হজের সফরের প্রতিটি মোড়ে, ইহরাম থেকে শুরু করে আরাফাতের ময়দান পর্যন্ত, রাসুল (সা.) আমাদের নির্দিষ্ট কিছু দোয়া ও জিকির শিখিয়েছেন। যদিও হজের সফরে নিজের ভাষায় যেকোনো বৈধ দোয়া করা যায়, তবুও নবীজি তাঁর সাহাবিদের থেকে বর্ণিত হাদিসসমর্থিত দোয়াগুলোর ফজিলত ও গুরুত্ব অপরিসীম।
নিচে হজের সফরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিক ও প্রয়োজনীয় দোয়াগুলোর উচ্চারণ ও অর্থ তুলে ধরা হলো:
১. হজযাত্রীকে বিদায় দেওয়ার দোয়া
হজের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় যারা বাড়িতে অবস্থান করছেন (পরিবার-পরিজন বা প্রতিবেশী), তাদের উদ্দেশে আল্লাহর রাসুল (সা.) এই দোয়াটি পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন:
উচ্চারণ: আসতাওদিউকুমুল্লা হাল্লাজি লা তাদিউ ওয়াদাইউহু।
অর্থ: আমি আপনাদের আল্লাহর হেফাজতে সঁপে যাচ্ছি, যাঁর আমানত বা হেফাজতকৃত জিনিস কখনো নষ্ট হয় না। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৮২৫)
২. যানবাহনে আরোহণের পর
যখন হজযাত্রী গাড়ি, বিমান বা অন্য কোনো যানবাহনে চড়বেন, তখন তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলে এই দীর্ঘ দোয়াটি পড়বেন:
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাজি সাখখারা লানা হাজা ওমা কুন্না লাহু মুকরিনিন, ওয়া ইন্না ইলা রাব্বিনা লামুনকালিবুন। আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকা ফী সাফারিনা হাজাল বিররা ওয়াত তাকওয়া, ওয়ামিনাল আমালি মা তারদা। আল্লাহুম্মা হাওউইন আলাইনা সাফারানা হাজা ওয়াতউই আন্না বুদাহু। আল্লাহুম্মা আনতাস সাহিবু ফিস সাফারি ওয়াল খালিফাতু ফিল আহলি। আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিন ওয়াছাইস সাফারি ওয়া কাআবাতিল মানজারি ওয়া সূইল মুনকালাবি ফিল মালি ওয়াল আহলি ওয়াল ওয়ালাদি।
অর্থ: পবিত্র সেই সত্তা, যিনি এগুলোকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, অথচ আমরা এগুলোকে বশ করতে সক্ষম ছিলাম না। আর আমরা অবশ্যই আমাদের প্রতিপালকের দিকে প্রত্যাবর্তন করব। হে আল্লাহ, আমরা আমাদের এই সফরে আপনার কাছে পুণ্য ও তাকওয়া এবং এমন আমল প্রার্থনা করছি যা আপনি পছন্দ করেন। হে আল্লাহ, আমাদের জন্য এই সফরকে সহজ করে দিন এবং এর দূরত্বকে কমিয়ে দিন। হে আল্লাহ, আপনিই আমাদের সফরের সঙ্গী এবং আমাদের অবর্তমানে পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণকারী। হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে সফরের কষ্ট-ক্লেশ, মলিন বা দুঃখজনক দৃশ্য দেখা এবং পরিবার, সম্পদ ও সন্তানের অমঙ্গলজনক পরিবর্তন থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৪২)
৩. ইহরাম বাঁধার পর তালবিয়া
মিকাত বা নির্দিষ্ট স্থান থেকে হজের নিয়তে ইহরাম পরিধানের পর পুরুষদের জন্য উচ্চস্বরে এবং নারীদের জন্য নিচু স্বরে এই তালবিয়া পাঠ করা হজের অন্যতম প্রধান শ্লোগান:
উচ্চারণ: লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইননাল হামদা ওয়ান নিয় মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।
অর্থ: আমি হাজির হে আল্লাহ, আমি হাজির! আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির! নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা, নেয়ামত এবং রাজত্ব একমাত্র আপনারই; আপনার কোনো শরিক নেই। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৪৯)
৪. মক্কার মসজিদুল হারামে প্রবেশের দোয়া
পবিত্র মক্কার সীমানায় এবং মসজিদে হারামে ডান পা দিয়ে প্রবেশের সময় এই দোয়াটি পড়া সুন্নত:
উচ্চারণ: আউজু বিল্লাহিল আজিম, ওয়া বি-ওয়াজহিহিল কারিম, ওয়া সুলতানিহিল কাদিমি মিনাশ শাইতানির রাজিম। বিসমিল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসুলিল্লাহ। আল্লাহুম্মাগফির লি জুনুবি ওয়াফতাহ লি আবওয়াবা রাহমাতিক।
অর্থ: আমি মহান আল্লাহর কাছে, তাঁর সম্মানিত সত্তার কাছে এবং তাঁর অনাদি ক্ষমতার ওসিলায় বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। আল্লাহর নামে শুরু করছি, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর এবং আল্লাহর রাসুলের ওপর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক। হে আল্লাহ, আমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন এবং আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাসমূহ খুলে দিন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৬৬)
৫. প্রথমবার কাবা শরিফ দেখার দোয়া
কাবা শরিফের ওপর প্রথম নজর পড়ার সময় অত্যন্ত আবেগ ও ভক্তিভরে এই দোয়াটি পাঠ করা উচিত:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা জিদ হাজাল বাইতা তাশরিফাও ওয়া তাজিমাও ওয়া তাকরিমাও ওয়া মাহাবাহ, ওয়া জিদ মান শাররাফাহু ওয়া কাররামাহু মিম্মান হাজ্জাহু আও ইত আমারাহু তাশরিফাও ওয়া তাকরিমাও ওয়া তাজিমাও ওয়া বিররা। আল্লাহুম্মা আন্তাস সালাম, ওয়া মিনকাস সালাম, ফাহাইয়্যিনা রাব্বানা বিস সালাম।
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি এই ঘরের মর্যাদা, সম্মান, মহিমা ও গাম্ভীর্য আরও বাড়িয়ে দিন। আর যারা হজ বা ওমরাহ করার মাধ্যমে এই ঘরের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করে, তাদের মর্যাদা, সম্মান, মহিমা ও পুণ্য আরও বৃদ্ধি করে দিন। হে আল্লাহ! আপনিই শান্তি এবং আপনার পক্ষ থেকেই শান্তি আসে। অতএব হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের শান্তিময় জীবন দান করুন। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ, হাদিস: ১২৮১০)
৬. তাওয়াফের সময় দোয়া
কাবা শরিফ তাওয়াফ করার সময় প্রতিটি চক্করে রুকনে ইয়ামানি (কাবার তৃতীয় কোণ) থেকে হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) পর্যন্ত যাওয়ার সময় রাসুল (সা.) এই কোরআনে দোয়াটি বেশি বেশি পড়তেন:
উচ্চারণ: রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আজাবান নার।
অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং পরকালেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২০১; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৮৯২)
৭. সাঈ করার দোয়া
সাঈ শুরু করার সময় সাফা পাহাড়ে এবং পরে মারওয়া পাহাড়ে ওঠার সময় প্রথমে কোরআনের এই আয়াতটি পড়বেন, “ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শাআইরিল্লাহ…” (নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত)। এরপর বলবেন—(আবদাউ বিমা বাদাআল্লাহু বিহি) অর্থাৎ, “আল্লাহ যা দিয়ে শুরু করেছেন, আমিও তা দিয়ে শুরু করছি।”
এরপর কাবার দিকে মুখ করে দুই হাত তুলে তিনবার এই তাসবিহ ও দোয়া:
উচ্চারণ: আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, আনজাজা ওয়াদাহু, ওয়া নাসারা আবদাহু, ওয়া হাজামাল আহজাবা ওয়াহদাহ।
অর্থ: আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব একমাত্র তাঁরই এবং সমস্ত প্রশংসাও তাঁর। তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি তাঁর ওয়াদা পূর্ণ করেছেন, তাঁর বান্দাকে (রাসুলকে) সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই সমস্ত শত্রু বাহিনীকে পরাস্ত করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮)
৮. আরাফাতের দিনের দোয়া
৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজের সবচেয়ে বড় রুকন। এই দিনের দোয়া সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, “সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফাত দিবসের দোয়া।” তিনি এবং পূর্ববর্তী নবীগণ এই দিনে নিচের জিকির ও দোয়াটি সবচেয়ে বেশি পাঠ করতেন:
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।
অর্থ: একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, তাঁর কোনো অংশীদার নেই। রাজত্ব একমাত্র তাঁরই এবং সমস্ত প্রশংসাও তাঁর। আর তিনি সব কিছুর ওপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৮৫)
৯. হজ শেষে বাড়ি ফেরার দোয়া
হজের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে যখন হাজি সাহেবরা নিজের দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন, তখন সফরের স্বাভাবিক দোয়ার সঙ্গে অতিরিক্ত হিসেবে এই বাক্যগুলো যুক্ত করবেন:
উচ্চারণ: আইবুন, তাইবুন, আবিদুন, লি-রাব্বিনা হামিদুন।
অর্থ: আমরা আমাদের ঘরে প্রত্যাবর্তন করছি তওবাকারী, ইবাদতকারী এবং আমাদের প্রতিপালকের প্রশংসাকারী হিসেবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩৮৫)