ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত ৬টি ভুল ধারণা

ছবি: পেক্সেলস

ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই এর মূল শিক্ষা, দর্শন ও মূলনীতির বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের অভাব, একপেশে গণমাধ্যম এবং পক্ষপাতমূলক বয়ানের কারণে অনেকের মনেই ইসলাম সম্পর্কে নানা ভ্রান্ত ধারণা বাসা বেঁধেছে।

অনেকে মনে করেন ইসলাম বুঝি সহিংসতা উসকে দেয়, নারীর অধিকার খর্ব করে, কোরআন মানুষের রচিত সাহিত্য কিংবা ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট জাতির শ্রেষ্ঠত্বকে সমর্থন করে।

অথচ বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিতে সত্য অনুসন্ধান করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এসব প্রচারণা ইসলামের মূল শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রচলিত এমন ছয়টি ভুল ধারণা ও তার নেপথ্য সত্য নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

‘আল্লাহ’ কোনো বিশেষ গোত্রীয় দেবতার নাম নয়; এটি একটি আরবি শব্দ, যা মূলত ‘আল-ইলাহ’ থেকে এসেছে। আরবিভাষী খ্রিষ্টান ও ইহুদিরাও স্রষ্টা বোঝাতে প্রাচীনকাল থেকেই ‘আল্লাহ’ শব্দ ব্যবহার করে আসছেন।

১. আল্লাহ কি কোনো বিশেষ জাতির দেবতা

ইসলাম সম্পর্কে একটি বহুল প্রচলিত অপপ্রচার হলো, ‘আল্লাহ’ নাকি কোনো বিশেষ উপজাতীয় বা প্রাচীন আরবের ‘চাঁদের দেবতা’ (মুন গড)। এটি মূলত ভাষাতাত্ত্বিক অজ্ঞতা ও ঐতিহাসিক সত্য বিকৃতির ফল।

‘আল্লাহ’ কোনো বিশেষ গোত্রীয় দেবতার নাম নয়; এটি একটি আরবি শব্দ, যা মূলত ‘আল-ইলাহ’ (একমাত্র ইবাদতের উপযুক্ত) থেকে এসেছে। আরবিভাষী খ্রিষ্টান ও ইহুদিরাও স্রষ্টা বোঝাতে প্রাচীনকাল থেকেই ‘আল্লাহ’ শব্দ ব্যবহার করে আসছেন।

পবিত্র কোরআনের শুরুতেই সার্বজনীন রবের পরিচয় দিয়ে বলা হয়েছে, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক।’ (সুরা ফাতিহা, আয়াত: ২)

তিনি কেবল কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রভু নন; তিনি সমগ্র সৃষ্টির একক অধিপতি। একইভাবে কাবার দিকে মুখ করে নামাজ পড়া কোনো প্রতিমা বা পাথরপূজা নয়; বরং এটি বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের ভৌগোলিক ও আত্মিক ঐক্যের এক অনন্য প্রতীক। মুসলিমরা কখনো কাবার ইবাদত করে না, বরং কাবার একমাত্র রবের ইবাদত করে।

২. মুহাম্মদ (সা.) কি সাম্রাজ্যবাদী শাসক ছিলেন

ইতিহাসে বহু অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন মহানবী মুহাম্মদ (সা.)। কোনো কোনো মহলে তাঁকে তরবারির জোরে ধর্ম প্রচারকারী কিংবা নিছক রাজনৈতিক শাসক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

অথচ ঐতিহাসিক সত্য হলো, মক্কার চরমতম নির্যাতন ও ১৩ বছরের অবর্ণনীয় কষ্টের মুখেও তিনি অহিংসার পথ ত্যাগ করেননি। মদিনায় তিনি যে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, তার মূল ভিত্তি ছিল পারস্পরিক চুক্তি, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা।

আরও পড়ুন

আল্লাহ–তাআলা নবীজিকে সমগ্র পৃথিবীর জন্য করুণার দূত হিসেবে ঘোষণা করে বলেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭)

তাঁর বিনয়, সততা, শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে ক্ষমা করার মানসিকতা এবং চরিত্রমাধুর্যই কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছিল।

৩. কোরআন কি মানুষের রচিত সাহিত্য

কোরআনের উৎস নিয়ে বিরোধীরা বারবার বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছে। কখনো দাবি করা হয়েছে এটি মুহাম্মদের স্বরচিত কাব্য, কখনো বলা হয়েছে এটি পূর্ববর্তী তাওরাত বা ইঞ্জিলের রূপান্তর।

অথচ ঐতিহাসিক সত্য হলো মহানবী (সা.) ছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন ‘উম্মি’। পবিত্র কোরআন কোনো মানুষের চিন্তা নয়, বরং ফেরেশতা জিবরাইলের মাধ্যমে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে নাজিল হওয়া মহান আল্লাহর বাণী।

ইসলামে একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষা করাকে সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষার সমতুল্য এবং একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করাকে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার সমান অপরাধ ঘোষণা করা হয়েছে।

কোরআনের সাহিত্য মান ও অলৌকিক চ্যালেঞ্জ আজও অক্ষুণ্ণ। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আমি আমার বান্দার ওপর যা নাজিল করেছি, তাতে যদি তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকে, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সুরা রচনা করে নিয়ে এসো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৩)

যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর কোনো ভাষাবিদ বা সাহিত্যিক কোরআনের একটি ছোট সুরার সমতুল্য কিছু রচনা করতে পারেনি। আল্লাহ নিজেই এই গ্রন্থ সংরক্ষণের নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এই কোরআন নাজিল করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।’ (সুরা হিজর, আয়াত: ৯)

৪. ইসলাম কি সহিংসতার সমর্থক

বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে ইসলামকে প্রায়ই ‘উগ্রবাদ’ ও সন্ত্রাসের সমার্থক হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ ‘ইসলাম’ শব্দের মূল ধাতুই হলো ‘সিলম’, যার অর্থ শান্তি ও আত্মসমর্পণ।

কোরআনে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের যে বিধান এসেছে, তা সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্যাতিত মানুষের সুরক্ষা ও আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য অবতীর্ণ হয়েছিল। জোরপূর্বক কাউকে ধর্মান্তরিত করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।

আরও পড়ুন

কোরআনের ঘোষণা, ‘ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জোরজবরদস্তি নেই।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫৬)

ইসলামে একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষা করাকে সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষার সমতুল্য এবং একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করাকে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার সমান অপরাধ ঘোষণা করা হয়েছে। (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৩২)

৫. ইসলাম কি নারীকে শৃঙ্খলিত করে

সপ্তম শতকে যখন গোটা বিশ্বে নারীকে ভোগ্য পণ্য মনে করা হতো এবং কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, তখন ইসলাম নারীকে স্বাধীন সত্তা, সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার, শিক্ষার অধিকার ও সামাজিক মর্যাদার এক যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছিল।

ইসলামের প্রথম ইমানদার ব্যক্তিত্ব খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.) ছিলেন তৎকালীন আরবের অন্যতম সফল ও স্বাধীন নারী উদ্যোক্তা।

পর্দা বা শালীন পোশাক নারীকে দমনের জন্য নয়, বরং জনপরিসরে নারীর নিরাপত্তা, স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদার সুরক্ষা কবচ। রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫)

কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আর কোনো আরবের ওপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই; সাদার ওপর কালোর কিংবা কালোর ওপর সাদার কোনো প্রাধান্য নেই—শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি।
মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৪৮৯

৬. ইসলামে কি বর্ণ ও বংশীয় বৈষম্য রয়েছে

গায়ের রং বা বংশমর্যাদার ভিত্তিতে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করা জাহেলি যুগের মানসিকতা। ইসলাম জন্মসূত্রে শ্রেষ্ঠত্বের এই ধারণাকে সমূলে উৎপাটিত করেছে। দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে কৃষ্ণাঙ্গ সাহাবি বেলাল (রা.)-কে ইসলাম মদিনার প্রধান মুয়াজ্জিন এবং উম্মাহর সম্মানিত নেতার আসনে আসীন করেছিল।

বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে মহানবী (সা.) বর্ণবাদের যবনিকা ঘোষণা করে বলেন, ‘কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আর কোনো আরবের ওপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই; সাদার ওপর কালোর কিংবা কালোর ওপর সাদার কোনো প্রাধান্য নেই—শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৪৮৯)

ইসলাম কোনো সংকীর্ণ আচার বা সহিংসতার মতবাদ নয়; বরং তা শান্তি, সাম্য, নৈতিকতা ও মানবিক মর্যাদার এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। একপেশে প্রচারণার দেয়াল ভেঙে বস্তুনিষ্ঠভাবে কোরআন ও রাসুলের সুন্নাহর গভীর পাঠই পারে এই সত্যকে অনুধাবন করাতে।

আরও পড়ুন