প্রবাসে একাকী রমজান: ইবাদতে মনোযোগী হবেন যেভাবে
রমজানের প্রথম রাতে একজন প্রবাসীর ঘরের চিত্রটা কল্পনা করা যাক। ছোট একটি ঘর, টেবিলে প্লাস্টিকের বক্সে কেনা খাবার আর ফোনের স্ক্রিনে স্বদেশের জমকালো ইফতারের মায়া।
ওপাশে মা ব্যস্ত হাতে খাবার বেড়ে দিচ্ছেন, ভাইবোনদের হাসি-ঠাট্টা আর ছোট শিশুটি ক্যামেরার দিকে হাত নাড়ছে। কিছুক্ষণ কথা বলে একটু হাসি দিয়ে তিনি জানান—‘ভালো আছি’। এরপর কলটি কেটে গেলেই ঘরে ফিরে আসে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
প্রবাসজীবনে ‘ঘর’ মানে কেবল এক টুকরো থাকার জায়গা নয়; বরং এটি একটি সম্পূর্ণ সামাজিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্নতা। এখানে ইফতারের আগে মায়ের হাতের রান্নার ঘ্রাণ নেই, দস্তরখানে প্রিয় জায়গাটি ফাঁকা পড়ে থাকে আর আজানের ঠিক আগের সেই প্রিয় কলরবটা কেউ শুনতে পায় না।
নিঃসঙ্গতা কোনো দুর্বলতা নয়
বাঙালি সংস্কৃতিতে রমজান মানেই সামষ্টিকতা—একসঙ্গে ইফতার, তারাবির নামাজ আর গভীর রাত অবধি আড্ডা। এই আবহে একা থাকাটা অনেকের কাছে একপ্রকার ‘ব্যর্থতা’ মনে হতে পারে।
কিন্তু মনোবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। সামষ্টিক উৎসবের সময়ে একাকীত্বের অনুভূতি কোনো মানসিক দুর্বলতা বা ইমানের অভাব নয়; বরং এটি একটি পরিচিত সামাজিক পরিবেশ হারানোর স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া।
২০২৩ সালে ‘বিএমসি পাবলিক হেলথ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রবাসীদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের দুর্বলতা এবং অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা সরাসরি উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
যে মানুষটি ঘরে ফিরে পরিবারের সান্নিধ্যে নিজের আত্মপরিচয় খুঁজে পেতেন, প্রবাসে তিনি হঠাতই পর্দার সামনে একাকী ইফতার করা এক ব্যক্তিতে পরিণত হন। এই পরিবর্তনকে স্বীকার করে নেওয়া এবং নিজেকে দোষারোপ না করাই হলো মানসিক প্রশান্তির প্রথম ধাপ।
ধর্ম যখন ‘হৃদয়ের প্রশান্তি’
সাধারণত বলা হয় ধর্ম দুশ্চিন্তা কমায়। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, ‘সক্রিয় ধর্মভীরুতা’—যা অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস ও নিয়মিত চর্চার সমন্বয়—তা মানুষের মানসিক চাপ কমাতে বড় ভূমিকা রাখে।
জার্নাল অব মুসলিম মেন্টাল হেলথ’-এ প্রকাশিত তথ্যমতে, দোয়া, তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসা এবং বিপদকে ইতিবাচকভাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের মনে প্রশান্তি আনে। প্রবাসজীবনে এর প্রায়োগিক দিক হতে পারে:
সহজ ইবাদত: ইবাদতকে পাহাড়সম বোঝা না বানিয়ে সহজ ও ধারাবাহিক করা। ফজরের পর কয়েক মিনিট আল্লাহর কাছে নিজের একাকীত্ব ও কষ্টের কথা সরাসরি বলা।
একটি আয়াত ও গভীর মনোযোগ: বিশাল খতমের পরিকল্পনায় ক্লান্ত হয়ে অপরাধবোধে ভোগার চেয়ে প্রতিদিন একটি আয়াতের অর্থ বুঝে পড়া এবং সারাদিন তা নিয়ে ভাবা।
কৃতজ্ঞতার সেজদা: প্রবাসের শত কষ্টের মাঝেও ছোট ছোট নিয়ামতের জন্য প্রতিদিন একটি শুকরিয়ার সেজদা দেওয়া।
ছোট ছোট অভ্যাসের বড় প্রভাব
২০২২ সালে ‘কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ জার্নাল’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, অস্থায়ী বা সংকীর্ণ বাসস্থানেও যদি কেউ একটি নির্দিষ্ট দৈনন্দিন রুটিন মেনে চলেন, তবে তাঁর মধ্যে বিশৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় কমে যায়।
প্রবাস জীবনে ‘রমজানের আমেজ’ কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব না হলেও কিছু ছোট আচার মানসিক প্রশান্তি দিতে পারে:
১. নিজের হাতে সাহ্রি: কেউ জাগিয়ে দেওয়ার নেই জেনেও নিজে উদ্যোগী হয়ে নির্দিষ্ট সময়ে সাহ্রি প্রস্তুত করা (তা কেবল পানি আর খেজুর হলেও) নিজের প্রতি নিজের যত্নশীল হওয়ার বার্তা দেয়।
২. ইফতার পরবর্তী হাঁটা: ইফতারের পর অল্প কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করা মেজাজ উন্নত করতে এবং উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে।
৩. স্ক্রিন থেকে বিরতি: আজানের ঠিক পরের কয়েক মিনিট ফোন দূরে রাখা। সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের জাঁকজমকপূর্ণ ইফতার টেবিলের ছবি দেখে নিজের একাকীত্বের সঙ্গে তুলনা করার চেয়ে ওই সময় নিজের খাবারের প্রতি মনোযোগ দেওয়া বেশি জরুরি।
সামাজিক সুরক্ষায় আসুন
প্রবাসীদের নিয়ে করা গবেষণার একটি বড় সারসংক্ষেপ হলো—সামাজিক সমর্থন। অফিসের সহকর্মী, মসজিদের চেনা মুখ বা পাশের ঘরের প্রতিবেশী—এদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা জরুরি।
নিয়মিত একটি নির্দিষ্ট মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়া বা নামাজের পর কুশল বিনিময় করা ‘কেউ নেই’ অনুভূতিটিকে ‘কেউ না কেউ চেনে’—এই স্বস্তিতে রূপ দেয়।
প্রযুক্তি যখন সহায়ক
ভিডিও কলে পরিবারের সঙ্গে কথা বলা অবশ্যই বড় নেয়ামত। কিন্তু এটি যখন কেবল নিজের না-পাওয়াগুলোর সঙ্গে স্ক্রিনের প্রাপ্তিগুলোর তুলনা হয়ে দাঁড়ায়, তখন এটি মানসিক চাপের কারণ হয়।
তাই কথা বলার নির্দিষ্ট সময় রাখা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের জাঁকজমক দেখে নিজের বর্তমানকে তুচ্ছ না ভাবা বুদ্ধিমানের কাজ।
রমজান কেবল সাহ্রি-ইফতারের আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি নিজের আত্মা ও পরিচয়কে নতুন করে চেনার এক অনন্য সুযোগ—এমনকি যদি আপনি একা একটি প্লাস্টিকের পাত্রে ইফতার করেন, তবুও।