নামাজ কীভাবে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে 

ছবি: এএফপি

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)

পাপ ও অন্যায় থেকে দূরে থাকার একটি কার্যকর উপায় নামাজ। তবে তা হতে হবে সচেতনতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে।

পাপ থেকে বিরত থাকার শক্তি

নামাজ মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি জাগিয়ে তোলে। নামাজের অসিলায় একজন মুসলমান প্রতিদিন পাঁচবার মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়। এর মাধ্যমে তার ভেতর এই অনুভূতির সৃষ্টি হয় যে তার প্রতিটি কাজ আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিসীমার মধ্যে রয়েছে।

যে নামাজ মানুষকে সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করে না এবং অসৎকর্ম থেকে বিরত রাখে না, তা মানুষকে আল্লাহ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়।’
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)

ফলে কোনো অশোভন বা গর্হিত কাজ করার আগে তার মনে দ্বিধা সৃষ্টি হয়। এই আত্মসচেতনতা মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখার অন্যতম প্রধান শক্তি।

এক ব্যক্তি সম্পর্কে নবীজিকে বলা হলো, সে রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে, কিন্তু দিনে চুরি করে। নবীজি (সা.) বললেন, ‘শীঘ্রই তার নামাজ তাকে চুরি থেকে বিরত রাখবে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৯৭৭৮)

পরে দেখা যায়, সেই ব্যক্তি সত্যিই চুরির অভ্যাস পরিত্যাগ করেছে। এ ঘটনা প্রমাণ করে, নামাজ যদি সঠিকভাবে আদায় করা হয়, তবে তা মানুষের ভেতরে পরিবর্তন আনবেই।

আরও পড়ুন

নামাজের আনুগত্যের গুরুত্ব

মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার নামাজের আনুগত্য করে না, তার নামাজ কিছুই নয়; আর নামাজের আনুগত্য হলো অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকা।’ (ইবনে কাসির, তাফসিরে ইবনে কাসির, ৬/২৯০, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত: ১৪১৯ হি.)

অন্যদিকে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘যে নামাজ মানুষকে সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করে না এবং অসৎকর্ম থেকে বিরত রাখে না, তা মানুষকে আল্লাহ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়।’ (তাবারি, তাফসিরে তাবারি, ২০/৩৮, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত: ২০০০ খ্রি.)

সুতরাং নামাজের প্রকৃত ফল পেতে হলে তার প্রভাব জীবনে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।

যদি কারও দরজার সামনে একটি নদী থাকে এবং সে তাতে প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করে, তবে তার শরীরে যেমন কোনো ময়লা থাকবে না; ঠিক তেমনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যে আদায় করে, তার কোনো গুনাহ থাকে না।
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৬৭

পাপ মোচনের মাধ্যম

নামাজ মানুষের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে। দৈনন্দিন জীবনে মানুষ নিজের অজান্তেই নানা গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সেই গুনাহগুলো ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে দেয়।

বিষয়টি সহজে বোঝাতে নবীজি (সা.) একটি অপূর্ব উদাহরণ দিয়ে বলেন, যদি কারও দরজার সামনে একটি নদী থাকে এবং সে তাতে প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করে, তবে তার শরীরে যেমন কোনো ময়লা থাকবে না; ঠিক তেমনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যে আদায় করে, তার কোনো গুনাহ থাকে না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৬৭)

নিয়মিত নামাজের ফলে ধীরে ধীরে নামাজি ব্যক্তির অন্তর পবিত্র হয় এবং সে অশোভন কাজ থেকে দূরে থাকতে সক্ষম হয়।

আরও পড়ুন

চরিত্র গঠনে নামাজের ভূমিকা

নামাজ মানুষকে শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা শেখায়, কারণ নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় করতে হয়। নামাজ বিনয় ও নম্রতা তৈরি করে, কারণ একজন মুসলমান প্রতিদিন সেজদায় লুটিয়ে পড়ে আল্লাহর সামনে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে।

পাশাপাশি এটি ধৈর্য, একাগ্রতা ও আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়। এসব গুণ মানুষের দৈনন্দিন আচরণে প্রতিফলিত হয় এবং তাকে অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে দূরে রাখে। জামাতে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে মুসলমান সমাজে নৈতিকতা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ গড়ে ওঠে।

তাই নামাজ এমনভাবে আদায় করতে হবে, যাতে তা আমাদের চিন্তা, আচরণ ও জীবনধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।

খুশু-খুজুর গুরুত্ব

নামাজ কেবল আদায় করলেই হবে না, বরং তা হতে হবে খুশু-খুজুর (পরিপূর্ণ একাগ্রতার) সঙ্গে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই সফল মুমিনরা, যারা তাদের নামাজে বিনয়ী।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১-২)

পক্ষান্তরে যারা নামাজে গাফেল থাকে, তাদের জন্য কঠিন শাস্তির সতর্কবাণী রয়েছে (সুরা মাউন, আয়াত: ৪-৫)।

তাই নামাজ এমনভাবে আদায় করতে হবে, যাতে তা আমাদের চিন্তা, আচরণ ও জীবনধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।

সত্যিকার অর্থে সেই নামাজই পরিপূর্ণ, যা মানুষকে অশোভন ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

আরও পড়ুন