বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বর্তমান বিশ্বের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশনে ভুগছে। ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা, একাকীত্ব কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েন আমাদের মানসিক শান্তি কেড়ে নিচ্ছে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান কাউন্সেলিং ও থেরাপির কথা বলছে। তবে ইসলাম দেড় হাজার বছর আগে মনের প্রশান্তির জন্য কিছু কার্যকর অভ্যাসের কথা শিখিয়েছে। মানসিক অস্থিরতা জয়ে ইসলামের ১০টি সূত্র দেওয়া হলো:
১. কৃতজ্ঞতাবোধ
মানুষ যখন যা নেই তা নিয়ে আফসোস করে, তখনই বিষণ্নতা বাড়ে। ইসলাম শিখিয়েছে যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞ হতে। মনোবিজ্ঞানীরা একে এখন ‘গ্র্যাটিচিউড জার্নাল’ বা ইতিবাচক চিন্তা বলছেন।
আল্লাহ বলেছেন, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তবে আমি তোমাদের নেয়ামত আরও বাড়িয়ে দেব।” (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৭)
২. বর্তমান মুহূর্তে বেঁচে থাকা
অতীতের দুঃখ আর ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তাই বিষণ্নতার মূল কারণ। নবীজি (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন কেবল বর্তমান দিনের ওপর গুরুত্ব দিতে।
তিনি প্রার্থনা করতেন, “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-বেদনা থেকে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৮৯৩)
৩. ধৈর্য ও নামাজের সমন্বয়
বিপদে পড়লে বিচলিত না হয়ে ধীরস্থিরভাবে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা মানসিক শক্তি জোগায়। এটি একটি চমৎকার ‘কোপিং মেকানিজম’।
আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪৫)
৪. প্রাপ্তিতে সন্তুষ্টি
অন্যের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করা মানসিক অশান্তির বড় কারণ। যা পাওয়া গেছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকাই হলো প্রকৃত সুখ।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা তোমাদের চেয়ে নিম্নস্তরের লোকদের দিকে তাকাও (যারা কষ্টে আছে), তোমাদের চেয়ে উচ্চস্তরের লোকদের দিকে তাকাও না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৬৩)
৫. আল্লাহর স্মরণ
আল্লাহর স্মরণ (জিকির) মস্তিষ্ককে শান্ত রাখে এবং এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে, যা দুশ্চিন্তা কমায়।
আল্লাহর বলেছেন, “জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই কেবল অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।” (সুরা রাদ, আয়াত: ২৮)
৬. একাকীত্ব বর্জন
ডিপ্রেশনের রোগী নিজেকে গুটিয়ে নেয়। ইসলাম জামাতে নামাজ পড়া এবং সামাজিক মেলামেশার মাধ্যমে একাকীত্ব দূর করার শিক্ষা দেয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর হাত (সাহায্য) জামাতের (একতাবদ্ধ থাকা) ওপর থাকে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৬৬)
৭. ক্ষমা করার মানসিকতা
কারো প্রতি ঘৃণা বা ক্ষোভ পুষে রাখলে নিজেরই মানসিক চাপ বাড়ে। ক্ষমা করে দিলে মন হালকা হয় এবং মানসিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।
আল্লাহ বলেছেন, “আর যদি তোমরা ক্ষমা করো, তবে আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু।” (সুরা তাগাবুন, আয়াত: ১৪)
৮. সুধারণা পোষণ
মানুষের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা বা সন্দেহ পোষণ করলে মানসিক শান্তি নষ্ট হয়। সবসময় ইতিবাচক ধারণা রাখার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম।
আল্লাহ বলেছেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক ধারণা করা থেকে বেঁচে থাকো; কারণ কিছু ধারণা পাপের কাজ।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)
৯. প্রকৃতির সান্নিধ্য
প্রকৃতি ও সবুজের মাঝে সময় কাটানো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ উপকারী। কোরআনে পাহাড়, বাগান ও আকাশ নিয়ে চিন্তার বহু আহ্বান রয়েছে।
আল্লাহ বলেছেন, “তারা কি তাদের ওপরের আকাশের দিকে তাকায় না—আমি কীভাবে তা নির্মাণ করেছি ও সুশোভিত করেছি?” (সুরা কাফ, আয়াত: ৬)
১০. তাকদিরে বিশ্বাস
চেষ্টার পর ফলাফল যা-ই হোক, তা মেনে নেওয়ার মানসিকতা মানুষকে বড় ধরনের ট্রমা থেকে বাঁচিয়ে দেয়। এটি মানসিক নিরাপত্তার শ্রেষ্ঠ রক্ষাকবচ।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর ফয়সালা মুমিনের জন্য কল্যাণকর। যদি সে সুখ পায় তবে শোকর করে, আর যদি দুঃখ পায় তবে ধৈর্য ধরে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)
ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়, এটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। আধুনিক মানসিক সমস্যার সমাধানে ইসলামী জীবনদর্শন হতে পারে আমাদের শ্রেষ্ঠ সহায়। উপরের সূত্রগুলো চর্চা করলে মনের অস্থিরতা কমে প্রশান্তি ফিরে আসবে।