেতরের সেই মিজান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, যার মাধ্যমে সে হাকিকতকে সেভাবেই গ্রহণ করবে, হাকিকত ঠিক যেভাবে আছে। এই মিজান মানুষকে জাহালাত থেকে হিকমাহর দিকে, বিভ্রম থেকে হাকিকতের দিকে এবং আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা থেকে আমানতদারির চেতনার দিকে নিয়ে যায়।

আরও পড়ুন