যেভাবে বেড়ে ওঠেন নবীকন্যা ফাতেমা

কানাডার আলবার্টায় অবস্থিত মসজিদ-ই ফাতেমাছবি: সংগৃহীত

ফাতেমা (রা.) ছিলেন নবীজির সবচেয়ে কনিষ্ঠ ও প্রিয় কন্যা। নবুয়তের পবিত্র আবহ ও ওহির ঘনিষ্ঠতম পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা। মক্কার চরম সংকটকাল, ইসলামের সূচনাপর্বের নির্মম নির্যাতন, মদিনার রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণ—সবকিছুরই তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষ সাক্ষী।

তাঁর পার্থিব জীবন ছিল প্রাচুর্যহীন ও আড়ম্বরহীন, অথচ আত্মিক মর্যাদায় চিরভাস্বর; কায়িক শ্রমে ও কষ্টে ভরা, অথচ ইমানি শক্তিতে পরিপূর্ণ।

গভীর পিতৃস্নেহ

ফাতেমার প্রতি নবীজির পিতৃস্নেহ ছিল অতুলনীয়। তিনি শুধু কন্যার প্রতি পিতাসুলভ মায়াই প্রকাশ করেননি, বরং ফাতেমার ব্যক্তিত্বকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে সমাজে নারীর মর্যাদার এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছিলেন।

আয়েশা (রা.) বলেন, ‘কথাবার্তা, চালচলন, গাম্ভীর্য ও ওঠাবসায় রাসুলের সঙ্গে ফাতেমার চেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ আমি আর কাউকে দেখিনি। ফাতেমা যখন আসতেন, তখন রাসুল পরম স্নেহে উঠে দাঁড়াতেন, তাঁর হাত ধরে চুম্বন করতেন এবং নিজের বসার জায়গায় তাঁকে বসাতেন। আবার নবীজি যখন ফাতেমার ঘরে যেতেন, তখন তিনিও দাঁড়িয়ে পিতাকে অভ্যর্থনা জানাতেন, তাঁর হাতে চুম্বন করতেন এবং নিজের আসনে তাঁকে বসতে দিতেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫২১৭)

কন্যার মর্যাদার ঘোষণা দিয়ে রাসুল (সা.) বলেন, ‘ফাতেমা আমারই একটি অংশ; যা কিছু তাকে কষ্ট দেয়, তা আমাকেও কষ্ট দেয় এবং যা কিছু তাকে ব্যথিত করে, তা আমাকেও ব্যথিত করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭১৪)

কন্যা পরিবারের কোনো অবাঞ্ছিত বোঝা নয়, বরং পিতার হৃদয় ও সম্মানের অংশ—জাহেলি সমাজের বুকে এটি ছিল এক বিপ্লবী ঘোষণা।

মক্কার দুঃসময়ে পিতার পাশে

শৈশবে তিনি বেড়ে উঠেছেন এমন এক ঘরে, যার ওপর পৌত্তলিক কোরাইশরা প্রতিনিয়ত জুলুম চালাচ্ছিল। কিশোরী বয়সেই তিনি নিজের চোখের সামনে পিতাকে অপমানিত হতে দেখেছেন।

একবার রাসুল (সা.) কাবার চত্বরে সেজদারত ছিলেন। মক্কার কোরাইশ নেতারা বাজি ধরে জবাই করা উটের পচা নাড়িভুঁড়ি নবীজির পিঠ ও ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দিল। দুর্গন্ধ ও ভারে নবীজি সেজদা থেকে মাথা তুলতে পারছিলেন না, আর মুশরিকরা হাসিতে লুটিয়ে পড়ছিল।

সংবাদ পেয়ে এক কিশোরী বালিকা একাকী নির্ভীক পদক্ষেপে ছুটে এলেন। নিজ হাতে পিতার শরীর থেকে সেই নোংরা আবর্জনা সরিয়ে ফেলে কোরাইশ নেতাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮৫৪)

সেই বালিকাটি ছিলেন হজরত ফাতেমা (রা.)। নবুয়তের ঘরে লালিত এই কিশোরী খুব অল্প বয়সেই বুঝে নিয়েছিলেন, হকের পথে চলার অর্থই হলো ত্যাগ ও সংগ্রামের মুখোমুখি হওয়া।

আরও পড়ুন
পাথরের ভারী জাঁতা ঘুরিয়ে যব পিষতে পিষতে তাঁর কোমল হাতে কড়া পড়ে গিয়েছিল; চামড়ার মশকভর্তি পানি বয়ে আনতে গিয়ে বুকে দাগ হয়ে গিয়েছিল।

আলীর সঙ্গে দাম্পত্য

মদিনায় হিজরতের পর দ্বিতীয় হিজরিতে রাসুলের চাচাতো ভাই আলী ইবনে আবু তালেবের সঙ্গে ফাতেমার শুভবিবাহ সম্পন্ন হয়। তাঁদের বৈবাহিক জীবন পার্থিব ধনসম্পদে সমৃদ্ধ ছিল না; কিন্তু তা ছিল পারস্পরিক সম্মান, আন্তরিক দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসায় ভরপুর।

ঘরের প্রতিটি কাজ ফাতেমা (রা.) নিজ হাতে করতেন। পাথরের ভারী জাঁতা ঘুরিয়ে যব পিষতে পিষতে তাঁর কোমল হাতে কড়া পড়ে গিয়েছিল; চামড়ার মশকভর্তি পানি বয়ে আনতে গিয়ে বুকে দাগ হয়ে গিয়েছিল এবং ঘর ঝাড়ু দিতে গিয়ে পরিধেয় কাপড় ময়লা হতো।

আলীও বাইরে শ্রম দিয়ে অর্থ উপার্জনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। অভাব-অনটনের মাঝেও তাঁদের সংসারে কখনো অশান্তি বা মর্যাদাহানির কোনো স্থান ছিল না।

নবীজির তাসবিহ উপহার

একবার মদিনায় কিছু যুদ্ধবন্দী আনা হলে আলী (রা.) ফাতেমাকে পরামর্শ দিলেন নবীজির কাছে গিয়ে ঘরের কাজের সহযোগিতার জন্য একজন খাদেম চাইতে। ফাতেমা (রা.) পিতার কাছে গিয়ে নিজের কষ্টের কথা জানালেন। কিন্তু নবীজি কন্যাকে খাদেম না দিয়ে এক চিরস্থায়ী আধ্যাত্মিক উপহার দান করলেন।

বললেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন একটি জিনিসের সন্ধান দেব না, যা একজন সেবকের চেয়েও তোমাদের জন্য বহুগুণ উত্তম হবে? তোমরা যখন রাতে ঘুমাতে বিছানায় যাবে, তখন তোমরা ৩৩ বার ‘সুবহানাল্লাহ’ (আল্লাহ অতি পবিত্র), ৩৩ বার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর) এবং ৩৪ বার ‘আল্লাহু আকবার’ (আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ) পাঠ করবে। এটি তোমাদের জন্য যেকোনো খাদেমের চেয়েও অধিক কল্যাণকর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭০৫)

নবীকন্যা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জীবন রাজকীয় বিলাসের ছিল না। বংশমর্যাদা তাঁকে দৈনন্দিন শ্রম থেকে অব্যাহতি দেয়নি; বরং তিনি কায়িক শ্রমের ভেতর দিয়েই আত্মমর্যাদার এক অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।

জান্নাতের দুই ফুলের লালন

ফাতেমা (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মা। তিনি হাসান, হোসাইন, মোহসিন (যিনি শৈশবেই মারা যান) জয়নাব ও উম্মে কুলসুমের গর্ভধারিণী। তাঁর পবিত্র কোলেই গড়ে উঠেছিল এই উম্মতের নেতৃত্বের এক অনন্য প্রজন্ম।

রাসুল (সা.) হাসান ও হোসাইনকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। বলতেন, ‘হাসান ও হুসাইন হলো দুনিয়ায় আমার দুটি সুবাসিত ফুল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৫৩)

অন্য হাদিসে তিনি ঘোষণা করেছেন, ‘হাসান ও হোসাইন হলো বেহেশতের যুবকদের সর্দার।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ৩৭৬৮)

এই সন্তানদের চরিত্র, তাকওয়া ও শাহাদাতের পেছনে ছিল মা ফাতেমার আত্মত্যাগ ও তরবিয়তের গভীর প্রভাব।

আড়ম্বরহীন জীবনাচার

ফাতেমার কাছে সৌন্দর্যের অর্থ কখনোই দামি পোশাক বা স্বর্ণালংকার ছিল না। তাঁর ঘরের আসবাবপত্র ছিল একটি ভেড়ার চামড়ার বিছানা, খড়ের বালিশ ও মাটির কলসি।

আরও পড়ুন
জীবনের শেষ সময়ে ফাতেমা (রা.) পিতার শয্যাপাশে উপস্থিত ছিলেন। নবীজি অত্যন্ত দুর্বল কণ্ঠে তাঁকে কাছে ডেকে কানে কানে কিছু বললেন।

একবার তিনি নিজের ঘরের দরজায় একটি কারুকার্যখচিত নকশাদার পর্দা টাঙিয়েছিলেন। রাসুল (সা.) ঘরে এসে সেই পর্দার দিকে তাকিয়ে ভেতরে প্রবেশ না করেই ফিরে গেলেন। ফাতেমা (রা.) তৎক্ষণাৎ পিতার অসন্তুষ্টির কারণ বুঝতে পারলেন। তিনি মুহূর্ত বিলম্ব না করে পর্দাটি খুলে ফেললেন এবং তা দান করে দিলেন। নবীজি তা দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে বললেন, ‘ফাতেমা তা-ই করেছে যা তার উচিত ছিল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬১৪)

আল্লাহর রাসুলের একটিমাত্র ইশারায় নিজের পছন্দকে কোরবানি করে দেওয়াই ছিল তাঁর স্বভাব।

বিদায়বেলার অশ্রু

জীবনের শেষ সময়ে ফাতেমা (রা.) পিতার শয্যাপাশে উপস্থিত ছিলেন। নবীজি অত্যন্ত দুর্বল কণ্ঠে তাঁকে কাছে ডেকে কানে কানে কিছু বললেন। কথাটি শুনে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর নবীজি তাঁকে পুনরায় কাছে ডেকে আবার ফিসফিস করে কিছু বললেন, আর তখনই ফাতেমার মুখে উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল।

আয়েশা (রা.) এই কান্নাহাসির রহস্য জানতে চাইলে ফাতেমা নবীজির জীবদ্দশায় তা প্রকাশ করেননি।

নবীজির ইন্তেকালের পর তিনি কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘প্রথমে আমাকে জানিয়েছিলেন যে তিনি এই অসুস্থতাতেই দুনিয়া থেকে বিদায় নেবেন; তাই বিচ্ছেদের বেদনায় আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। এরপর তিনি আমাকে বললেন, “আমার পরিবারের মধ্য থেকে তুমিই সবার আগে আমার সঙ্গে মিলিত হবে এবং তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে তুমি হবে মুমিন নারীদের নেত্রী?” এই সুসংবাদ শুনেই আমার মুখে হাসি ফুটেছিল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬২৭)

রাসুলের ওফাতের মাত্র ছয় মাস পরই ১১ হিজরির ৩ রমজান এই মহান নারী মাত্র ২৯ বছর বয়সে ইন্তেকাল করে প্রিয় পিতার সঙ্গে গিয়ে মিলিত হন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪২৪০)

এক ভারসাম্যপূর্ণ জীবনাদর্শ

বর্তমান যুগে নারীকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সমাজ দুটি চরমপন্থা দেখতে পায়—একদিকে নারীকে নিছক ভোগের পণ্য ও প্রদর্শনীর সামগ্রী বানানোর অসুস্থ সংস্কৃতি; অন্যদিকে তার মাতৃত্ব, পারিবারিক পরিচয় ও শালীনতাকে খাটো করে দেখার একপেশে প্রবণতা।

ফাতেমার জীবন এই দুই চরমপন্থার বাইরে এক পূর্ণাঙ্গ ও ভারসাম্যপূর্ণ পথপ্রদর্শক। তিনি প্রমাণ করে গেছেন—নারীর প্রকৃত আভিজাত্য বিলাসবহুল জীবনে নয়, বরং লজ্জাশীলতা ও চরিত্রে; নারীর সম্মান গৃহকোণকে আলোকময় করে আত্মমর্যাদার সঙ্গে বাঁচার ভেতরে। তিনি ছিলেন ঘরে আদর্শ কন্যা, স্বামীর বিশ্বস্ত সহযাত্রী এবং সন্তানদের জন্য তাকওয়ার পাঠশালা; 

আবার অন্যায়ের সামনে তিনি ছিলেন আপসহীন এক সাহসী কণ্ঠস্বর। ফাতেমার এই অনুপম জীবন যুগে যুগে প্রতিটি বিশ্বাসী নারীর আত্মমর্যাদা ও আত্মশুদ্ধির চিরন্তন আলোকবর্তিকা।

আরও পড়ুন