বিবাহ করার আগে মুমিনের ৩ আত্মজিজ্ঞাসা

ইসলামে বিবাহ শুধু একটি সামাজিক চুক্তি কিংবা মানসিক আবেগের বিষয় নয়; এটি এক মহান ইবাদাত এবং পবিত্র আমানত। পবিত্র কোরআনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়াকে একটি সুদৃঢ় অঙ্গীকার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

একটি বরকতময় ও শান্তিময় দাম্পত্য জীবনের জন্য ইসলাম শুধু বয়সের প্রাপ্তিকে যথেষ্ট মনে করে না; বরং আত্মিক, মানসিক ও ফিকহি প্রস্তুতির ওপর বিশেষ জোর দেয়।

বিবাহে পদার্পণ করার পূর্বে একজন মুমিনের নিজের কাছে যে ৩টি মৌলিক প্রশ্ন ও তার প্রস্তুতি নিশ্চিত করা আবশ্যক।

১. বিয়ের সামর্থ্য কি আমার আছে?

মহানবী (সা.) বলেছেন, “হে যুবসমাজ, তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে। কারণ বিবাহ চোখের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত রাখে। আর যে সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে; কেননা রোজা তার জন্য ঢালস্বরূপ।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৬)

বিবাহের ক্ষেত্রে শুধু পাত্র-পাত্রী উভয়ই নামকাওয়াস্তে মুসলিম হওয়া যথেষ্ট নয়; বরং উভয়ের ধর্মীয় মূল্যবোধ, রুচি এবং আচরণের মধ্যে শরিয়তসম্মত সামঞ্জস্য বা ‘কুফু’ থাকা আবশ্যক।
আরও পড়ুন

ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় ‘সামর্থ্য’ শুধু শারীরিক সক্ষমতা বা অর্থোপার্জনকে বোঝায় না। শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণে এর পরিধি তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল:

  • আর্থিক দায়িত্ব: স্ত্রীর উপযুক্ত খোরপোষ, নিরাপদ বাসস্থান এবং দেনমোহর সম্মানের সাথে আদায় করার মতো হালাল আয়ের ব্যবস্থা থাকা।

  • চরিত্রগত পরিপক্বতা: রাগ, ক্ষোভ ও আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে পরিবারকে শরিয়তের সীমারেখার মধ্যে পরিচালনা করার মতো আত্মিক শক্তি।

  • হেদায়েত ও তদারকি: নিজেকে এবং নিজের হবু পরিবারকে কবিরা গুনাহ ও জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করার মানসিক ও আমলগত মানসিকতা অর্জন করা।

২. বিয়েটা কি সুসামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে?

বিবাহের ক্ষেত্রে শুধু পাত্র-পাত্রী উভয়ই নামকাওয়াস্তে মুসলিম হওয়া যথেষ্ট নয়; বরং উভয়ের ধর্মীয় মূল্যবোধ, রুচি এবং আচরণের মধ্যে শরিয়তসম্মত সামঞ্জস্য বা ‘কুফু’ থাকা আবশ্যক।

মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, “সাধারণত চারটি গুণের কারণে নারীকে বিবাহ করা হয়: তার ধন-সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য এবং তার দ্বীনদারি। সুতরাং তুমি ধার্মিক নারীকে বিবাহ করে কামিয়াব হও, অন্যথায় তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০ ৯০)

আরও পড়ুন
আর নারীদেরও তেমনি ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের ওপর পুরুষদের দায়িত্ব রয়েছে; তবে নারীদের ওপর পুরুষদের একটি মর্যাদাগত প্রাপ্তি রয়েছে।
সুরা বাকারা, আয়াত: ২২৮

অন্য হাদিসে চরিত্রের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে, “তোমাদের কাছে যদি এমন কোনো পাত্রের বিবাহের প্রস্তাব আসে, যার দ্বীনদারি ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তবে তার সাথে বিবাহ সম্পাদন করো। তা না করলে পৃথিবীতে চরম ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১০৮৪)

৩. আমি কি দাম্পত্য অধিকারের জ্ঞান অর্জন করেছি?

অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে না জেনে বিবাহে আবদ্ধ হওয়া অনেক সময় না জেনে জুলুম ও শরিয়তের অধিকার লঙ্ঘনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যই পরস্পরের হক সম্পর্কে সঠিক ইলম অর্জন করা অবশ্য কর্তব্য।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, “আর নারীদেরও তেমনি ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের ওপর পুরুষদের দায়িত্ব রয়েছে; তবে নারীদের ওপর পুরুষদের একটি মর্যাদাগত প্রাপ্তি রয়েছে।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২২৮)

তিনি আরও আদেশ করেন, “তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সঙ্গে সৎ ও উত্তম উপায়ে জীবনযাপন করো। আর যদি তোমরা তাদের অপছন্দ করো, তবে হতে পারে তোমরা এমন একটি জিনিসকে অপছন্দ করছ, যার মধ্যে আল্লাহ অশেষ কল্যাণ রেখেছেন।” (সুরা নিসা, আয়াত: ১৯)

সুতরাং বিয়ের আগে একজন মুমিনের আত্ম-জিজ্ঞাসা হবে,  স্বামীর ওপর স্ত্রীর এবং স্ত্রীর ওপর স্বামীর কী কী শরিয়তসম্মত অধিকার ও বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা কি আমি স্পষ্টভাবে জানি? দাম্পত্য জীবনে মতভেদের সৃষ্টি হলে শরিয়ত নির্দেশিত হিকমত, ধৈর্য, নসিহত ও পরামর্শের মাধ্যমে সমাধানের মানসিকতা আমার আছে তো?

বিবাহের মতো পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পূর্বে এই তিনটি শাস্ত্রীয় মানদণ্ডে নিজেকে ঝালিয়ে নেওয়া এবং আল্লাহর কাছে ‘ইস্তিখারা’ ও দোয়া করার মাধ্যমেই শুধু বরকতময় দাম্পত্য জীবনের সূচনা করা সম্ভব।

আরও পড়ুন